মঙ্গলবার ৩০ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

জলবায়ুর প্রাপ্ত অর্থ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পরিকল্পিত নীতি প্রণয়ন জরুরি

স্টাফ রিপোর্টার: সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দরকার নেই, আমাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা  দরকার, উত্তম ব্যবস্থাপনা দরকার। এটি মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোকে যেমন আর্থিক সহায়তা দিতে হবে তেমনি প্রাপ্ত অর্থ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশের ন্যায় ভুক্তভোগী দেশগুলোর পরিকল্পিত নীতি প্রণয়ন জরুরি।
গতকাল বুধবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এড্রেসিং দ্যা গোলস অব কপ-২৬ ইন সাউথ এশিয়ান কনটেক্সট: পিটফল অ্যান্ড এক্সপ্লিকেশন্স শীর্ষক এক ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারসন ডিকসন।
ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে যুক্ত ছিলেন পরিবেশবিজ্ঞানী ও সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান, বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, পরিবেশ আইনবিদ ও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আইইউসিএন বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য সচিব স্থপতি ইকবাল হাবিব এবং সিজিএসের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারসন ডিকসন জলবায়ু পরিবর্তনের হার কমানোতে তার সরকারের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের অসাধারণ কতগুলো প্রমাণ রয়েছে। আমরা যদি বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখতে পারি তাহলে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আমরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কয়লা, নগদ অর্থ, গাড়ি এবং গাছ এই চারটি জিনিসের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছি। তিনি বলেন, সুন্দরবনকে রক্ষা করা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কেননা এটি যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে। জলবায়ু মোকাবেলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপগুলো প্রশংসার দাবি রাখে।      
সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজোর নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, করোনার কারণে পাঁচ থেকে ২০ শতাংশ দেশ আসন্ন কপ-২৬ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারবে না, সেখানে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে এতে অংশ নিচ্ছে এটাই বড়কিছু। পদ্মাসেতু নির্মাণে ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির পেট্রোল ডাম্পিংয়ের সমালোচনা করে তিনি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ১০০টি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে জলবায়ু সহিষ্ণু করার পরামর্শ দেন।         
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য সচিব স্থপতি ইকবাল হাবিব জলবায়ু মোকাবেলায় ২ ধরনের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে অভিযোজন কর্মসূচিতে গুরুত্বারোপ করে সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পকে টেকসই করার তাগিদ দেন।
তিনি বলেন, শহরে সুষ্ঠু আবাসন ব্যবস্থা নেই, এ খাতে প্রচুর বরাদ্দ থাকলেও তা ব্যবহারে দক্ষতা কম। জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল পদক্ষেপ দরকার। আমাদের প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সাহায্য দরকার। আমরা যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারি সেজন্য আমাদের জীবনধারায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, অভিযোজন যুদ্ধ নয় অংশীদারিত্ব।     
আইইউসিএন বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চল পর পর দুটি ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে। সিডর, আইলা, আম্পানে মানুষের ঘড়বাড়ি ডুবে গেছে, চাষের জমি নষ্ট হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের এখন আর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কথা বলার সময় নেই। জরুরি পদক্ষেপ দরকার।
বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় জাস্টিস ও ইক্যুইটি ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের চেয়ে প্রশমণ কর্মসূচিতে গুরুত্বারোপ জরুরি। উন্নত দেশগুলো যে পরিবেশের বায়ুমণ্ডলের প্রতি অবিচার করছে তা প্রথমে স্বীকার করতে হবে। প্রথমসারির উন্নত দেশগুলোকে এটার  প্রভাব মোকাবেলায় অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের মতো ভুক্তভোগী দেশগুলোতে এই ফান্ডের টাকা কার পকেটে যায় তা আগে খুঁজে বের করতে হবে।
তিনি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার গ্রিন গ্রোথ মডেলের সমালোচনা করে বলেন, উন্নত বিশ্বের টাকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করার আর সুযোগ নেই। যেহেতু আমরাই প্রথম সারির ভুক্তভোগী তাই নিজস্ব অর্থায়নে হলেও এ ব্যাপারে আমাদের জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ঢাকাতে সবচেয়ে বেশি ইনহেলার বিক্রি হয়। গাছের পাতাগুলো ধুলোয় ভরে যায়। শীতকালে গাছের পাতাগুলো ধুয়ে দিতে পারলে মানুষ অন্তত স্বচ্ছ বাতাস পেত, অক্সিজেন পেত। ইনহেলারের ব্যবহার কমতো।
ওয়েবিনারের সমাপনি বক্তা হিসেবে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু ইস্যুতে ফ্রন্টলাইনার দেশ। এদেশে প্রতিবছর ১৫০ মিলিয়ন মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগের শিকার। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর অধিক পরিমাণে শক্তি ভোগ নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য জলবায়ুর ভোগান্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। জলবায়ু মোকাবেলায় আমরা কী করছি বা বিশ্ব কী করছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পশ্চিমা বিশ্ব তথা শক্তির অধিক ব্যবহারকারি দেশগুলো কী করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ