মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জাতি সরকার সংস্কৃতি

আফগানিস্তানের সরকার গঠন নিয়ে একটা কৌতূহল ছিল বিশ্ববাসীর। গণমাধ্যমেও এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। অবশেষে কাবুল দখলের তিন সপ্তাহ পর ৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আফগানিস্তানের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীনর সরকার ঘোষণা করেছে তালেবান। সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তালেবানের কয়েকজন বর্ষিয়ান নেতাকে। সরকার প্রধান করা হয়েছে মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে। উল্লেখ্য যে, তালেবানের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম জনাব হাসান আখুন্দ প্রায় দুই দশক ধরে এই গোষ্ঠীর শূরা কাউন্সিলের নেতৃত্বে ছিলেন। তালেবানের আগের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তিনি। সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে তালেবানের সবচেয়ে আলোচিত নেতা আবদুল গনি বারাদার ও আবদুল সালাম হানাফিকে। তালেবান গত ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুল দখল করার পর তাদের সরকারের প্রধান হিসেবে বারাদারের নামই বেশী আলোচনায় এসেছিল। তালেবানের প্রয়াত নেতা মোল্লা ওমরের ভগ্নিপতি ও ঘনিষ্ঠজন বারাদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় তালেবানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর কাতার থেকে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে হামলা চালায়। ওই হামলায় উৎখাত হয় তালেবান সরকার।
ওই ঘটনার দুই দশক পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় প্রতিরোধহীনভাবে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় তালেবান। য্ক্তুরাষ্ট্রে হামলার ২০ বছর পূর্তির তিনদিন আগে তালেবান যে সরকার গঠন করেছে, সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা সিরাজ উদ্দিন হাক্কানিকে। হাক্কানি নেটওয়ার্কের আরেক নেতা খলিল হাক্কানিকে করা হয়েছে শরণার্থী বিষয়কমন্ত্রী। এছাড়া হাক্কানি নেটওয়ার্কের আরো দু’জনকে রাখা হয়েছে এ সরকারে। ৭ সেপ্টেম্বর কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ নতুন এই সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন। তিনি আরো যেসব মন্ত্রীর নাম জানিয়েছেন, তারা সবাই তালেবান নেতা। যদিও তালেবান নেতারা আগে বলেছিলেন তারা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু ঘোষিত মন্ত্রিসভায় সংগঠনটির বাইরের বা আগের সরকারের কোনো নেতার নাম ছিল না। এছাড়া তালেবানের শীর্ষ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কী ভূমিকায় থাকবেন তা এখনও পরিষ্কার করেনি তালেবান। বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তানের নতুন সরকারে যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে তারা তালেবানের ‘পুরোনো মুখ’। তাদের বেশিরভাগ পশতুন। বিভিন্ন জাতির নেতাদের নিয়ে আফগানিস্তানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠিত হবে কিনা, তা নিয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, এটা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও জাতিগোষ্ঠীর লোকজনকে সরকারের নেয়ার চেষ্টা করবেন।
আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যে বেশ জটিল তা উপলব্ধি করা যায়। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আফগানিস্তানের বড় সম্পদ, আবার এই বিষয়টিই আফগানিস্তানের জন্য হয়ে উঠেছে বড় বিপদের কারণ। বিভিন্ন সময় বৃহৎশক্তির হামলার শিকার হতে হয়েছে আফগানিস্তানকে। যেমন ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে উৎখাত করেছিল তালেবান সরকারকে। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেছে বটে, তবে মার্কিন সরকার তাদের স্বার্থের ব্যাপারে কি চোখ বন্ধ করে থাকবে? এছাড়া প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশসহ বিশ^ রাজনীতির নায়করাও আফগানিস্তানের ব্যাপারে রয়েছে তৎপর। ছোট-বড় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও তালেবান সরকারের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় আফগানিস্তানে সরকার গঠনও একটি জঠিল ব্যাপার। সেখানে হিসাব-নিকাশের অনেক বিষয় রয়েছে। আর কাউকে আমন্ত্রণ জানালেই যে, সরকারে অংশ নিবেন তাও নয়। এমন পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানে পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠনের রূপটা কেমন হয়, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরো অপেক্ষা করতে হবে। তালেবানের জন্য কাজটা তেমন সহজ নয়। শুধু সরকার গঠন নয়, তালেবানের সামনে রয়েছে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জও।
২০ বছর পর আফগানিস্তানে আবারো তালেবান ক্ষমতায় এসেছে। শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও অনেকে কথা বলেছেন। এতে বিরক্ত হয়েছেন অনেকে। যেমন রাশিয়ার প্রেসিেিডন্ট পুতিন বলেছেন, যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানিস্তানে বাইরে থেকে মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস একটি দয়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। তিনি বলেন, একটা দেশের জনগণ কি করবে না করবে, তাদের রাজনৈতিক জীবন কেমন হবে তার মানদণ্ড বাইরের কোন শক্তি চাপিয়ে দিতে পারে না। চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি আসলেই কোন স্বাধীনচেতা জাতি বা ব্যক্তি মেনে নিতে পারেন না। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ফক্স নিউজকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে সেই বিষয়টি যেন তুলে ধরলেন তালেবান মুখপাত্র সুহাইল শাহিন।
৩ সেপ্টেম্বর ফক্স নিউজকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানের নারীদের অধিকার ও দেশটির সংস্কৃতি নিয়ে নাক না গলানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের প্রতি আহ্বন জানিয়েছেন তালেবন মুখপাত্র সুহাইল শাহিন। উল্লেখ্য যে, আফগানিস্তান তালেবানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর দেশটির নারীদের প্রতি তালেবানের আচরণ কেমন হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ^ ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। আফগান মুখপাত্র পশ্চিমাদের এই উদ্বেগের জবাব দেন। সুহাইল বলেন, আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার নিয়ে তাদের কোন সমস্যা নেই। নারীদের শিক্ষা বা তাদের কাজ করার অধিকার নিয়েও কোন সমস্যা নেই। পশ্চিমাদের উদ্দেশে তালেবানের মুখপাত্র বলেন, ‘একে অন্যের সংস্কৃতি পরিবর্তন করার চেষ্টা না করলেই হলো। আমরা যেমন আপনাদের সংস্কৃতি পরিবর্তন করার কথা বলছি না, তেমনি আপনারাও আমাদের সংস্কৃতি পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না।’ সাক্ষাৎকারে সুহাইল শাহিন আরো বলেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে তাদের ভাবনায় পার্থক্য রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘পশ্চিমা মতে, নারীদের হিজাব না পরেই শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলা হয়। আর আমাদের সংস্কৃতি বলে, হিজাব পরে শিক্ষা গ্রহণের জন্য, হিজাব পরে চাকরি করার জন্য।’
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম পলিটিকো তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশে^র সব মানবাধিকরা সংগঠন ও নারী রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানেরা আফগান নারীদের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য জোটবদ্ধ হচ্ছেন। এটা কিসের আলামত? এটা যদি বিশেষ লক্ষ্যে কোনো রাজনৈতকি চাপ সৃষ্টির জোট হয়ে থাকে, তাহলে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের কাজ বেশ কঠিন। সেখানে এমনিতেই রয়েছে হাজারো সমস্যা। ফক্স নিউজের সাথে সাক্ষাৎকারে তালেবন মুখপাত্র সুহাইল শাহিন তো স্পষ্ট করেই বলেছেন, আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষাগ্রহণ ও চাকরি করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। তবে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক চেতনার সাথে তাদের সাংস্কৃতিক চেতনার পার্থক্য রয়েছে। আফগানিস্তানের নারীরা হিজাব পরে লেখাপড়া, চকরি সবই করতে পারবেন। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির সাথের পার্থক্য রয়েছে আফগাস্তিনের। এই পার্থক্য দূর করার জন্য যদি কোনো জোট গঠন করা হয়, তা কতটা সঙ্গত হবে? এমন তৎপরাতাকে তো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ বলে অভিহিত করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ