মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

দীর্ঘ অপেক্ষার পর খুলতে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করীম : ২০২০ সালের ৮মার্চ বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হওয়ার পর ১৭ মার্চ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার ছুটি ঘোষণা দেন। এরপর থেকে বারংবার ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরপর ২০২১ সালের ২৯ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলার ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। এরপর ঘোষণায় বলা হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ মে শুরু হতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু আমাদের দেশে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় সেই সিদ্ধান্তও বাতিল করে সরকার।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অন্য সবকিছু স্বাভাবিক হলেও সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে খোলা হচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে আছে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধুঁকছে আর্থিক সংঙ্কটে এবং বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই আসবাবপত্র বিক্রি করে দিয়ে কর্তৃপক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি স্তরের ৪০ লাখ পরীক্ষার্থী ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আর চাকরির বয়স পার হওয়া নিয়েও শঙ্কায় আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত বছর এইচএসসিতে অটোপাস দেয়ার পর এবার আবার অনিশ্চয়তায় পড়েছে এই পাবলিক পরীক্ষা। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষাও নভেম্বর মাসে হবে কিনা নিশ্চিত বলা যায় না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পরীক্ষাও হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তাা। বিকল্প হিসেবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমও ফলপ্রসূ হচ্ছে না। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার আন্দোলন ধীরে ধীরে জোরদার হওয়ার প্রেক্ষিতে সরকার ঘোষণা দিয়েছে ১২ সেপ্টেম্বর সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার। শিক্ষক, অভিভাবক শিক্ষার্থীসহ জনগণ ভাবছে সরকার কী সত্যিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১২ সেপ্টেম্বর খুলবে  
অনলাইন ক্লাস মনিটরিংয়ে ৫ দফা নির্দেশনা : অনেক পূর্বেই দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ক্লাস মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করছে এবং কারা করছে না, তার তথ্য সংগ্রহেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং অনলাইন ক্লাস ইন্টারেক্টিভ করতে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত দেশের মাধ্যমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীকে কার্যকর সংসদ টিভি এবং অনলাইন ক্লাসে যুক্ত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়ছে। অনলাইন ক্লাস এবং সংসদ টিভিতে পরিচালিত ক্লাস পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মনিটরিং করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গত ৫ মে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং অনলাইন ক্লাসের সমন্বয় করে রুটিন তৈরিসহ ৫ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সরকারের সে উদ্যোগও অধিকাংশ সফল হয়নি।
গত ১১ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ জরিপ চালানো হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা মহামারির কারণে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৫৯ লাখ ২২ হাজার  শিক্ষার্থী ন্যূনতম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাই করোনা ভাইরাসের গতিবিধি দেখে পুনরায় স্কুল খোলার দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ৫১ শতাংশ প্রাথমিক ও ৬১ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার ক্ষতি এড়াতে কোচিং ও গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। মহামারিতে শিক্ষার ব্যয় গ্রামীণ পরিবারে ১১ গুণ ও শহুরে পরিবারে ১৩ গুণ বেড়ে গেছে।
করোনা মহামারির বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের  ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান। আর মাধ্যমিকের ৯৬ শতাংশ অভিভাবক সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। দেশে গত বছর করোনা শুরুর পর থেকে বন্ধ রয়েছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের বাইরে শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থায় প্রাইমারিতে ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনার বাইরে আছে।
অথচ ছুটি না বাড়ানোর দাবি ছিল প্রবল : গত ৩১শে সেপ্টেম্বরের পর আর ছুটি না বাড়ানোর দাবি ছিল সকল মহলের তথাপি আবার ও ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার ছুটি বৃদ্ধি করেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবিলম্বে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবিতে বারংবার রাজধানীসহ দেশজুড়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এসব কমসূচিতে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবিলম্বে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবি জানান। তারা ছুটি আর না বাড়িয়ে একাডেমিক কার্যক্রম চালুর দাবি জানান।
শিক্ষার্থীরা বলেন, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে অব্যাহতভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী যারা গ্রামে বসবাস করেন, তাদের কথা কেউ ভাবছেন না। বেশিরভাগ নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানরা হয়তো আর স্কুলেই ফিরতে পারবে না। ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই করোনাকালীন উপার্জনের পথ বেছে নিয়েছে।
তারা আরও বলেন, করোনাকালীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নিশ্চিতভাবে ঝরে পড়বে অনেক শিক্ষার্থী, যারা আর কোনোদিন ছাত্রজীবনে ফিরতে পারবে না। সেশনজট ও বেকারত্বের চিন্তায় অনেকে হারিয়ে ফেলবে পড়ালেখার আগ্রহ। ক্যাম্পাস খুললে করোনা হবে, কিন্তু বন্ধ থাকলে করোনা হবে না- এমন ভিত্তিহীন তথ্যের ওপর নির্ভর করে এভাবে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ধ্বংস করা কখনোই আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ ইতিপূর্বে বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখায় করোনা সংক্রমণ লাগামের মধ্যে এসেছে- এমন কথা বলার বৈজ্ঞানিক প্রমান আমরা পাইনি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ২০২০ সালের ১২ জুলাই থেকে হেফজখানা ও পরবর্তীতে কওমী মাদরাসা খুলে দেয়াই ছাত্ররা করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এমন কোন সংবাদ আমাদের জানা নেই। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে স্থানীয় চাহিদা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে নমনীয় সিলেবাস তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন এবং ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন।
গত বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের ‘অটোপাস’ দিয়ে অনেকটাই সমালোচনার মুখে পড়েছে শিক্ষা প্রশাসন। তাই আপাতত বড় কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অটোপাসের চিন্তা সরকারের নেই। ফলে চলতি বছরের ৪০ লাখ এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিয়ে মহাসংকটে পড়েছে তারা। এসব শিক্ষার্থীকে ক্লাস না করিয়ে কোনোভাবেই পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছে না। তাই সরাসরি ক্লাস রুমে নেয়া দরকার।
বর্তমানে শহরের বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করলেও মফস্বলের শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগ নেই। কারণ মফস্বলের শিক্ষকরাও অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করছেন না। আবার শিক্ষার্থীদের কাছেও ডিভাইস নেই। যাদের আছে, তাদের অনেকেরই ইন্টারনেট নেই। এছাড়া গ্রামে ইন্টারনেটের ধীরগতি মারাত্মক, যা দিয়ে অনলাইন ক্লাস ঠিকমতো করাটাও সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীদের কতটুকু ক্ষতি হলো, তা এক বছর সতের মাসের পরও মূল্যায়ন করা যায়নি। কত শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেল, তারও হিসাব নেই। অস্থায়ীভাবে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলো মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ও পরীক্ষা ঘিরে। সেগুলোও বাস্তবে কিছু হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দু-তিন বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। না হলে ক্ষতির প্রভাব পড়বে দীর্ঘ মেয়াদে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ক্ষতি বহুমাত্রিক। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ভুলে যাচ্ছে। বড় ঘাটতি নিয়ে উপরের ক্লাসে উঠছে। পরীক্ষা নিতে না পারায় শেখার দক্ষতা যাচাই হচ্ছে না।
সরাসরি শিক্ষার ক্ষতির বাইরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ঝরেপড়া বাড়ছে। কিশোরীদের অনেকে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়ে কর্মজীবনে প্রবেশে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তারা কেবল সংকট নিয়ে আলোচনা করেছে, সমাধানে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই। ইউজিসির কয়েকজন কর্মকর্তার মত হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন ইচ্ছে করলে বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিতে পারত। আবাসিক হলগুলোয়ও ভিড় এড়াতে ধাপে ধাপে পরীক্ষা নেয়া যেত। কিন্তু তারা এটি করতে পারেনি।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকায় তারা বাড়িভাড়া ও শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না। তাছাড়া ৫০% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত ইউনিয়ন ও থানা ভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্ত মাদরাসা, স্কুল ও কলেজের তালিকা তৈরি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এমতবস্থা সরকারে উচিত ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানাতে আর্থিক সহায়তা করা এবং ঘোষিত ১২ সেপ্টেম্বরেই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া।
পরিশেষে আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট দোয়া করবো আল্লাহ পাক যেন আমাদের কলিজার টুকরা সন্তান শিক্ষার্থীদের সুস্থ রেখে মেধা বিকাশের সুযোগ করে দেন। আমীন।
(লেখক : বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি ও সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ