রবিবার ২৮ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে সার্ভার জটিলতায় ভোগান্তিতে টিকাপ্রত্যাশীরা

গণটিকার জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইন। ছবিটি গতকাল মঙ্গলবার নারিন্দা ফকির চাঁন কমিউনিটি সেন্টার থেকে তোলা -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে সারাদেশে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় ৭৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার টিকা দিতে মানুষের লম্বা লাইন হলেও সার্ভার জটিলতায় লাইন সামনে আগাচ্ছিল না। টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়েও চরম ভোগান্তি দেখা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে সারাদেশে ৭৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্ধারিত সংখ্যক টিকা দেওয়ার কথা রয়েছে। আজ টিকা দেওয়া শেষ না হলে আগামীকালও এ টিকাদান কর্মসূচি চলবে। আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকাদান করা সম্ভব হবে।  প্রধানমন্ত্রীর ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে ২৫ বছরের বেশি বয়সী মোট ৭৫ লাখ পুরুষ ও নারী জনগোষ্ঠীকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আজ দেশব্যাপী হাজার হাজার কেন্দ্রে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্য কেন্দ্রেও উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা যায়। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দুপুর আড়াইটা থেকে টিকাদান শুরু হয়েছে। আগামীকালও তারা টিকাদান কর্মসূচি চালাবে বলে আগাম ঘোষণা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিকাদান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একাধিক স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, সার্ভার জটিলতার কারণে সকালের দিকে অনেকেই টিকা নিতে না পেরে ফিরে গেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ ও টিকাদানের জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রচার-প্রচারণা না থাকায় টিকা গ্রহণেচ্ছুদের ভিড় কম হয়েছে। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারদের অনেকেই বলেছেন, তারা প্রচার-প্রচারণা বা প্রস্তুতির জন্য খুবই কম সময় পেয়েছেন।
এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এক ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ২৫ বছরের বেশি বয়সী নিবন্ধনকারীদের ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে টিকা গ্রহণের জন্য ডাকা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও নিবন্ধন কার্ড সঙ্গে এনে টিকা নিতে পারবেন। তবে আজ অনেকেই ক্ষুদে বার্তা পাননি বলে আসেননি। আবার অনেকেই ক্ষুদে বার্তা না পেলেও এসেছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুপুর আড়াইটা থেকে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। টিকা দিতে মানুষের লম্বা লাইন হলেও সার্ভার জটিলতায় লাইন সামনে এগোচ্ছে না। টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে চরম ভোগান্তি দেখা গেছে। মিরপুর-২, মনিপুর ও আহমেদনগরের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ওই এলাকার বিভিন্ন স্কুলে টিকাকেন্দ্র বসানো হয়েছে। মানুষের ভিড় বেশি হওয়ায় লাইন রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। নারী ও পুরুষের আলাদা লাইন তৈরি করা হয়েছে। দুজনকে একসঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করানো হচ্ছে। তারা বেরিয়ে গেলে অন্য দুজন ভেতরে পাঠানো হচ্ছে। দেখা গেছে, টিকা গ্রহনেচ্ছুরা ভেতরে যাওয়ার পর তার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে সরকারি সার্ভারে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে। সেটি সফল হলে তিনি টিকা পাচ্ছেন। সার্ভারে নানা ধরনের জটিলতা ও সবার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তথ্য না মেলায় অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টিকা পাচ্ছেন না। এজন্য বাইরে অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষের লাইন কমছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
কেউ কেউ আবার দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা না পেয়ে বিরক্ত হয়ে চলে গেছেন। আসমা বেগম তার স্বামীকে নিয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে টিকা না পেয়ে চলে যাওয়ার সময় বলেন, বাসায় ছোট বাচ্চা রেখে এসেছি, দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি আর সম্ভব নয়। আগামীকাল বুধবার এ কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে তাই কাল সকালে আসবেন বলে জানান তিনি। জানতে চাইলে মিরপুর-১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইসমাইল মোল্লা জানান, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটা থেকে টিকা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর আগে শতাধিক নারী-পুরুষ উপস্থিত হন। সারিবদ্ধভাবে টিকা কার্যক্রম শুরু করা হলেও সার্ভার জটিলতার কারণে দ্রুত টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রতি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৫০০ জন করে দুদিনে এক হাজার জনকে টিকা দেওয়া হবে। যারা এরই মধ্যে ডিএনসিসি এলাকার যেকোনো হাসপাতালে টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন তবে এখনো এসএমএস পাননি তারাও এ কার্যক্রমের আওতায় টিকা নিতে পারবেন। এদিকে নিবন্ধন ছাড়া মেয়ের সঙ্গে টিকা নিতে কেন্দ্রে আসেন ৭৫ বছর বয়সী সালমা বেগম। মাকে কেন্দ্রে রেখেই নিবন্ধন করতে কম্পিউটারের দোকানে যান মেয়ে পারুল। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিবন্ধন না করেই তাকে টিকা কেন্দ্রে ফিরে আসবে হয়। অবশেষে টিকা না দিয়েই বাসায় ফিরতে হয় সালমা বেগমকে। দুপুর আড়াইটায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩নম্বর ওয়ার্ডের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র ৩-এ গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।
গতকাল রাজধানীর শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, টিকা নিতে মানুষজন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাসপাতালটির সূত্র জানিয়েছে, সকাল নয়টা থেকেই টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সারাদিনে এখানে ৯০০ ডোজ টিকা প্রয়োগের টার্গেট রয়েছে। সবাইকেই মর্ডানার টিকা দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২৯টি কেন্দ্রে টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় আজ ৫৪টি ওয়ার্ডের নির্ধারিত সব কেন্দ্রে টিকা কার্যক্রম চলবে।
উল্লেখ্য, গতকাল টিকা কার্যক্রম নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম এক ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে ৭৫ লাখ ডোজ টিকা প্রয়োগ হবে। এর পাশাপাশি অন্যান্য দিনের নিয়মিত ৫ লাখ টিকা প্রয়োগও চলবে। তিনি জানান, টিকা নেয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিকাকার্ড সঙ্গে আনতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি ইউনিয়নের কোনো একটি ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে একটি বুথ, পৌরসভার প্রতিটি কেন্দ্রে একটি কেন্দ্রে একটি বুথ, সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে ৩টি বুথের মাধ্যমে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। সারাদেশে আগে থেকে যেসব কেন্দ্রে টিকাদান কর্মসূচি চলছিল সেগুলো অব্যাহত থাকবে।
তবে পাড়া-মহল্লায় টিকা নিতে আসা অনেকেই ‘নির্দিষ্ট কেন্দ্র’ জটিলতায় ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। এদিন পার্শ্ববর্তী কেন্দ্রে গেলেও অনেকে টিকা নিতে পারেননি। কেন্দ্র থেকে তাদের বলা হচ্ছে, যেখানে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে সেই কেন্দ্রে যেতে। সাধারণ নাগরিকেরা বলছেন, গত সোমবার  মহল্লায় মাইকের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে, এদিন টিকা নিতে কোনো এসএমএস লাগবে না। এটা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের উপহার। তবে কেন্দ্রগুলোর দায়িত্বরতরা বলছেন, গণটিকা নিতে হলে যে কেন্দ্রে রেজিস্ট্রেশন করেছেন বা রেজিস্ট্রেশনে যে কেন্দ্র রয়েছে তাকে সেখান থেকে টিকা নিতে হবে।
মোজাম্মেল হক সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর বাগিচা এলাকায় নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন টিকা নিতে। সকাল ৯টার দিকে তাকে বলা হয়, আপনি তিলপাপাড়া কেন্দ্র থেকে টিকা নিতে পারবেন। তিনি তিলপাপাড়া কেন্দ্রে গেলে সেখানেও বলা হয় অন্য কেন্দ্রে যেতে। সবশেষে ফিরে আসেন বাগিচা কেন্দ্রে। সেখানে দায়িত্বরতরা বলেন, এখানে তিনি টিকা নিতে পারবেন না, কেন্দ্র যেখানে আছে সেখান থেকেই নিতে হবে। এ বিষয়ে মোজাম্মেল হক জানান, আমি প্রথমে মুগদা মেডিকেলে যাই টিকা নিতে। সেখানে বলা হয়, নিজ নিজ এলাকায় টিকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে নিতে হবে। আমি সকাল থেকে ১১টা পর্যন্ত ঘুরছি নানা কেন্দ্রে, কিন্তু টিকা নিতে পারিনি। অথচ আগের দিন মাইকে বলা হয়েছিল, মঙ্গলবার টিকা নিতে কোনো এসএমএম লাগবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ