সোমবার ২৯ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

গ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়াচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : টাকা জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, পরিষেবা বিল পরিশোধ ও প্রবাসী আয় তুলতে প্রত্যন্ত এলাকায় এখন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সেবা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দিন দিন বেড়েই চলেছে এজেন্ট, আউটলেট ও গ্রাহকসংখ্যা। করোনাকালে এই সেবায় নির্ভরতা বেড়েছে গ্রাহকদের। এখন পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের সরকারি-বেসরকারি ২৮টি ব্যাংক। এর মধ্যে তিনটি ব্যাংক এজেন্ট নিয়োগ, আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ ও রেমিট্যান্স আহরণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কর্মকাণ্ড শহরের চেয়ে গ্রামে বাড়ছে বেশি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিষেবা গ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়াচ্ছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ২৩টি ব্যাংকের এজেন্ট ছিল ৮ হাজার ৭৬৪টি। চলতি বছরের জুন শেষে ৫টি এজেন্ট ব্যাংক বেড়ে বর্তমানে ২৮ টি। এ ব্যাংকগুলোর এজেন্টের সংখ্যা ১২ হাজার ৯১২-এ দাঁড়িয়েছে। করোনাকালের এক বছরে ব্যাংকগুলোর এজেন্ট সংখ্যা বেড়েছে ৪৭.৩৩%। এজেন্টের মতোই গত এক বছরে ৪ হাজার ৬৯৬টি আউটলেট বেড়েছে। ২০২০ সালের জুন শেষে এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪৪৯টি। চলতি বছরের জুন শেষে আউটলেটের সংখ্যা ১৭,১৪৫ এ উন্নীত হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে আউটলেট বেড়েছে ৩৭.৭২ শতাংশ।
২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চালু করা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ ৫৮ হাজার ১৯০। করোনাকালের এক বছরে ৪৮ লাখ ৪৭ হাজার ১৬৮টি নতুন ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে এজেন্টদের মাধ্যমে চালু করা ব্যাংক হিসাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫৩৫৮টি। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক হিসাবের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৫.৮৭ শতাংশ। করোনাকালের এক বছরে এজেন্টদের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানত বেড়েছে ৯৯ শতাংশের বেশি। গত বছরের জুন শেষে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ২২০ কোটি ২১ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুনে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩৭৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২০ সালের জুনে এজেন্টদের মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭২০ কোটি টাকা।  কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ হিসাবে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৪২ শতাংশেরও বেশি।
পরিসংখ্যান বলছে, করোনাকালের এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের হিসাব বেড়েছে ৬৫.৮৭ শতাংশ, আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯৯.৪০ শতাংশ। একই সময়ে বিতরণকৃত ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৪২.২১ শতাংশ। অন্যদিকে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫৫ শতাংশে। ২০২০ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, শহরে শাখার সংখ্যা বেশি থাকায় গ্রাহকরা শাখা থেকেই ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছে। তবে অনেক বাজারে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম রয়েছে। তবে গ্রামে শাখার সংখ্যা কম হওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটছে। গত এক বছরের ব্যবধানে গ্রামে এজেন্ট বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। শহরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। আউটলেট গ্রামে বেড়েছে ৮৭ শতাংশ এবং শহরে বেড়েছে ১৩ শতাংশ। গ্রাহকের সংখ্যা গ্রামে বেড়েছে ৮৬ শতাংশ এবং শহরে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। হিসাবের মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব সবচেয়ে বেশি। মোট হিসাবের মধ্যে সাড়ে ৮৫ শতাংশ সঞ্চয়ী, চলতি হিসাব আড়াই শতাংশ এবং ২০ শতাংশ অন্যান্য হিসাব। রেমিট্যান্সের মধ্যে গ্রামে বিতরণ করা হয়েছে ৯১ শতাংশ এবং শহরে ৯ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় শীর্ষে রয়েছে ব্যাংক এশিয়ার ২৭ দশমিক ২২ শতাংশ, দ্বিতীয় অবস্থানে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ২৭ শতাংশ, তৃতীয় অবস্থানে ইসলামী ব্যাংকের ১৪ শতাংশ, চতুর্থ সিটি ব্যাংকের সাড়ে ৭ শতাংশ এবং পঞ্চম অবস্থানে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাড়ে ৩ শতাংশ আউটলেট রয়েছে। হিসাবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ব্যাংক এশিয়ার ৩৬ শতাংশ, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ৩৩ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকের সাড়ে ১৫ শতাংশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাড়ে ৩ শতাংশ এবং অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ৩ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি আমানত সংগ্রহ করে ইসলামী ব্যাংক সাড়ে ৩৩ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ১৫ শতাংশ, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ১৫ শতাংশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১৩ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক ১১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করে ব্র্যাক ব্যাংক ৬৩ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ২০ শতাংশ, সিটি ব্যাংক ১১ শতাংশ, আল-আরাফাহ ব্যাংকের সাড়ে ৩ শতাংশ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের আড়াই শতাংশ। তবে এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান ব্র্যাক ব্যাংকের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি সচল ছিল। এরইফলে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর জমানো টাকা ব্যাংকে আসতে শুরু করেছে। তারা বলছেন, তথ্য-প্রযুক্তির যুগে খুব সহজে ব্যাংকিং সেবা নিতে মরিয়া গ্রাহকরা। গ্রাহক সন্তুষ্টির কথা মাথায় রেখে তীব্র প্রতিযোগিতা হয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে। এজেন্টের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সহজ হচ্ছে। গ্রাহকরা শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল-সর্বত্রই ব্যাংকিং সুবিধা নিতে পারছেন। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকরা সন্তোষ প্রকাশ করছেন। তাই দিনকে দিন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে এজেন্ট ব্যাংকিং। তথ্য বলছে, করোনাকালের এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ১৫৫ শতাংশ। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এজেন্টদের মাধ্যমে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ২৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৬৭ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করার জন্য ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে। ২০১৪ সালে ব্যাংক এশিয়া প্রথমে সেবাটি চালু করে। কোন ধরনের বাড়তি চার্জ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, মহানগর ও সিটি করপোরেশন ছাড়া যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই, এমন পৌর ও শহর অঞ্চলেও এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া যায়। তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে জনগণকে ব্যয়সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা হয়। এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বর্তমানে চেক দিয়ে নগদ টাকা উত্তোলন ছাড়া যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম করা যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ