রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মাহমুদ আব্বাসের ‘চরমপত্র’

দীর্ঘদিন পর নীরবতা ভেঙেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। বিষয়টিকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। সম্প্রতি জবরদখল করা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে ইসরাইলকে এক বছরের সময় বেঁধে দিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট। ইহুদীবাদী দেশটিকে চরমপত্র দিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৬৭ সালের আগের সীমানার ভিত্তিতে তিনি কখনোই ইহুদী রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দেবেন না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ভাষণে ইসরাইলকে ওই সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন ফিলিস্তিনি নেতা। যা ফিলিস্তিনি নেতার ইসরাইল বিষয়ে কঠোর মনোভাবের দিকেই ইঙ্গিত বহন করে। ভার্চুয়ালি দেওয়া এ ভাষণে মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন আহ্বান করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তার ভাষায়, ‘আমাদেরকে অবশ্যই বলতে হবে, ১৯৬৭ সালে দখলদার ইসরাইলের পূর্ব জেরুজালেমসহ দখল করে নেওয়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে এক বছরের মধ্যে চলে যেতে হবে।’ আব্বাস মনে করেন, যদি এটি অর্জন করা না যায়, তবে ইসরাইলকে ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে স্বীকৃতি দেওয়ার কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করার ইসরাইলি কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে যাবে ফিলিস্তিনিরা। তবে ফিলিস্তিনি নেতার এসব বক্তব্য অগ্রাহ্য করেছে ইসরাইল। জাতিসংঘে দখলদার ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরডান বলেছেন, আব্বাস আবার প্রমাণ করলেন, তাঁর কথার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। তার ভাষায়, যাঁরা সত্যিকার অর্থে শান্তি ও সমঝোতা সমর্থন করেন, তাঁরা জাতিসংঘের মতো প্লাটফর্মে এ রকম বিভ্রান্তিমূলক আলটিমেটামের হুমকি দেন না। খবরে বলা হয়, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান অর্জনে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া শান্তি প্রক্রিয়া থমকে আছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট আব্বাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের উদ্যোগ নস্যাৎ করার অভিযোগ করেন। পশ্চিম তীর থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে অধিবেশনে অংশ নিয়ে দেওয়া এ ভাষণে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ওই ফর্মুলা রক্ষায় কাজ করার অনুরোধও জানিয়েছেন। যা খুবই বাস্তবসম্মত। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, ১৯৬৭ সালে হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে পশ্চিম তীর দখল করে নিয়ে সেখানে অবৈধ ইহুদী বসতি স্থাপন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এর মধ্য দিয়ে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তিতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছানোর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে ইসরাইল। বিশ্ব সম্প্রদায় ইসরাইলের এ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও অবৈধ বলে বিবেচনা করলেও দেশটি এর সঙ্গে একমত নয়।
ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতি বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। তবে ইসরাইল তা অস্বীকার করেছে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিনকে নিয়ে কোনো একক রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ যৌক্তিক হবে না। ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জনসংখ্যা তাত্ত্বিক নানা কারণে তা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে ইসরাইলের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এক রাষ্ট্র গঠনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে তা তার স্বাধীন ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা গুঁড়িয়ে দেবে।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি জাতিসংঘের অধিবেশনে দেওয়া তাঁর ভাষণে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ধারণার প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, এটি যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশে একটি ইহুদী ও গণতান্ত্রিক ইসরাইল রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ উপস্থিতিই নিশ্চিত করবে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাম্প্রতিক  চরমপত্র কেউ কেউ কথার কথা মনে করলেও বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না কূটনৈতিক মহল। তারা মনে করছেন, ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্রমেই কঠোর হতে কঠোরতর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের কাছে দখলদাররা নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের মনোবল আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তারই প্রতিফলন ঘটেছে মাহমুদ আব্বাসের চরমপত্রে।
মূলত, ইসরাইলী দখলদাররা এখন ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য দখলদারদের অবশ্যই আলোচনার টেবিলে আসতে হবে। অন্যথায় ফলাফল ইহুদীবাদীদের জন্য মোটেই ইতিবাচক  হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ