বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

স্বাধীনতার ৫০ বছরে হারিয়ে গেছে ৫২০ নদী

# জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইনের খসড়া এখনও চূড়ান্ত হয়নি
মুহাম্মদ নূরে আলম : স্বাধীনতার পর দেশে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। ২০২১ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার কিলোমিটারে। অর্থাৎ বিগত ৫০ বছরে ১৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বি আইডব্লিউটিএ) সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে সচল ৬ হাজার কিলোমিটার নৌ-পথও শঙ্কামুক্ত নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি। মূলত পলি ও বালু পড়ে নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং দূষণ-দখল ছাড়াও  নিয়মিত নদী খনন না করাকে এ জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। নদী গবেষকরা বলছেন, ষাটের দশকে সাড়ে সাতশ নদী ছিল বাংলাদেশে। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে মাত্র ২৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। ৫০ বছরে হারিয়ে গেছে ৫২০টি নদী। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবাহিত ২৩০ নদীর মধ্যে ৫৯টি আন্তর্জাতিক। তবে সরকারি হিসেবে দেশে নদীর সংখ্যা ৪০৫। শুকনো মৌসুমে এসব নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। ফলে বদলে যাচ্ছে নদীগুলোর গতিপথ, শুকিয়ে মরে যেতে যেতে দেশের মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী। বাংলাদেশে নদীর প্রকৃত সংখ্যা কত, তা কেউ জানে না। নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, দপ্তর এমনকি নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট কারও কাছেই এ পরিসংখ্যান নেই। ২০১৩ সালে গঠন করা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছেও নেই। বিভিন্ন সূত্রে নদীর যে সংখ্যা জানা যায়, সেই সংখ্যায় বিস্ময়কর রকমের পার্থক্য। ২৩০ থেকে ২ হাজার পর্যন্ত সংখ্যা পাওয়া যায়।
এদিকে দেশের নদীগুলো রক্ষায় আরও কঠোর হওয়ার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়।  সেটি সংশোধনের উদ্দেশে খসড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সেই খসড়া আট মাসেও চূড়ান্ত করা যায়নি। গত বছরের ডিসেম্বর এই আইনের সংশোধন করে খসড়া প্রণয়ন করা হয়। এরপর সবার মতামতের জন্য আলোচনা সভা করা হয়, কমিশনের ওয়েবসাইটেও দেওয়া হয়। সবার মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করে সেটি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু সে খসড়া আট মাসেও চূড়ান্ত করা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি আবারও এ বিষয়ে কমিশনের কাছে নতুন করে আগের আইনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে নৌ-মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের সদ্য কামরুন নাহার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, খসড়া তো আমরা অনেক আগেই জমা দিয়েছি। এরপর আবার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে কাজটি দ্রুত করার অনুরোধও করেছি। কিন্তু তারা গত সপ্তাহে আবার মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে আগের আইনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে। আমরা এখন সে বিষয়ে কাজ করছি। এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল রোববার পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশও নানা কর্মসূচি পালন করবে। নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার পালন করা হয় বিশ্ব নদী দিবস। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো  দিবসটির এবারের মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে রিভারস ফর কমিউনিটি বা  মানুষের জন্য নদী।
এদিকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে বি আইডব্লিউটিএ’র পুরনো সাতটি ড্রেজার। অভ্যন্তরীণ নৌ-পথের নাব্যতা সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত সাতটি ড্রেজারের মধ্যে দুটি (ডেল্টা-১ ও ডেল্টা-২) ১৯৭২ এবং বাকি পাঁচটি ১৯৭৫ সালে সংগৃহীত। প্রায় অকেজো এসব ড্রেজারের ফলে গতিহারা হয়ে পড়েছে নৌ-পথের নাব্যতা রক্ষা কার্যক্রমও। ড্রেজিং বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর নাব্যতা উদ্ধার করা সম্ভব না হলে সচল নৌ-পথও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে নৌযান চলাচল।
নদী দখলমুক্ত করতে গিয়ে সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল রোববার মুজিব শতবর্ষ ও বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর নদী ও পরিবেশ ভাবনা এবং আমাদের করণীয় শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, দূষিত সমাজ ব্যবস্থার কারণে নদীগুলো দূষিত হয়ে গেছে, দখল হয়ে গেছে। এই যে দুরবস্থা, এটা এমনি এমনি আসেনি। কিছু মানুষ ভাবতো জায়গা ফাঁকা আছে, এটাই আমার পছন্দ, এটা আমার দখল করতে হবে। এভাবেই কিন্তু হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আমরা যখন ঢাকার চারপাশে নদী দখল উচ্ছেদ শুরু করলাম, আমরা কিন্তু দেখিনি কোনটা কার জায়গা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তখন তিনি আমাদের সাহস দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে এমন একজন নেতাকে পেয়েছি যার সাহস আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়, আমাদের উৎসাহ জোগায়। তিনি যে সাহস আমাদের দিয়েছেন, সেই সাহসে আমরা কাজ করছি। এই ঢাকার চারপাশ আমরা দখলমুক্ত করেছি। সেগুলোকে রক্ষা করার জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি। তিনি বলেন, নদী দখলমুক্ত করতে গিয়ে সরকারকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পঁচাত্তরের পর একটি ধারা তৈরি হয়, মানুষ মনে করেছিল অপরাধ করলে বিচার হবে না, নদী দখল করলে বিচার হবে না। অনেকে নদীর পাড়ে গিয়ে ঘর তুলেছে, অনেকে নদীর পাড়ে কলকারখানা গড়ে তুলেছে। তারা মনে করেছে এটা দখল নয়, এটা আমার প্রাপ্য অধিকার। এই মনে করে কিন্তু অনেকে নদীর পাড় দখল করেছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, নদীগুলো রক্ষা করে এর প্রবাহ নিশ্চিত করাই- নদী দিবসের অঙ্গীকার। পঁচাত্তর-পরবর্তী দূষিত সমাজ ব্যবস্থার কারণে নদীগুলোও দখল ও দূষণের কবলে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু নদী নিয়ে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন; তা তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
পানি ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের দেশের বড় নদ-নদীগুলোর মধ্যে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা ভাটির সময় প্রচুর পরিমাণ পলি ও বালু পরিবহন করে। ফলে নদী নাব্য থাকলেও কয়েক বছরের মধ্যে সেটিও ভরাট হয়ে যেতে পারে। যদি এ সমস্ত রুটে স্থাপিত ফেরির অবস্থা দেখি তাহলে দেখা যাবে নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে প্রতি বছরই ফেরিঘাট এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এজন্য ফেরি আসা-যাওয়ার চ্যানেলে পরিকল্পিত খনন জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ডের নদী বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় নদী জরিপ করে নেডেকো রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এই রিপোর্ট এবং ১৯৭৫ সালে বি আইডব্লিউটিএ’র জরিপ থেকে দেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৭৬ সাল থেকে বিভিন্ন নৌ-পথের নাব্যতা কমতে শুরু করে। ১৯৭৭ সালের মধ্যে ২১৬ মাইল নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালে বন্ধ হয় আরও ২১ কিলোমিটার। সেই নৌপথ কমতে কমতে এখন প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারে নেমেছে। অর্থাৎ পলি ও বালু পড়ে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং দূষণ ও দখলের কারণে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার নৌ-পথ বন্ধ হয়ে গেছে। শীতের দিনে বিভিন্ন অঞ্চলের নদী-বিল-হাওর-বাঁওড় শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এই দৈর্ঘ্য সাময়িকভাবে কমে গিয়ে মাত্র সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারে নেমে আসে।
দেশে বর্তমানে সচল নৌপথের মধ্যে বারো থেকে তের ফুট গভীরতা সম্পন্ন প্রথম শ্রেণির নৌপথ রয়েছে মাত্র ৬৮৩ কিলোমিটার। সাত থেকে আট ফুট গভীরতার দ্বিতীয় শ্রেণির নৌপথ রয়েছে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার। পাঁচ থেকে ছয় ফুট গভীরতার তৃতীয় শ্রেণির নৌপথ রয়েছে ১ হাজার ৮৮৫ কিলোমিটার। পাঁচ ফুটের নিচে বাকি নৌপথ, যা নৌযান চলাচলের অযোগ্য। পানির গভীরতা পাঁচ ফুটের নিচে নেমে আসায় সম্প্রতি ৪০৭ কিলোমিটার নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলো হচ্ছে কিশোরগঞ্জের পাগলামোড়-মোগনগঞ্জে কংস নদে ৪৩ কিলোমিটার, খুলনা-কালিকাপুর রুটে মধুমতী নদীতে ১৩৮ কিলোমিটার, কালিকাপুর-নন্দপাড়ার মধুমতী নদীতে ৫৬ কিলোমিটার, যশোরের কপোতাক্ষ-টেপাখালীতে ৮৫ কিলোমিটার এবং পাইকগাছা-আশাশুনি-প্রতাপনগরে ৮৫ কিলোমিটার নৌপথ।
বি আইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ দাবি করেছে, অভ্যন্তরীণ নৌ-পথ সচল রাখার স্বার্থে নদ-নদী খননের জন্য ৫৩টি নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার ড্রেজিংসহ পানিসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও নতুন নতুন ড্রেজার সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে উঠছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের যেসব ড্রেজার আছে তা সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ কাজে ব্যবহার হওয়ায় এসব ড্রেজার অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা রক্ষায় কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চাইলে পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. এনামুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, পলি এবং বালু জমা হওয়ার ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এজন্য নদীতে ড্রেজিং জরুরি। আমাদের দেশে কেবলমাত্র জরুরি নৌ-যান চলাচলের জন্যই বিশেষ মুহূর্তে নদী খনন করা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, দূষণ ও দখলের কারণেও বহু নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে নদীর পরিধি আরো কমে যায়। এভাবে প্রতিনিয়ত নৌপথ হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি দুর্নীতি না করে যথাযথভাবে নিয়মিত নদী খননের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
নদী গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দীর এক গবেষণায় জানাযায়, বর্তমানে কপোতাক্ষের কপিলমুনি অংশ একবারে শুকিয়ে গেছে। এর নিচের অংশে জোয়ারে পানি আসার পরিমাণ কমছে। ফলে এ অংশও দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কপোতাক্ষ নদের দৈর্ঘ্য মোট ৩৬৭ কিলোমিটার। উত্তরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এ নদের ওপরের অংশ, যাকে ভৈরব অববাহিকাও বলা হয়। এর দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার, তাহিরপুর থেকে খুলনার পাইকগাছার শিববাড়ী পর্যন্ত বর্তমান কপোতাক্ষ, যার দৈর্ঘ্য ১৭৫ কিলোমিটার; আর রাড়ুলী থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত কপোতাক্ষের বিচ্ছিন্ন অংশ, যার দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার। এ নদের তাহিরপুর থেকে কপিলমুনি পর্যন্ত অংশে বর্তমানে আর প্রবাহ নেই।
বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর বাইরে স্থানীয় ছোট নদীগুলোকে চিহ্নিত করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। উইকিপিডিয়ায় দেখা গেছে, প্রধান নদীগুলোর বাইরে বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড চিহ্নিত স্থানীয় নদীর সংখ্যা মাত্র ৪০৫টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব নদীর বেশিরভাগই শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। ফলে নাব্যতা হারাতে হারাতে এগুলো চলে গেছে দখলদারদের হাতে। ফলে মানচিত্র থেকে বিদায় নিচ্ছে বহু নদী ও ছোট বড় জলাশয়। চিত্রা নদীর উৎপত্তি চুয়াডাঙ্গা জেলায়। বাংলাপিডিয়া অনুসারে, চুয়াডাঙ্গা ও দর্শনার নিম্নাঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দর্শনা, কালীগঞ্জ, শালিখা ও কালিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রায় ১৭০ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে নড়াইল জেলার গাজীরহাটে নবগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলেছে। নড়াইল শহরের বাঁধাঘাট এলাকা থেকে চিত্রা নদীর পথ ধরে উত্তর এবং দক্ষিণে যেদিকেই যাওয়া যাক দেখা যাবে নদীর কোল ঘেঁষে সারি সারি বাড়ি। একতলা থেকে বহুতল বাড়ি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কাউসার আহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, নদী রক্ষায় এবং নদী খননে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আগের তুলনায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ এখন চোখে পড়ছে। আমাদের সবাইকে এ বিষয়ে আরও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন নদীদূষণ রোধ করা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিপর্যায়েও নদী রক্ষার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০০৫ সালে বাংলাদেশের নদ-নদী শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল। সেখানে দেখানো হয়েছিল নদ-নদীর সংখ্যা ৩১০টি। অনেক দিন দেশে সেটারই প্রচলন ছিল। এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আরও খানিকটা অনুসন্ধান করে গ্রন্থটি ছয় খণ্ডে প্রকাশ করেছে। সেখানে নদ-নদীর সংখ্যা বলা হয়েছে ৪০৫টি। অনেকেই এই সংখ্যাকে নদীর সংখ্যা হিসেবে গণনা করছেন। কোনো কোনো সূত্রমতে, নদীর সংখ্যা ২৩০টি। শিশু একাডেমি প্রকাশিত শিশু বিশ্বকোষে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা বলা হয়েছে ৭০০-এর অধিক। অশোক বিশ্বাস নদীকোষ শীর্ষক গ্রন্থেও সাত শতাধিক নদীর সংখ্যা উল্লেখ করেছেন। মোকারম হোসেন বাংলাদেশের নদী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা হাজারটি। মাহবুব সিদ্দিকী আমাদের নদ-নদী গ্রন্থে লিখেছেন নদ-নদীর সংখ্যা সহস্রাধিক। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর আমার পরিচয়’ কবিতায় লিখেছেন তেরশত নদী শুধায় আমাকে কোথা থেকে তুমি এলে? ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র নদীসংখ্যায় বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ২৩০ থেকে ২৭০টি বলে উল্লেখ রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে লঞ্চ, স্টিমার, কার্গো, ট্রলার, ফেরি নৌকা এবং বার্জের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন মালামাল পরিবহন হয়। নৌপথে পরিবহন ব্যয় সড়কপথের চেয়ে অন্তত ২০ গুণ কম হয়। নদীর নাব্যতা না থাকায় শীতকালে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, যা দেশে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশ আন্দোলনের নেতা আলমগীর কবির বলেন, নদীগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিবিড়। বাংলার নদ-নদীগুলোর অপমৃত্যু জীবনের ওপর শুধু ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করবে না, জাতীয় জীবনের সব অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেবে। দেশের সব নদ-নদীতে বছরে প্রায় এক হাজার ৪০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। এর মধ্যে ভারত থেকে আসা নদীগুলো বয়ে আনে প্রায় এক হাজার ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার। বাকি ৩৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাত থেকে আসে। বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ এই বিপুল জলরাশির দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। কিন্তু ভারত পদ্মা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার পর বন্যার চরিত্র পাল্টে যায়। দেশে আগ্রাসী বন্যা হয় ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪ ও ২০১৭ সালে। প্রাণহানি কিংবা আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে এসব বন্যা পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। প্রলয়ংকরী এসব বন্যার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মানুষ সৃষ্ট কারণকেই দায় দিচ্ছেন। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করে শাখা, উপ-নদী বন্ধ করে দেওয়া, নাব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ, অনেক নদী মরে যাওয়া, খাল-বিল ভরাটের কারণেই প্রলয়ংকরী বন্যা হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা।
ফারাক্কা নির্মাণের চার দশকের মধ্যে পদ্মাসহ দেশের বড় বড় নদীগুলোর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পদ্মা নদীর বড় অংশে চর পড়েছে। কৃষি কাজে সেচেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব। আর তিস্তার উজানে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ দেওয়ায় তিস্তায়ও মিলছে না পানি। ফলে মিঠা পানির নদীতে ঢুকে পড়ছে সমুদ্রের লোনা পানি। ভারত, নেপাল ও ভুটান ৫৫২টি বাঁধের মাধ্যমে দুই লাখ ১২ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে হিমালয় থেকে নেমে আসা বিভিন্ন নদীর ওপর ৪২৯টি বাঁধ দিয়ে এক লাখ ২৬ হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ভারত। এসব প্রকল্পের বেশ কিছুর নির্মাণকাজ চলছে, বাকিগুলো প্রস্তাবিত। চীন ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তিস্থলে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। তিব্বতের অংশে ইয়ারলাং স্যাংপো নামের এই নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও মঙ্গোলিয়ার ভেতরের দিকে পানি নিয়ে যাবে চীন। এতে চীন থেকে ভারত অংশে ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমবে, আরো কমে যাবে বাংলাদেশ অংশে। বাঁধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করা ভারতীয় বিশেষজ্ঞ শ্রীপাদ ধর্মাধীকারী ‘মাউন্টেইন অব কংক্রিট : ড্যাম বিল্ডিং ইন দ্য হিমালয়াস’ শীর্ষক গবেষণায় বলেছেন, ‘এ ধরনের বাঁধ নির্মিত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্যানুযায়ী, তুরাগে ১৫২টি সীমানা পিলারের মধ্যে ৯০টিই অবৈধ দখলের কারণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। নদী দখলের এই চিত্র সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের নদীর প্রাণহীন হওয়ার জীবনচিত্রকেই তুলে ধরে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের নেতা ড. আব্দুল মতিন গণমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নদীর পক্ষে থাকতে হবে। সরকারকে ‘নদী নীতি’ করতে হবে। এই দেশে বহু অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নীতি থাকলেও নদী নিয়ে নীতি নেই। সেই নীতি বাস্তবায়নে সংসদে আইন পাস করতে হবে। সরকার শক্ত হলে নদী রক্ষা পাবে। কারণ দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী দখল করে থাকেন সাধারণত সরকারি দলের স্থানীয় নেতারা। তিনি আরো বলেন, ‘ভুল উন্নয়ননীতি আমাদের নদীকে ধংস করেছে। নদী শাসন নয়। নদীকে নষ্ট না করে তার সঙ্গে কিভাবে সহাবস্থান করা যায়, সেটি ভাবতে হবে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলছে, ৫০ বছরে দখলমুক্ত হয়েছে মাত্র ২৯ ভাগ নদী। এ অবস্থায় বি আইডব্লিউটিএ বলছে, নদীর সীমানা রক্ষায় ডিসেম্বরের মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে বসবে ১০ হাজার সীমানা পিলার। সেই সঙ্গে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে চলতি মাস থেকে শুরু হবে ক্রাশ প্রোগ্রাম। নদীর বুকে সারি সারি ইটভাটা। আছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বালুমহাল, ডক ইয়ার্ড, বসতভিটাও। দখলের এমন নগ্ন চিত্র বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আর শীতলক্ষ্যা নদীকে ঘিরে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলছে, স্বাধীনতার পর দেশের নদ-নদীগুলো দখলে মহোৎসবে মেতে উঠে একশ্রেণির দখলদাররা। চলতি বছরের এ পর্যন্ত এমন ৪৪ হাজার ৪৬৭ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৫৩৭ জন নদীখেকো, দ্বিতীয় স্থানে ঢাকা- যেখানে আছে ১৪ হাজার ৭৮৯ জন। বিপুলসংখ্যক দখলদার চিহ্নিত হবার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির একেবারেই হাতেগোনা।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এএসএম আলী কবীর গণমাধ্যমকে বলেন, নদীতীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের হার ২৯ দশমিক ৬৯, যা একেবারে হাতাশাজনক, এটা আশাব্যঞ্জক হওয়া দরকার। নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে দেশের ঊচ্চ আদালত নদী দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ব্যবস্থা নিতে ১৭ দফা নির্দেশনাও দিয়েছেন হাইকোর্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ