রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

অবশেষে পরাজয় মেনে নিল

আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের পরাজয় হয়েছে বলে মনে করা হলেও মার্কিন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করতে চাননি বরং তারা এর ভিন্নতর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছে। যদিও কূটনৈতিক মহল তাদের কথার সাথে কখনোই একমত পোষণ করেননি। তারপর যুক্তরাষ্ট্র পরাজয়ের গ্লানিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য এতোদিন নানা কথা বলে এসেছে। যা কোন মহলেই গ্রহণযোগ্য হয়নি বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের পরাজয়ের কথায় বারবার চাউর হতে শোনা গেছে। কারণ, বাস্তবতা বড়ই নির্মম ও কঠিন।
তবে সম্প্রতি মার্কিন শীর্ষ জেনারেল মার্ক মিলে আফগান যুদ্ধে নিজেদের পরাজয়ের কথা অবলীলায় স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি পরাজয়ের আত্মস্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, এই যুদ্ধ ছিল তাঁদের কৌশলগত ব্যর্থতা। মার্ক মিলে মার্কিন সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান। গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি পরিষদের আর্মস সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে হাজির হয়ে তিনি পরাজয়ের কথা স্বীকার করেন। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। জেনারেল মার্ক মিলের ভাষায়, ‘এটা আমাদের সবার কাছে স্পষ্ট যে আফগানিস্তানের যুদ্ধ আমরা যে শর্তে শেষ করতে চেয়েছিলাম, তা হয়নি; বিশেষ করে কাবুলের ক্ষমতায় তালেবান আসার পর। তবে এ পরাজয় ২০ দিন বা ২০ মাসের নয়। এটা ধারাবাহিক কৌশলগত সিদ্ধান্তের একটি সংমিশ্রণের প্রভাব।’
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের জন্য দায়ী বেশ কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন জেনারেল মিলে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পরপরই তোরা বোরাতে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে বা হত্যা করার একটি সুযোগ ফসকে যাওয়া। মার্ক মিলে আফগানিস্তান যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন, যাতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পাকিস্তানে তালেবানের শক্তিশালী হয়ে ওঠার বিষয়টিও কার্যকরভাবে ঠেকানো যায়নি। কয়েক বছর আগে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন উপদেষ্টাদের প্রত্যাহারের ঘটনাও পরাজয়ের আরেকটি কারণ বলে মনে করেন এই মার্কিন শীর্ষ জেনারেল।
তালেবানের সাথে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা চুক্তির ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে অনুষ্ঠিত শুনানিতে জেনারেল মার্ক মিলে ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ফ্রাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি দাবি করেন, তাঁরা আফগানিস্তানে আড়াই হাজার মার্কিন সেনা রাখার ব্যাপারে সুপারিশ করেছিলেন। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব জেন সাকি মনে করেন, আফগানিস্তানে করণীয় বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিভক্ত পরামর্শ পেয়েছিলেন। জেন সাকি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি কমান্ডার ইন চিফের ওপর নির্ভর করে। তিনি আফগানিস্তানের ২০ বছরের যুদ্ধ সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।’ মূলত এটিই ছিল আফগান যুদ্ধ পরিসমাপ্তির টার্নিং পয়েন্ট।
এদিকে বিবিসির খবরে বলা হয়, তালেবান ও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পাদিত দোহা চুক্তি তালেবানের আফগানিস্তান দখলের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এমন তথ্য দিয়েছেন সম্প্রতি। দোহা চুক্তিতে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ফ্রাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি মনে করেন, আফগান সরকার ও মার্কিন সেনাবাহিনীর ওপর দোহা চুক্তির ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়েছিল। যার পরিণতিতে আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় অবশ্যাম্ভাবী হয়ে ওঠে।
বিদেশের মাটিতে মার্কিন বাহিনীর তেমন কোন সাফল্য নেই। এর আগে তারা ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন যুদ্ধেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। এরপর মার্কিন বাহিনী আফগান যুদ্ধে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। এ যুদ্ধে ব্যাপক ব্যয় ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন সৈন্যের প্রাণহানির পরও তাদেরকে পরাজয় মেনে নিয়েই আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। যা প্রতিধ্বনিত হয়েছে মার্কিন শীর্ষ জেনারেলের মুখে। বাস্তবতা কখনো অস্বীকার করা যায় ?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ