শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ভারতে ইলিশ রফতানি

এবারের ভরা মওসুমেও বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যে ইলিশ মাছ জোটেনি। এর একটি কারণ অত্যধিক মূল্য আর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এসেছে ভারতে ইলিশ রফতানি। বিগত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রকাশিত বিভিন্ন খবরেও জানানো হয়েছে, মূলত ভারতে রফতানির কারণে রাজধানীসহ দেশের সকল এলাকার বাজারেই ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্য বা নাগালের বাইরে চলে গেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে দৈনিকগুলো জানিয়েছে, কাওরানবাজারে তিন-চারদিন আগেও এক কেজি ওজনের সামুদ্রিক যে ইলিশের দাম ছিল আট থেকে নয়শ’ টাকা, সে ইলিশই মঙ্গল-বুধবারে কিনতে হয়েছে ১২শ’ টাকার বেশি দিয়ে। একইভাবে মাঝারি আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে আটশ’ টাকা দরে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, মধ্যবিত্তরাও দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না।  

এদিকে হিন্দুদের দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকার নতুন পর্যায়ে ভারতে ইলিশ রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী তিন সপ্তাহে ২০ লাখ ৮০ হাজার কেজি ইলিশ রফতানি করা হবে। ইলিশগুলোও যথেষ্ট বড় আকারের হবে। একই কারণে রফতানি শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইলিশের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর ফলে একদিকে বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে, অন্যদিকে ইলিশের দামও বেড়ে চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য ইলিশ খাওয়ার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল ভারতে রফতানির কারণে সে সম্ভাবনাও আর থাকছে না। 

এসবের পাশাপাশি ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত খবরও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এতে জানানো হয়েছে, সরকার ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন নদী ও সমুদ্রে ইলিশ ধরা এবং ইলিশ ক্রয়-বিক্রয় করা নিষিদ্ধ করেছে। গত বুধবার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ইলিশ শিকারের ব্যাপারে। ওদিকে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা নিয়েই শুধু প্রশ্ন ওঠেনি, তীব্র আপত্তিও জানিয়েছেন জেলেসহ মাছ ধরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোকজন। 

আপত্তি ও প্রতিবাদের প্রধান কারণ হলো, যে ২২ দিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে সে সময়ে জেলেসহ মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর সদস্যরা কিভাবে জীবন ধারণ করবেন। কোনো কোনো রিপোর্টে জানা গেছে, ২২ দিনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারপিছু ১০-১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত চাল দেয়ার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। আপত্তির কারণ হলো, ভাত এদেশের প্রধান খাদ্য হলেও তেল ডাল লবণ মরিচ থেকে শুরু করে সাবান ও কাপড়সহ জেলে পরিবারগুলোকে সবই কিনতে হয়। দিতে হয় ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতনসহ অন্যান্য খরচ। এসবের জন্য ১৫-২০ কেজি চাল দিয়ে ব্যবস্থা করা মোটেই সম্ভব নয়। ওদিকে মাত্র ১৫-২০ কেজি চালের জন্যও আবার বিশেষ কার্ড বা পরিচয়পত্র জোগাড় করতে হবে। অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ এ বিষয়টির মধ্যেও সর্বাত্মক দুর্নীতি হয়ে থাকে। এ বিষয়ে অতীতেও বিভিন্ন উপলক্ষে মানুষের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেখা গেছে, সরকারের খাতায় সকলের পক্ষে নাম ওঠানো সম্ভব হয় না এবং দুর্নীতির সুযোগে জেলে বা মৎস্যজীবী নয় এমন অনেকেও কার্ড সংগ্রহ করে। চালও তারাই নিয়ে যায়। মাঝখান দিয়ে বঞ্চিত জেলে পরিবারগুলোর দিন কাটে অভাব ও অনটনে। এবারও কোনো ব্যতিক্রম হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। 

আপত্তি ও প্রতিবাদের অন্য এক প্রধান কারণ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় জেলেদের মাছ ধরার কথা বলা হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা হচ্ছে, নিষিদ্ধ ২২ দিনে বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় অংশে মাছ ধরার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ভারতীয় জেলেরা বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে নিয়ে যাবেÑ যেমনটি অতীতেও তারা নিয়েছে। ভারতীয় জেলেরা এমনকি বাংলাদেশেরও অনেক ভেতরে এসে মাছ ধরে। কিন্তু সে খবর জানানো হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ওদিকে  সমুদ্রের নিচে যেহেতু দেয়াল নেই এবং দেয়াল দেয়া সম্ভবও নয় সে কারণে মাছের চলাচলও থাকে বাধাহীন। এর ফলে বাংলাদেশের অংশে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হলেও তার সম্পূর্ণ সুফল ভোগ করে ভারতীয়রা। এজন্যই বাংলাদেশি জেলে ও মৎস্যজীবীরা এমন আয়োজন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিল রেখে একই সময়ে ভারতীয় অংশেও মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। 

আমরা জেলে ও মৎস্যজীবীদের এই দাবির প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন জানাই এবং মনে করি, সমুদ্রের নিচে যেহেতু দেয়াল নেই সে কারণে বন্ধ বা নিষিদ্ধ করতে হলে বাংলাদেশ এবং ভারতের উভয় অংশেই একই সময়ে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দরকার। সময় সীমার ব্যাপারেও নতুন করে চিন্তা করা উচিত। কারণ, এক নাগাড়ে ২২ দিন মাছ ধরতে না পারলে জেলে ও মৎস্যজীবীদের পরিবার সদস্যদের নিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়বে। এ সময়ের জন্য চালের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি নগদ অর্থ দেয়ারও ব্যবস্থা করা দরকার। 

বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে ভারতীয় জেলেরা যাতে মাছ ধরে নিয়ে যেতে না পারে সে ব্যাপারেও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের উচিত ভারতের সঙ্গে এমন আয়োজন করা যাতে উভয় দেশে একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এমন ব্যবস্থা ছাড়া সমুদ্রের নিচে মাছের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয় বলেই আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ