সোমবার ২৪ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

জালিয়াত চক্র সক্রিয় ॥ ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ

বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার প্রতারক চক্রের সদস্য -(ছবি: সংগৃহীত)

নাছির উদ্দিন শোয়েব: চারদিকে প্রতারক চক্র সক্রিয়। নামে বেনামে, কৌশলে- প্রতারণার ফাঁদে ফেলে মানুষের কাছ থেকে ওরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কখনো সচেত ব্যক্তিরাও এদের ফাঁদে পড়ে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কখনো দু’চারজন গ্রেফতার হলেও এমন বহুচক্র রয়েছে ধরাছেঁয়ার বাইরে। অনেকে ফাঁদে পড়লেও বাড়তি ঝামেলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হয় না। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতারণার জাল বিস্তার করে আছে একাধিক চক্র।
জানা গেছে, সৈনিক পদে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে রোববার দুই জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এরআগে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর নাম করে জাল ভিসা সরবরাহ করে প্রতারণার মাধ্যমে এক আইনজীবীর কাছ থেকে ৫৫ লাখ টাকা হাতিয়েছে একটি প্রতারকচক্র। এ চক্রের দুইজনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। অন্যদিকে জাল ভিসা দিয়ে ইউরোপে লোক পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় চাকরি দেয়ার নামে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে একাধিক চক্রের সদস্যকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরও থেমে নেই প্রতারণা। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব চক্র প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন।   
সিআইডি জানিয়েছে, একটি বাহিনীতে মেস ওয়েটার ও সৈনিক পদে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরির পর মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করে আসছিল একটি প্রতারক চক্র। চাকরি পেতে হলে বাহিনীর নিয়োগ বোর্ডে থাকা ব্যক্তিদের পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে বলে চাকরিপ্রত্যাশীদের জানান চক্রটি। এরপর ভুয়া নিয়োগপত্র বানিয়ে আরও দুই লাখ টাকা দাবি করা হতো। এমনই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাজধানীর সূত্রাপুর ও গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকা থেকে প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৩। গ্রেফতাররা হলেন- চক্রের মূলহোতা- মো. কামরুজ্জামান (৩৩) ও মো. নাজির হোসেন (৩২)।
গতকাল সোমবার দুপুরে র‌্যাব-৩ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বীণা রাণী দাস এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে র‌্যাব-৩ এর একটি দল রোববার রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে প্রতারক চক্রের সদস্য নাজির হোসেনকে ও গাজীপুর থেকে চক্রের মূলহোতা কামরুজ্জামানকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার দু’জন দীর্ঘদিন ধরে একটি বাহিনীতে মেস ওয়েটার ও সৈনিক পদে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ ও নিরীহ জনগণকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে ভুয়া নিয়োগপত্র প্রদানের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করে আসছিল।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বীণা রাণী দাস আরও বলেন, গ্রেফতার দু’জন পরস্পর বন্ধু। নাজির একটি হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়। তিনি সুকৌশলে সাধারণ মানুষকে চাকরি দেয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ভিক্টিমের বিশ্বস্ততা অর্জনের পর তিনি তার বন্ধু গ্রেফতার কামরুজ্জামানকে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কামরুজ্জামান চাকরিপ্রার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, এর আগে তিনি বহু লোককে ওই বাহিনীতে চাকরি দিয়েছেন। তবে চাকরি পেতে হলে বাহিনীর নিয়োগ বোর্ডে যারা থাকেন তাদের ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। এভাবে প্রথমে একটি চুক্তিনামার মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা আদায় করা হতো। তিনি জানান, এরপর চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্র নেয়ার পর প্রার্থীকে জানানো হয়, ‘আপনাকে একটি পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। তবে নিয়োগপত্র পেতে আরও দুই লাখ টাকা দিতে হবে।’ র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, এভাবে চক্রটি ধাপে ধাপে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে থাকে। এক পর্যায়ে চাকরিপ্রার্থীকে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এভাবে চক্রটি চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
এরআগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খায়রুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর নাম করে জাল ভিসা সরবরাহ করে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরা হলেন- সাইমুন ইসলাম (২৬) ও আশফাকুজ্জামান খন্দকার (২৬)। দুজনই একটি চক্রের সদস্য। শনিবার রাজধানীর বনশ্রী ও শাজাহানপুর থানা এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন জানান, আসামীরা দীর্ঘদিন যাবত অস্ট্রেলিয়ান জাল ভিসা তৈরি করে বাংলাদেশের নিরীহ লোকজনকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর নাম করে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে আসছে। আইনজীবী খায়রুল ইসলামের গত জুলাই মাসে খিলগাঁও থানায় দায়ের করা মামলার সূত্র ধরে তাদের গ্রেফতার করা হয় বলে জানান এই সিআইডি কর্মকর্তা। ইমাম হোসেন বলেন, গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, তাদের হোতা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী উম্মে ফাতেমা রোজী (৩৫) দেশে থাকার সময় নিজেকে ‘অস্ট্রেলিয়া ইমিগ্রেশনের কনস্যুলার জেনারেল’ হিসাবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে অ্যাডভোকেট খায়রুলকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, খায়রুল তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে নিজেসহ তার পরিবারের আরও আটজনকে অস্ট্রেলিয়া নিতে রোজীর কথামতো ৫৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা দুটি ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দেন। এই চক্রের প্রতারণার বিবরণ দিয়ে ইমাম হোসেন বলেন, তারা বাংলাদেশে অস্ট্রেলীয় হাই কমিশনের নিযুক্ত ভিসা প্রসেসিং কোম্পানি ভিএফএস গ্লোবালের প্রতিনিধি হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূতাবাসের লোগোসহ ভিসাসংক্রান্ত সব কাগজপত্র তৈরি করে চক্রের হোতা রোজীকে ইমেইলে পাঠান। পরে রোজী এসব জাল কাগজপত্র ভুক্তভোগীর ইমেইলে পাঠান। ভুক্তভোগী খায়রুল এইসব কাগজপত্র ভিএফএস গ্লোবাল বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের অফিসে জমা দিতে গেলে তারা জানায়, সকল কাগজপত্র জাল।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মানবপাচারে জড়িত থাকায় রাজধানীর মিরপুর উত্তরা থেকে দুই জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এরা হলো লিটন ও তার সহযোগী আজাদ। এসময় তাদের কাছ থেকে কিছু পাসপোর্টসহ মাদকও উদ্ধার করা হয়। শনিবার র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নারীপাচার চক্রে সংশ্লিষ্ট বলে স্বীকার করেছে। তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্রেরও সদস্য। দেশে এই চক্রের ১০-১৫ জন সদস্য রয়েছে। ৫-৭ জন সদস্য আছে ইরাকে। চক্রটি মূলত বিশেষায়িত পেশার লোকজনকে টার্গেট করে। নার্স, বিউটি পার্লারের কাজ জানা নারী- এরাই তাদের প্রধান টার্গেট। এ পর্যন্ত দুই শ’ থেকে আড়াই শ’ তরুণকে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করেছে ওরা। পাচারকৃতদের জিম্মি করে মুক্তিপণও আদায় করে আসছে তারা। র‌্যাব আরও জানায়, চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে শুরু করে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা, বরিশালের মানুষজন এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছেন।
এদিকে গ্রাহকদের ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় ‘এহসান’ গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসানসহ তার চার ভাইকে বৃহস্পতিবার গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল সোমবার তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। দুপুরে শুনানি শেষে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ম. মহিউদ্দিন আসামীদের রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর করেন। বাদীপক্ষের হয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এম ডি নুরুল ইসলাম সরদার শাহজাহানসহ জেলা আইনজীবি সমিতির আইনজীবীরা। অন্যদিকে আসামী পক্ষের কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা হয়েছে। প্রতারণার কারণে রাগীব আহসান ২০১৯ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেন।
এছাড়া বগুড়ায় সরকারি চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। অসহায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছে অন্তত ৯০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। শনিবার রাতে দুপচাঁচিয়া উপজেলায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, সিডি, পেনড্রাইভ, হার্ডডিক্স, সিমকার্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে র‌্যাব-১২ বগুড়া স্পেশাল কোম্পানির সদস্যরা। গ্রেফতার প্রতারকরা হলেন-বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার স্বর্গপুর হাজিপাড়ার মুনসুর আলী মণ্ডলের ছেলে মেহেরুল ইসলাম (৩৩) ও একই উপজেলার রেল কলোনি তালোড়া বাজার এলাকার মনোয়ারুল হকের ছেলে কামরুল হাসান (২৯)। এরআগে গত জানুয়ারিতে জনশক্তি কর্মসংস্থানের অনুমতি ছাড়াই জাল ভিসা দিয়ে ইউরোপে লোক পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মানবচারারকারি একটি চক্রকে গ্রেফতার করে সিআইডি। ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক আগ্রহী ব্যক্তিদের চক্রটি জাল ভিসা দিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত চক্রটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ