বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

নীরব ছিনতাই রাজধানীতে টার্গেট নির্জন এলাকা  

 

নাছির উদ্দিন শোয়েব: রাজধানীর কারওয়ানবাজার এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে খুন হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কেশব রায় পাপন (২৪)। গত ৫ অক্টোবর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে হোটেল মেরিনের সামনে রাত ৯টার দিকে কয়েকজন অস্ত্রধারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পাপনকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে পথচারীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রথমে এটি ক্লুলেজ ঘটনা ছিল। হত্যাকা-ের সঙ্গে মো. তুহিন নামে (২০) এক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করার পর রহস্য উন্মোচন হয়। গ্রেফতার তুহিন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে- ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ায় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। 

ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই নিরবে ছিনতাই হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে ও ভোরে ছিনতাই বেশি হয়। বিভিন্ন সড়কের নির্জন এলাকা, ফুট ওভারব্রীজ, ফ্লাইওভারে চলাচলকারীরা টার্গেট বেশি। রাতে ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচল করা মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটো রিকশা থামিয়ে চালক এবং যাত্রীদের টাকা এবং মালামাল ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এছাড়াও হাতিরঝিলের দুই পাশের সড়কে চলাচলকারীরা ছিনতাইকারীদের টার্গেটে থাকে। রাতে নির্জন স্থান দিয়ে সিএনজি অটো রিকশা ও পায়ে হেঁটে চলাফেরা করা ঝুকিপূর্ণ। ছিনতাইকারীরা সুযোগ বুঝে পথচারীদের কাছ থেকে অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ অর্থ, গহনাগাটি, মোবাইল ও অন্যান্য জিনিসপত্র অবলীলায় নিয়ে  যায়। ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, পথে-ঘাটে কেউই নিরাপদ বোধ করছে না। তবে ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা হয় না বিধায় পুলিশের কাছে প্রকৃত পরিসংখ্যানও নেই। ছিনতাইয়ের সাথে যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সিএনজি অটো রিকশা ও বাসের চালক হেলপারের বিরুদ্ধেও। বাস চালকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ছিনতাই এবং কখনো কখনো শ্লীলতাহানির ঘটনাও ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে পকেটমারের কথাও বলা যায়। রাতে গ্যাং ছিনতাই বেশি হচ্ছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক নজরদারীর কারণে কিছুদিন আগেও এধরনের উপদ্রব থেকে খানিকটা মুক্তি পেয়েছিলেন রাজধানীবাসী। কিন্তু আবারও এ ধরণের ঘটনা বেড়েছে।  

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক কর্মকা- সীমিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া। তবে এটা স্বীকৃত বিষয় যে, কর্মসংস্থান যত সংকুচিত হবে, অপরাধ তত বাড়বে। পুলিশের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছিনতাইকারীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন বস্তি এলাকার বাসিন্দা। অনেকে আছেন ভাসমান। আবার ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। ছিনতাই করে আবার নিজের এলাকায় গিয়ে আত্মগোপনে থাকে। রাজধানীর একেক এলাকায় ছিনতাইয়ের ধরনের মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমন, বিমানবন্দর সড়কে বেশির ভাগ ছিনতাই হয় পুলিশ পরিচয়ে। পুলিশ বলছে, রাজধানীতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুব ভোরে এবং গভীর রাতে নির্জন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বাড্ডা ও ভাটারা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া শাহবাগ, মগবাজার, রমনা পার্ক, মালিবাগ রেলগেট, চাঁনখারপুল, ঢাকা মেডিকেল এলাকা, গুলিস্তান, ধানমন্ডি, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, নিউমার্কেট ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রাজধানীর হাজারীবাগ এবং মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, ঢাকা উদ্যান, ফার্মগেট, কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড, গাবতলী এলাকায় খুব ভোরে বা নির্জন রাস্তায় সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরার পরামর্শ দেয় পুলিশ। তবে সম্প্রতি হাতিরঝিল, গুলশান-১ নম্বর গোল চক্কর ও বনানী এলাকায়ও ছিনতাই বেড়েছে। 

জানা গেছে, গত ২৯ আগস্ট রাত ৯ টারদিকে ছিনতাইকারীর হাতে আহত হন করিম নামে এক যুবক। ওই যুবকের মোবাইল কেড়ে নিয়ে তাকে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এলাকার কিছু লোক তাকে নদীতে নেমে উদ্ধার করে। ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও কিন্তু পুলিশ তেমনকোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। খোকন নামে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা  এক তরুণ অফিস থেকে বাসা যাওয়ার সময় হাতিরঝিল এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। একদল বখাটে ছেলে ধারালো অস্ত্রের মুখে তার স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেয় এবং ঘটনার সময় ধস্তাধস্তির এক সময় অস্ত্রের আঘাতে তার হাত থেকে রক্ত বের হলেও আশপাশের কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। 

এরআগে গত ১৭ মে রাতে রাজধানীর খিলক্ষেতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই ছিনতাইকারী নিহত হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ছিনতাই, মাদক ও হত্যা মামলা রয়েছে। পুলিশ জানায়, রাত আড়াইটার দিকে খিলক্ষেত ৩০০ ফিট এলাকায় বন্দুকযুদ্ধের এ ঘটনা ঘটে। নিহত দুজনের নাম রাসেল ও এনামুল। ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশের একটি দল কাওলা হয়ে পূর্বাচলগামী ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখে এবং অপর দলটি পূর্বগামী ফ্লাইওভারের মাঝে অবস্থান নিয়ে তল্লাশি করছিল। রাত অনুমানিক সোয়া ২টার দিকে কাওলা থেকে বিশ্ব রোডের দিকে একটা সবুজ রঙের সিএনজি অটোরিকশা কয়েকজন লোক নিয়ে যাচ্ছিল। চেকপোস্টে অটোরিকশাটিকে থামতে বলা হলে তারা ৩০০ ফিট ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে পূর্বাচলের দিকে পালানোর চেষ্টা করে। ডিবি পুলিশের দলটি ব্রিজের মাঝে থাকা দ্বিতীয় দলকে ওয়ারলেস দ্বারা সতর্ক করলে তারা তাদের মাইক্রোবাসকে আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে দেয় এবং প্রথম দলটি সিএনজি অটোরিকশাকে ধাওয়া করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ব্যারিকেডে দু’জন সন্ত্রাসী অটোরিকশা থেকে নেমে দৌড়ে সামনে যেতে থাকে এবং পুলিশের  মাইক্রোবাস আড়াআড়ি দেখে সেটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে দুই ছিনতাইকারী নিহত হয়। 

এদিকে পুলিশের তথ্যে জানা যায়, ২৬ মে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে মো. সুমন নামে সংঘবদ্ধ সিএনজি ছিনতাই চক্রের এক সদস্যকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন র‌্যাব। র‌্যাব-৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বীনা রানী দাস জানান, এ চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সিএনজি চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের কাজ করে আসছিল। পরবর্তীতে তারা চুরি করা সিএনজির ইঞ্জিন ও চেসিস নাম্বার পরিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় তা বিক্রি করতো। এই চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে চোরাই সিএনজি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। গত ৮ মে রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের ২৩ সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (এএসপি) ইমরান খান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় অস্ত্র ঠেকিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন, ব্যাগসহ নানা মূল্যবান মালামাল ছিনিয়ে নিত। 

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাই মামলা হয়েছে ৭৮টি। ২০১৯ সালে ১১৯টি। আর ২০২০ সালে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৬টি। গত ১০ বছরে শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরাসহ ১৫টি থানা এলাকায় ছিনতাই হয় অপেক্ষাকৃত বেশি। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের সাধারণ নিবন্ধন খাতার তথ্যে অনুযায়ী গত আট বছরে  ঢাকা মহানগর এলাকায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৮৪৬টি। এ সময় ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয়েছেন মোট ৩৬ জন। ২০১৮ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় মামলা হয় ৭৮টি। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ১১৯টি। তবে ভুক্তভোগীদের মতে, ছিনতাইয়ের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই বাড়তি ঝামেলা এড়াতে আইনশৃঙখলা বাহিনীর কাছে যেতে চায় না। পুলিশী হয়রানির অভিযোগ তুলে থানায় মামলাও করেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ