রবিবার ২৮ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

জানুয়ারির শুরুতেই রাজপথে নামার পরিকল্পনা বিএনপির

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : অক্টোবর মাসের মধ্যেই ঢাকা মহানগরের প্রত্যেকটা ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা করবে বিএনপি। এর পরপরই থানা কমিটি ঘোষণা করা হবে। একইসাথে চলবে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনের কাজ। মহানগরের নব মনোনীত কমিটির নেতারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন, সরকার পতনের আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার আগেই মহানগরের সর্বস্তরের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শেষ করতে চান। চলতি বছরের মধ্যেই কমিটি গঠনের কাজ শেষ করে নতুন বছরেই আন্দোলন শুরু করতে চায় বিএনপি।
সূত্র মতে, গত ২ আগস্ট বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার নির্বাহী কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আবদুস সালামকে আহ্বায়ক ও রফিকুল আলম মজনুকে সদস্য সচিব করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার ৪৯ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। অন্যদিকে আমান উল্লাহ আমানকে আহ্বায়ক ও আমিনুল হককে সদস্য সচিব করে ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির গঠনের কয়েকদিন পরই সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে ঘোষিত আহবায়ক কমিটি। এর মধ্যে তাদের প্রথম টার্গেটই হচ্ছে ওয়ার্ড ও থানাগুলোকে সক্রিয় করা। সেই লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করেন।
বিএনপির শীর্ষ একাধিক নেতা জানান, সরকার পতনের আন্দোলনে এবারের টার্গেট হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। তারই অংশ হিসেবে ঢাকায় সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি সম্প্রতি ঘোষিত ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি করণীয় নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। ইতোমধ্যে থানা-ওয়ার্ড ঢেলে সাজাতে অঞ্চলভিত্তিক টিম গঠন করা হয়েছে। মহানগর বিএনপিতে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে উন্মুক্তভাবে তথ্য ফরম বিতরণ করার কাজও শেষ। জানা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির থানা এবং ওয়ার্ড কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ৮টি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। একেকটি টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন যুগ্ম আহ্বায়ক। পাশাপাশি সংগঠনের আওতাধীন সব ওয়ার্ড কমিটি  দ্রুত ঘোষণা করা হবে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ওয়ার্ডের তথ্য ফরম জমাও হয়েছে। জমা হওয়া ওয়ার্ডগুলোর কর্মী সম্মেলন আগামী কয়েকদিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। তারপর মহানগর কমিটির শীর্ষ নেতারা বসে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্যদের দিয়ে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করবেন। এছাড়া কর্মী সম্মেলনেও নতুন কমিটির নাম ঘোষিত হতে পারে।
জানতে চাইলে মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা অক্টোবরের মধ্যেই ওয়ার্ড কমিটি গঠনের কাজ শেষ করবো ইনশা আল্লাহ। এর মধ্যে কয়েকটি ওয়ার্ডের তথ্য ফরম জমাও হয়ে গেছে। কেমন সাড়া পাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে পরিমাণ তথ্যফরম জমা হচ্ছে সেটি অবিশ্বাস্য। কোনো কোনো ওয়ার্ড থেকে চার শতাধিক তথ্য ফরম জমা হয়েছে। এদের সবাই নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। আগামী দিনে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে মহানগরের আন্দোলন কর্মসূচি সফলের লক্ষ্যে রাজধানীর তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বদ্ধপরিকর বিএনপির হাইকমান্ড। সে লক্ষ্যে চলতি বছরের মধ্যেই মহানগরের সব ধরণের কমিটির গঠনের কাজ শেষ করা হবে বলে তিনি জানান। অপর এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক বলেন, যারা জিয়া পরিবারের প্রতি অনুগত এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও দেশনায়ক তারেক রহমানের ওপর আস্থাশীল তাদের সমন্বয়েই তৃণমূল কমিটি গঠন করা হবে। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে কার কি অবদান রয়েছে সেসব মূল্যায়ন করা হবে। কোনো ভাইয়ের অনুসারী হলেই কাউকে আর পদ দেয়া হবে না। যারা বিএনপি ও জিয়া পরিবারের জন্য কাজ করবে তাদেরকেই মূল্যায়ন করা হবে। যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সাথে মতবিনিময় হয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা উত্তর বিএনপির আটজন যুগ্ম আহ্বায়ককে সাংগঠনিক টিমের আহ্বায়ক করা হয়েছে। তাদেরকে যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনধিক এক মাসের মধ্যে থানা কমিটি পুনর্গঠনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, মহানগরীর মূল কমিটির নেতারা থানা কমিটিতে থাকতে পারবেন না। জানা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা মহানগর বিএনপিকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সময়ের মধ্যে দল পুনর্গঠনের নির্দেশ ও দায়িত্ব দিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তরে বিএনপির ২৫টি থানা এবং ৫৮টি ওয়ার্ড শাখা রয়েছে। অন্য দিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণে ২৪টি থানা এবং ৭৫টি ওয়ার্ড শাখা রয়েছে। মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের দফতর সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ৪ জুন উত্তরের অধীন ২৫টি থানা এবং ৫৮টি ওয়ার্ডে সাত সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ আংশিক কমিটিই পূর্ণাঙ্গ হয়নি। অন্যদিকে দক্ষিণে ২০টি থানা এবং ১৪টি ওয়ার্ডে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাকি থানা ও ওয়ার্ডগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই খুঁড়িয়ে চলছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। রাজধানীতে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক জড়তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, মৎস্যজীবী দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, জাসাস, ওলামা দল, জিয়া পরিষদসহ দশটি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সাথে দফায় দফায় মতবিনিময় করছেন মহানগর নেতারা।
এদিকে নতুন বছরের শুরুতেই রাজপথে নামার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। বিএনপি নেতারা বলছে, এর আগে দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কাজ শেষ করা হবে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের দাবিতে আন্দোলনে নামবে বিএনপি।
দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক বৈঠকে নেতারা আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ ইসির অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এখন আমরা স্থায়ী কমিটির সভায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। তিনি আরও বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাকর্মীদের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন। বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রস্তুতি শেষে আলাপ-আলোচনা করে সঠিক সময়ে আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। সময় হলে আমরা দেশবাসীকে জানিয়ে দেব। জনগণকে আমাদের সঙ্গে রাজপথে নামার আহ্বান জানাব। আমরা আন্দোলনেই আছি। আরও কঠোর আন্দোলনে আমরা যাব।  
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হবে। তার আগে গঠন করা হবে নতুন ইসি। তাই সরকার যাতে নিজের পছন্দমতো ইসি গঠন করতে না পারে সে জন্য জানুয়ারির শুরুতেই আন্দোলন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তার আগে বিএনপির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ ইসি গঠনে দলের মতামত দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির প্রস্তাবনা তুলে ধরা হবে। বিএনপির হাইকমান্ডও দ্রুত আন্দোলনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে, সামনে রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচি দেয়া হবে। যেসব দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা মাঠে থাকবে না তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। নেতারা বলেছেন, আন্দোলন শুরুর আগে বিএনপিসহ অঙ্গ-সংগঠনগুলো গোছানোর পরামর্শ এসেছে ধারাবাহিক বৈঠকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ