রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

ধারাবাহিক

সাজজাদ হোসাইন খান:

 

// ছাপ্পান্ন//

 

ঠিক ঠিকই পরীক্ষা এসে হাজির। ছুটি সাতদিন। পরীক্ষার আগে আগে। এ কয়দিন বই-খাতায় ঢুকে গেলাম। এক গ্লাস করে দুধ রেখে যান টেবিলে, আম্মা। প্রতি রাতে। সকালে সেদ্ধ ডিম। অন্যরকম আদর যতœ। আব্বাও খোঁজখবর রাখেন। চোখের চারপাশে চক্কর দিচ্ছে পরীক্ষা। প্রথম সিঁড়ি থেকে যদি পিছলে যাই! ভয়েরা ওড়াউড়ি করে মাঝে মধ্যে। সদর সড়কে তুলে ফেলেছি পড়ার রেলগাড়ি। এরি মধ্যেই। খুশির চম্পা ফুটতে শুরু করেছে মনের বাগানে। পরীক্ষা দিলাম অবশেষে। ভয়হীন। আমার হাবভাব দেখে সাঈদ- তৌফিকও খুশি। মোহনও আমার পাশে পাশে হাঁটে। দেখলাম শরীফা কেমন মনমরা। হয়তো পরীক্ষায় কোনো ঝামেলা। জিজ্ঞেস করতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেলাম।

বাসায় ফিরলাম ফুরফুরে মেজাজ। এসে দেখি আব্বা তার প্রিয় হুক্কা ফুঁকছেন ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে। কলকি থেকে ধুঁয়া উড়ছে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। পরীক্ষা কেমন দিলে জিজ্ঞেস করলেন আব্বা। ভালো। খুব ভালো। জবাবে জানালাম। আজই শেষ সব ঝামেলা। 

আম্মা মামাদের বাড়ি। খালাদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত। আমিও সেখানে গেলাম। আম্মার খোঁজে। পরীক্ষা শেষ, খুশি খুশি ভাব নিয়ে হাঁটছি। আম্মা আমার দিকে নজর দিলেন। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। আম্মার চোখে জিজ্ঞাসা। বুঝলাম আমার পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত। জানালাম ভাবনা চিন্তার কোনো কারণ নাই। পরীক্ষা খুব ভালো দিয়েছি, এক্কেবারে ফার্স্ট ক্লাস। খালা মামারা হেসে উঠলেন। আম্মাও হাসলেন মিটি মিটি। এক খালার নাম নাজমা। আমার দুই ক্লাস উপরে পড়েন। পিঠা এনে হাজির করলেন। বললেন মিষ্টিমুখ করো। পরপর দু’খানা পিঠা মুখে পুরে দিলাম। আমার  খুব পছন্দের পিঠা এগুলো। নাম ‘পাকন’ পিঠা। ক্ষুধাও আছে বলতে গেলে মন্দ না। আম্মা বললেন, এতো তাড়াহুড়া কিসের। ধীরেসুস্থে খাও। কার কথা কে শোনে। আর একখানা পিঠা পকেটে গুঁজে মাঠের দিকে দৌড়। কতদিন পর পায়ের শিকল ভেঙে ছত্রখান। হালকা হালকা লাগছে। অপেক্ষার দিন শেষ। মাঠে গিয়ে দেখি এখানে সেখানে জটলা। মনোয়ার দৌড়ে এলো। তার পিছন পিছন আরো কয়েকজন। কতদিন গেলো কথা হয় না। মন খুলে। কানের লতি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঠান্ডা বাতাস। ওদেরও কারো কারো পরীক্ষা শেষ। কারো মাঝপথে। শেষধাপে এসে ঠেকেছে মনোয়ারদের। তাই কথার বাঁকে বাঁকে ঢুস দিচ্ছে পরীক্ষার খবরাখবর। কারো চেহারায় ভাবনার সুড়সুড়ি। কারো আবার ঝুলছে চম্পার খুশবু। মনোয়ার বললো, পরীক্ষাতো চলেই গেলো। এ নিয়ে চিন্তা ভাবনার কি আছে। যা হবার তো  হবেই। একটা আনন্দের খবর। তুইতো বাসা আর ইস্কুল। জানবি কী করে। সকাল নটা থেকে শুরু হবে। কি শুরু হবে? সাঁতার! এটি কোনো ব্যাপার হলো? আমরা তো কতো সাঁতার কাটি ইন্দ্রপুরী পুকুরে। কোনো কোনো দিনতো রক্তজবা ফোটে চোখে। আরে এই সাঁতার সেই সাঁতার নয়। সাঁতার প্রতিযোগিতা। দুই রাত দুই দিন। একসাথে বলে উঠলো সবাই। আমার চোখে তখন জোনাক জলছে। দুই রাত দুই দিন এটা আবার কেমন সাঁতার! শান্তিবাগ স্কুলের পেছনেই একটি ছোটখাটো পুকুর। টলটলে পানি। দলবেঁধে ঘুরে হাঁস। গোসল টোসলও করে অনেকে। সেই পুকুরেই প্রতিযোগিতা জানালো ওরা। আমাদের বাসার এক বাড়ি পরই পুকুরের এক মাথা। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমরা গেলাম পুকুরপাড়। দল বেঁধে। দেখলাম আয়োজন হচ্ছে। সাজানো হচ্ছে পুকুর। পুকুর পাড়। এপাড়া ওপাড়া থেকেও আসছে মানুষ। একটা উৎসব উৎসব ভাব। শান্তিবাগের বাতাসে উড়ছে আনন্দের কইতর। এ আনন্দ চললো চাঁদ-সুরুজের গন্ধ মেখে মেখে। আন্ধকার আর ফর্সার মাঝ বরাবর। সাঁতারু ছিলেন তিনজন। মান্নান ভাই, শাহ আলম ভাই। আরো একজন কে যেন? নাম মনে নেই। মান্নান ভাই ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী স্কুলের ছাত্র। নবম না দশম শ্রেণীর। সেখানে ফার্স্ট হয়েছিলেন সাঁতারে। কদিন আগে। তাই তার খুব নামডাক। শান্তিবাগের পুকুর তোলপাড় করে ঘুরছে তিন সাতারু। সূর্য যখন ক্লান্ত হয়ে পশ্চিম ছুঁই ছুঁই, দুই সাঁতারু তখন চিতপটাং। কয়েকজন মিলে তাদেরকে তুলে আনলো। টিকলো শুধু এক। মান্নান ভাই। দুই দিন দুই রাত কাবার করে উঠলেন। ঝপ ঝপ করে পানি ঝরছে। মাথা শরীর ঘষে ঘষে।  চারদিকে তখন মান্নান ভাই জিন্দাবাদ।  (চলবে) 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ