মঙ্গলবার ৩০ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

ডেঙ্গু আতংক শেষ হবে কবে? 

ইবরাহীম খলিল: দেশে করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। এরপরও বিশেষজ্ঞরা সাবধানে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এখনো রাজধানীবাসীর আতংকের কারণ ডেঙ্গু মশা। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছেন ১৩২ জন। সরকারি হিসাবে দেশে অক্টোবরের ১৪ দিনে ২ হাজার ৭১৫ জন, সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার ৮৪১ জন, আগস্টে ৭ হাজার ৬৯৮ জন, জুলাইয়ে ২ হাজার ২৮৬ জন এবং জুন মাসে ২৭২ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন।

চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যু হয়েছে ৮২ জন। এর মধ্যে অক্টোবরে মারা গেছেন ১৩ জন, সেপ্টেম্বরে ২৩ জন, আগস্টে ৩৪ জন এবং জুলাইতে ১২ জন। 

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট রোগী ভর্তি আছেন ৮৪৬ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৬৮৫ জন আর অন্যান্য বিভাগে ভর্তি আছেন ১৬১ জন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ২১ হাজার ১৮ জন। 

তাদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০ হাজার ৯০ জন আর চলতি বছর আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৮২ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানাচ্ছে, একদিনে যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের মধ্যে ১ থেকে ২০ বছর বয়সী বেশি। এক থেকে ১০ এবং ১১ থেকে ২০ বছর বয়সীদের ভর্তি হবার হার ২৪ শতাংশ। আর ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভর্তি হয়েছেন ১৬ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ বছর ১২ শতাংশ, ষাটোর্ধ ১২ শতাংশ, ৫১ থেকে ৬০ বছর আট শতাংশ এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর চার শতাংশ।

রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫১ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৯০৬ জন। ঢাকার ৪৬টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে মোট ভর্তি রোগী আছেন ৭৪০ জন। অন্যান্য বিভাগে বর্তমানে ভর্তি আছেন ১৬৬ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ৯১২জন। সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন ১৯ হাজার ৯২৪ জন। 

এ বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চোখ, নাক ও ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ, বমি, পেটব্যথা, খাদ্যনালী, মূত্রনালিসহ বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষরণের উপসর্গ নিয়েই ডেঙ্গুতে আক্রান্তরা হাসপাতালে বেশি আসছে। জ্বর, মাথাব্যথার উপসর্গ অপেক্ষাকৃত কমই পাওয়া যাচ্ছে। বেশিরভাগ রোগীরই রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা ২০ হাজারের কম পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণেই এবারের ডেঙ্গু অন্যবারের চেয়ে আলাদা বলে মনে হচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদদের অভিযোগ, দুই দশক ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, রোগী ব্যবস্থাপনা ও এডিস মশা নির্মূলে কাজ করছে সরকার। তবে এখনো ডেঙ্গু মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। দেশে দুই দশকের মধ্যে চলতি বছর ডেঙ্গু রোগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ব, রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু নির্মূলে স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পদক্ষেপ যুগোপযোগী নয়। ফলে বারবার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ মৌসুমি কার্যক্রমের মধ্যেই থেকে যাচ্ছে। 

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, এডিস মশার উৎস ধ্বংসে রাসায়নিক প্রয়োগ করতে হয়। শুধু জনগণের সচেতনতা ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারবে না। তারা মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি বিভাগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা করছে। আধুনিক কোনো প্রযুক্তি এবং পরিকল্পনা সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য বিভাগের নেই। তারা শুধু জনগণকে সচেতন করছে। কিন্তু জনগণ কী করবে? শুধু জমা পানি ফেলে দিলে হবে না।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কীটতত্ত্ববিদ ড. তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার এখন পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশাই চিহ্নিত করতে পারেনি। এলাকা ধরে ধরে এসব মশা খুঁজে বের করতে হবে। পরীক্ষা করে তাদের উৎস ধ্বংস করতে হবে। শুধু ফগিং করলে কিছু হবে না। ভাইরাসবাহী এডিস মশা নিধন করা হবে তা তারা জানে না।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বলছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের অসচেতনতার কারণে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আসেনি। চলতি বছর কয়েক মাস আগেই বিষয়টি দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। চিকিৎসা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও জরিপের বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কাজ করে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও লাইন ডিরেক্টর (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। 

বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে বলে দাবি করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও নন কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন মনে করেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ছিল ডেঙ্গু আক্রান্তের কঠিন সময়। এ দুটি মাসে ৭ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। চলতি মাসে শুক্রবার পর্যন্ত দেশে অক্টোবরের ১৪ দিনে ২ হাজার ৭১৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। 

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. আমিন আরও বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত বেড রয়েছে। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। নির্ধারিত গাইডলাইন মেনে সময়মতো চিকিৎসা নিলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। 

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। সেই বছর আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ালেও ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কম ছিল। গত বছর ১ হাজার ৪শ ৫ জন রোগী হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেন। চলতি মাসেই ডেঙ্গুতে এর চেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ