রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মানুষের প্রতি মানুষের প্রশ্ন

মানুষ কি নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। যাঁরা সমাজপতি, রাষ্ট্রনেতা, বিশ্বনেতা এবং যাঁরা ধর্মগুরু, ধর্মনেতাÑ তারা তো শ্রেষ্ঠ মানুষ; এইসব মানুষও কি নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন? আত্মবিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত থাকলে তো তাদের কথা ও কাজে মিল থাকতো। শ্রেষ্ঠ মানুষরা তো এখনও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং ভেদ-বিভেদের বিরুদ্ধে কথা বলছিল। তারপরও বর্ণের কারণে, ধর্মের কারণে মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই যুগেও চূড়ান্তভাবে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কেন? এরপরও কি আমাদের মানতে হবে যে, মানুষ আত্মবিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত আছে? মানুষ আসলে বর্তমান সভ্যতায় নিজেকেই বিশ্বাস করে না। নিজের প্রতি এর চাইতে বড় অবমাননা আর কী হতে পারে?
আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীর ভূগোল বা মানচিত্র এক রকম নয়। আবহাওয়ায় যেমন বৈচিত্র্য আছে, তেমনি বৈচিত্র্য আছে নানা দেশের, নানা জাতির মানুষের রঙের মধ্যেও। মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-আসাকের মধ্যেও পার্থক্য লক্ষণীয়। এছাড়া সব মানুষের জীবন দর্শন ও ধর্ম-ভাবনাও একরকম নয়। এসব পার্থক্য বৈচিত্র্য নিয়েই তো মানুষ শত শত বছর ধরে এই পৃথিবীতে জীবন যাপন করে আসছে। কারটা শুদ্ধ কারটা ভুল সেই বিচারটা খণ্ডিত জ্ঞান বা বিবেচনা দিয়ে করতে গেলে গোল বাঁধে। তাতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেখা দেয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং অশান্তির ঘনঘটা। মানুষের ভাল-মন্দ ও পাপপুণ্যের বিচারটা যখন পরকালে হবে তখন বিচারের সেই ভারটা মহান স্রষ্টার হাতে ছেড়ে দিলেই ভাল হয়। আর সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীর শান্তি-শৃঙ্খলার প্রসঙ্গ টেনে আনলে তো গঠনতন্ত্র, সংবিধান ও ঘোষিত মূলনীতির প্রসঙ্গও চলে আসে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ঘোষিত নীতিমালা ও সংবিধান বর্তমান সভ্যতার নেতারা কতটা মানছেন? তাই আবার চলে আসে আত্মবিশ্বাসের কথা। মানুষ নিজেকে বিশ্বাস করতে না পারলে সেই মানুষকে অন্য মানুষরা বিশ্বাস করবে কেমন করে?
১ অক্টোবর বিবিসি’র একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকার পাতায়। আসামে দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে প্রতিবেদনটির শিরোনাম হয়েছে ‘আমাদের দোষ একটাই আমরা মুসলমান’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামে দরং জেলার প্রত্যন্ত ধলপুর গ্রামটার ছবি প্রথম দেখেছিলাম সাত-আট দিন আগে গণমাধ্যম আর সোস্যাল মিডিয়ায়। এই গ্রামের যুবক মইনুল হকের উপর বর্বরতার ছবি আর তাঁর মৃত্যুর ভিডিওটি দেখেছিলাম তখনই। আসাম সরকার দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে গত কয়েক মাস ধরে। প্রথমদিকে বলা হচ্ছিল, একটি প্রাচীন শিব মন্দিরকে অনেক বড় আকারে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মন্দির সংলগ্ন জমি থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। পরে জানা যায় সেখানে একটি কৃষি খামার গড়ে তোলার জন্য জমি দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। উচ্ছেদের ফলে ভিটেমাটি হারিয়েছেন স্থানীয় বহু বাসিন্দা। সরকারের উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে গুয়াহাটির কলামিস্ট বৈকুণ্ঠ গোস্বামীর প্রশ্ন, কৃষি ফার্ম করবে সরকার ভালো কথা কিন্তু উচ্ছেদের পর মানুষগুলো কোথায় যাবে তার কোন পরিকল্পনা নেই কেন সরকারের? আর এই বিষয়টিও ভাবার মতো যে, শুধু মুসলিম এলাকাগুলোতেই উচ্ছেদ অভিযান কেন? সেখানে গুলীতে দু’জন গ্রামবাসী নিহত হলো কেন? আর উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষুব্ধ মজিদ আলী বিবিসি প্রতিনিধিকে এনআরসি’র তথ্যপ্রমাণ হাজির করে বলেন যে, ‘দেখুন তালিকার প্রথম নামটাই আমার। আমি বা আমরা এখানকার বাসিন্দা। কেউ বাংলাদেশী নই, কেউ বহিরাগতও নই। তবুও সেসবই বলা হচ্ছে আমাদের নামে। আসলে আমাদের দোষ একটাই এটা আমরা খুব ভালো করে বুঝে গেছি, আমরা মুসলমান আমাদের দোষ এটাই।’ বিবিসি’র প্রতিবেদনে যে বিষয়টি উঠে আসলো তাতে উপলব্ধি করা যায়, ধর্মের কারণে ভারতের আসামে এখনও মানুষ বঞ্চিত ও নির্যাতিত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার এমন বিষয়কে তো কোন সরকার প্রশ্রয় দিতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদের সমস্যা পৃথিবীর আরও বহু দেশে আছে। ওইসব দেশের নেতারা নিজেদের সম্মান করলে, মানবজাতিকে সম্মান করলে সঙ্গত ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। কারণ, আত্মবিশ্বাসের এবং মনুষ্যত্বের পতাকা উড্ডীন করার এখনই সময়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ