রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

নিকৃষ্ট ও উত্তম আবাস

জাফর আহমাদ : বড়ই নিকৃষ্ট আবাসস্থল হলো জাহান্নাম এবং বড়ই উত্তম আবাসন হলো, চির সুখের জান্নাত। কারা কোন আবাসের মালিক হবে চলুন, নিচে কুরআনের আয়াত থেকে জেনে ন্ইে। আমরা এই দু’টো আবাসনের কোনটি গ্রহণ করবো? উত্তম নাকি নিকৃষ্ট তা নির্ভর করবে এই দুনিয়ায় আমার বিশ্বাস ও কর্মপন্থার উপর। আমরা আশা করতে পারি যে, আমাদের সকলেই উত্তম আবাসস্থলটিই বেছে নিবো। কিন্তু এই চির সুখের আবাসটি পেতে হলে দুনিয়ার জীবনে অবশ্যই আমাদের বিশ্বাস ও কর্মপন্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যদি দুনিয়াকে আহরণ করার জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করা হয় এবং নিজের বিশ্বাস ও কর্মপন্থাকে সেই ধাঁচেই তৈয়ার করা হয় তাহলে নিকৃষ্ট আবাসস্থল অপেক্ষা করছে। তখন আপনার সমস্ত সম্পদ উত্তম আবাসে যাওয়ার জন্য কোনই কাজে আসবে না।     
আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেন,“যারা নিজেরদের রবের দাওয়াত গ্রহণ করেছে তাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে আর যারা তা গ্রহণ করেনি তারা যদি পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের মালিক হয়ে যায় এবং এ পরিমাণ আরো সংগ্রহ করে নেয় তাহলেও তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য এ সমস্তকে মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে দিতে তৈরী হয়ে যাবে। এদের হিসেব নেয়া হবে নিকৃষ্টভাবে এবং এদের আবাস হবে জাহান্নাম, বড়ই নিকৃষ্ট আবাস।”(সুরা রাদ: ১৮)
নিকৃষ্ট আবাসন অধিকারীদের পরিচয় : কারা নিকৃষ্ট আবাসনের বাসিন্দা হবে তাদের পরিচয় উল্লেখিত আয়াতে দেখেছেন তাছাড়া এই সুরারই ২৫ নং আয়াতে আবার বলা হয়েছে। “আর যারা আল্লাহর অঙ্গীকারে মজবুতভাবে আবদ্ধ হবার পর তা ভেঙ্গে ফেলে, আল্লাহ যেসব সম্পর্ক জোড়া দেবার হুকুম দিয়েছেন সেগুলো ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে তারা লানতের অধিকারী এবং তাদের জন্য রয়েছে আখিরাতে বড়ই খারাপ আবাস।”(সুরা রাদ:২৫)  
এখানে অংগীকারের অর্থ  হচ্ছে সেই অনন্তকালীন অঙ্গিকার যা সৃষ্টির শুরুতেই আল্লাহ তা’আলা সমস্ত মানুষের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। তিনি অঙ্গিকার নিয়েছিলেন, মানুষ একমাত্র তাঁর বন্দেগী করবে এবং প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকেই এই অঙ্গিকার নেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আর (হে নবী!) লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করেয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন: আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিল: নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব, আমরা এর সাক্ষী দিচ্ছি। এটা আমি এ জন্য করেছিলাম যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলে বসো, আমরা তো একথা জানতাম না।”(আরাফ : ১৭২)
এই ওয়াদা বা অঙ্গিকার করার পর যারা দুনিয়ায় তার অঙ্গিকার ভঙ্গ করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দুনিয়ার জীবন যাপন করে তাদের কাছ থেকে কড়া হিসাব নেয়া হবে। তাদের ভুল-ভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করা হবে না। বিপরীতপক্ষে যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বস্ত আচরণ করেছে এবং তাঁর প্রতি অনুগত থেকে জীবন যাপন করেছে তাদের থেকে “সহজ হিসেব” অর্থাৎ হালকা হিসেব নেয়া হবে। তাদের বিশ্বস্ততামূলক কার্যক্রমের মোকাবিলায় ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো মাফ করে দেয়া হবে। তাদের কর্মনীতির সুকৃতিকে সামনে রেখে বহু ভুল-ভ্রান্তি উপেক্ষা করা হবে। হাদীসেও আয়েশা রা: থেকে এ ধরণের বর্ণনা রয়েছে।   
উত্তম আবাসনের অধিকারীদের পরিচয় : আল্লাহ তা’আলা বলেন, আচ্ছা তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে তাকে যে ব্যক্তি সত্য মানে আর যে ব্যক্তি এ সত্যটির ব্যাপারে অন্ধ, তারা দু’জন সমান হবে, এটা কেমন করে সম্ভব? উপদেশ তো শুধু বিবেকবান লোকেরাই গ্রহণ করে। আর তাদের কর্মপদ্ধতি এমন হয় যে, তারা আল্লাহকে প্রদত্ত নিজেদের অঙ্গিকার পালন করে এবং তাকে মজবুত করে বাঁধার পর ভেঙ্গে ফেলে না। তাদের নীতি হয়, আল্লাহ যেসব সম্পর্ক ও বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখার হুকুম দিয়েছেন। সেগুলো তারা অক্ষুন্ন  রাখে, নিজেদের রবকে ভয় করে এবং তাদের থেকে কড়া হিসেব না নেয়া হয় এই ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। তাদের অবস্থা হয় এই যে, নিজেদের রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা সবর করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিযিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে এবং ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে। আখিরাতের গৃহ হচ্ছে তাদের জন্যই অর্থাৎ এমন সব বাগান যা হবে তাদের চিরস্থায়ী আবাস। তারা নিজেরা তার মধ্যে প্রবেশ করবে এবং তাদের বাপ-দাদারা ও স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে থেকে যারা সৎকর্মশীল হবে তারাও তাদের সাথে সেখানে যাবে। ফেরেশতারা সবদিক থেকে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য আসবে এবং তাদেরকে বলবে: তোমাদের প্রতি শান্তি। তোমরা দুনিয়ায় যেভাবে সবর করে এসেছো তার বিনিময়ে আজ তোমরা এর অধিকারী হয়েছো। কাজেই কতই চমৎকার এ আখিরাতে গৃহ।” (সুরা রাদ:২০-২৪)  
উল্লেখিত আয়াতে উত্তম আবাসনের মালিকদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহর পাঠানো শিক্ষা এবং আল্লাহর রাসুলের দাওয়াত যারা গ্রহণ করে তারা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয় না বরং তারা হয় বিবেকবান, সতর্ক ও বিচক্ষণ ব্যক্তি।
আয়াতে বন্ধন ও সম্পর্ক বলতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে বুঝানো হয়েছে। যেগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের সামগ্রীক জীবনের কল্যাণ ও সাফল্য নিশ্চিত হয়। আর যেগুলো ছিন্ন করলে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।
 আর সবর করে মানে নিজেদের প্রবৃত্তি ও আকাংখা নিয়ন্ত্রণ করে, নিজেদের আবেগ, অনুভূতি ও ঝোঁক প্রবণতাকে নিয়ম ও সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখে, আল্লাহর নাফরমানিতে বিভিন্ন স্বার্থলাভ ও ভোগ-লালসার চরিতার্থ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দু’পায়ে তা দুরে ঠেলে দেয় এবং আল্লাহর হুকুম মেনে চলার পথে যেসব ক্ষতি ও কষ্টের আশংকা দেখা দেয় সেসব বরদাশত করে যেতে থাকে। এ দৃষ্টিতে মু’মিন জীবন পুরোটাই সবরের উপর নির্ভরশীল। কারণ সে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় এবং আখিরাতের স্থায়ী পরিণামের কথা চিন্তা করে দুনিয়ায় আত্মসংযম করতে থাকে এবং সবরের সাথে মনের প্রতিটি পাপ প্রবণতার মোকাবেলা করে।
ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে। অর্থাৎ তারা মন্দের মোকাবেলা মন্দ দিয়ে করে না বরং ভাল করে। তারা অন্যায়ের মোকাবেলা অন্যায়কে সাহায্য না করে ন্যায়কে সাহায্য করে। কেউ তাদের প্রতি যতই জুলুম করুক না কেন তার জবাবে তারা পাল্টা জুলুম করে না বরং ইনসাফ করে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে যতই মিথ্যাচার করুক না কেন জবাবে তারা সত্যই বলে। কেউ তাদের সাথে যতই বিশ্বাস ভংগ করুক না কেন জবাবে তারা বিশ্বস্ত আচরণই করে থাকে। নিচে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসখানা এ অর্থই ব্যক্ত করে। “তোমরা নিজেদের কর্মধারাকে অন্যের কর্মধারার অনুসারী করো না। এ কথা বলা ঠিক নয় যে, লোকেরা ভালো করলে আমরা ভালো করবো এবং লোকেরা জুলুম করলে আমরাও জুলুম করবো। তোমরা নিজেদেরকে একটি নিয়মের অধীন করো। যদি লোকেরা সদাচরণ করে তাহলে তোমরাও সদাচরণ করো। আর যদি লোকেরা তোমাদের সাথে অসৎ আচরণ করে তাহলে তোমরা জুলুম করো না।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ হাদীসটিও এ একই অর্থ প্রকাশ করে, যাতে বলা হয়েছে: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ আমাকে নয়টি বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন। এর মধ্যে তিনি এ চারটি কথা বলেছেন:
কিারোর প্রতি সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট যাই থাকি না কেন সর্বাবস্থায় আমি যেন ইনসাফের কথা বলি।
েিয আমার অধিকার হরণ করে আমি যেন তার অধিকার আদায় করি।
েিয আমাকে বঞ্চিত করবে আমি যেন তাকে দান করি।
ি আর যে আমার প্রতি জুলুম করবে আমি যেন তাকে মাফ করে দেই।
আরেকটি হাদীস নিম্নরূপ: “যে তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।” হযরত উমর রা: এর নিম্নোক্ত উক্তিটিও এ অর্থ প্রকাশ করে: “যে ব্যক্তি তোমার প্রতি আচরণ করার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না তুমি আল্লাহকে ভয় করে তার প্রতি আচরণ করো।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ