রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

পদ্মা ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হবে

এম এ খালেক : অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, কোম্পানি একীভূত করার জন্য মার্জার আইনের খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। খসড়াটি জাতীয় সংসদে অনুমোদনের পর আইনে পরিণত হলে অন্য যে কোনো ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংককে মার্জার করা হবে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া সাবেক ফারমার্স ব্যাংক, যার পরিবর্তিত নাম পদ্মা ব্যাংক নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে ধুকছে তারা এখন অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হবার জন্য আবেদন করেছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই পদ্মা ব্যাংককে অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর আগে ক্রাইসিস শুরু হলে পদ্মা ব্যাংকের মালিকানায় পরিবর্তন আনা হয়। সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, জনতা ব্যাংক লিমিটেড ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ(আইসিবি) দুর্নীতিগ্রস্ত পদ্মা ব্যাংক পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারা নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থায়ন করে। কিন্তু তাতেও কোনো ফল লাভ হয় নি। ব্যাংকটি এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় উঠে আসতে পারেনি। বরং দিনদিন আরো খারাপ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এএমএম মুহিতের মেয়াদ শেষ হবার আগে ব্যক্তি মালিকানায় একযোগে ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। তারপরও রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হলো। নতুন ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেবার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকও আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু কারো আপত্তিই গ্রাহ্য করা হয় নি। কারণ একটাই ‘রাজনৈতিক বিবেচনা।’ রাজনৈতিক বিবেচনা যে সব সময় ভালো হয় না তার প্রমাণ এই ৯টি ব্যাংক। তাদের মধ্যে অনেকগুলোও ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারছে না।
তার মধ্যে সব চেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে পদ্মা ব্যাংক, যার আগের নাম ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেড। কিন্তু শুরু থেকেই ব্যাংকটি নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতি এবং অনিয়মের নতুন নতুন মাত্রা যোগ করা হয়। ফলে এখন তারা গ্রাহকদের আমানতকৃত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এই ব্যাংকের মূল উদ্যোক্তা হচ্ছেন প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী। যিনি এক সময় কিছুদিন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। এমন একজন ব্যক্তি ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন জমা দিয়ে যখন ব্যাংকের অনুমোদন চাইলেন তখন কেনো তার অর্থের উৎস সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হলো না বা প্রশ্ন উত্থাপন করা হলো না? প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী কিভাবে এতটা বিত্তবান হলেন যে তিনি নিজেই একটি ব্যাংক স্থাপন করতে পারেন। সেই সময় কেনো তার উপার্জনের উৎস সন্ধান করা হলো না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পদ্মা ব্যাংকে কি পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তা এখনো তিনি জানেন না। তাই পদ্মা ব্যাংকে সংঘটিত দুর্নীতির মাত্রা এবং পরিমাণ নিরূপণ করে দোষীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দোষীদের শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। কাউকে শাস্তির জন্য বেছে নেয়া হয় প্রকৃত দোষীদের আড়াল করার জন্য। বেসিক ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হলেও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা তেমন বেশি কিছু নয়। আমরা পরবর্তীতে প্রত্যক্ষ করলাম, বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৫৭টি মামলা হয়েছে। কিন্তু কোনো মামলাতেই বেসিক ব্যাংকের বহুল আলোচিত চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করা হয় নি। ঠিক একইভাবে পদ্মা ব্যাংকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা হয়েছে কিন্তু তাতে ব্যাংকের মূল উদ্যোক্তাকে অভিযুক্ত করা হয় নি। আরো একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের চেয়ারম্যান দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু এখনো তাকে কোনো মামলায় অভিযুক্ত করা হয় নি। শাস্তি যদি মুখ চিনে দেয়া হয় তাহলে কখনোই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সম্প্রতি সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলব করা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সাংবাদিক নেতা কেনো যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব নিরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো সংস্থা তলব করতেই পারে। কিন্তু সেখানেও আমরা তো পক্ষপাতিত্ব লক্ষ্য করছি। ইতোপূর্বে একজন চাকরিজীবী সম্পাদক তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদান করতে পারেন নি। কিন্তু অনেকটা হঠাৎ করেই দেখা গেলো তিনি নিজেই একটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন নিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একটি টিভি চ্যানেল চালু করলেন। যে সম্পাদক তার চাকরিরত পত্রিকার সাংবাদিকদের বেতন ভাতা দিতে পারতেন না তিনি কিভাবে একটি দৈনিক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের মালিক হয়ে গেলেন? তার আয়ের উৎস বা ব্যাংক হিসাব কি খতিয়ে দেখা হয়েছে? সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখার বর্ণিত সম্পাদকের ব্যাংক হিসাব আগে দেখা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক সেক্টরের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি হচ্ছেন পিকে হালদার। তিনি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। তার বিদেশ ভ্রমণ নিষেধ করার আগেই তিনি সেই খবর পেয়ে যান। তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইস্যুকৃত পত্র সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে পৌঁছানোর আগেই তিনি সীমান্ত পাড়ি দেন। তার নামে ইস্যুকৃত চিঠি ইচ্ছে করে বিলম্বিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পিকে হালদারের অপকর্মের অন্যতম সহায়তাকারী  বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরকে অভিযুক্ত করা হলেও এখনো তাকে গ্রেপ্তার করা হয় নি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পদ্মা ব্যাংকে কি পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তা তিনি জানেন না। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য কোনো বক্তব্য নয়। অর্থমন্ত্রী যদি না জানেন কত পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তাহলে কিভাবে ব্যবস্থা নেবেন? অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্য যে কোনো একটি ভালো ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংককে একীভূত করে দেয়া যেতে পারে। শুধু পদ্মা ব্যাংকই নয় এমন যেসব দুর্বল ব্যাংক আছে সেগুলোকেও অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা যেতে পারে। দেশের প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতি সম্বলিত দেশে ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ২৪টি। আর বাংলাদেশে ৬২টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। ব্যাংককে তার নিজস্ব গতি এবং শক্তিতেই চলতে হবে। কোরামিন দিয়ে ব্যাংক চালানোর কোনো মানে থাকতে পারে না। যেনো তেনোভাবে একটি ব্যাংক অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হলেই উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। এ জন্য কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। যেসব দুর্বল ব্যাংক আছে তাদের চিহ্নিত করে অবলুপ্ত করা যেতে পারে। কারণ আমাদের মতো একটি ছোট দেশে এত বিপুল সংখ্যক ব্যাংকের আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। দু’টি ব্যাংক মার্জ করা হলে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, দুই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মতের মিল নাও হতে পারে। এতে কর্ম পরিবেশ বিনষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) এবং বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাকে (বিএসআরএস) একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) গঠন করা হয় ২০০৯ সালে। কিন্তু ব্যাংকটি যেভাবে পরিচালিত হবার কথা ছিল তা হয় নি। বরং উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো রেষারেষি বিদ্যমান। বিএসবি’র কর্মকর্তাগণ তাদের নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যস্ত। আর বিএসআরএস তাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। যারা বিডিবিএল প্রতিষ্ঠিত হবার পর চাকরিতে প্রবেশ করেছেন তারা এক ধরনের স্বার্থ নিয়ে আছেন। কোনো দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে অন্য কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করতে হলে কিছু কঠিন ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন, যে প্রতিষ্ঠানটি অন্য কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মার্জ হবে তার সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ‘গোল্ডেন হ্যান্ড শেক’র মাধ্যমে বিদায় করে দিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা যেতে পারে। মার্জকৃত প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে বেশি লোকবলের প্রয়োজন আছে তাহলে তারা নিজেদের উদ্যোগে রিক্রুট করবে। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মীদের মধ্যে মতভেদ কমে আসবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যে সব আইনি সংস্কার করা হয়েছে তা আগামীতে এই খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়েই মনে হচ্ছে। গত প্রায় ২ বছর ধরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আর বাড়ছে না। কিন্তু এটা কৃত্রিম অবস্থা মাত্র। বিভিন্ন ধরনের ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু যখন স্বাভাবিক অবস্থায় খেলাপি ঋণ প্রদর্শন করা শুরু হবে তখন অবস্থা কেমন হবে তা কি আমরা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করি?
ব্যাংক হচ্ছে একটি অর্থনীতির ধমনীতে রক্ত প্রবাহের মতো। কিন্তু সেই ধমনীকেই ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছে। এখন অনেকেই ব্যাংক স্থাপন করেন জনগণের অর্থ লুট করে নেবার জন্য। ব্যাংকের উপর মানুষের আগে যে আস্থা ছিল তা অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। যারা মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করার জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় নি। ব্যাংকের উপর মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক তা করতে হবে। আর অর্থনীতিকে রাজনীতি দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হতে দেয়া ঠিক হবে না। অর্থনীতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ