শুক্রবার ২১ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

হেফাজত আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম ব্যুরো, হাটহাজারী সংবাদদাতা : হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, বিশিষ্ট আলেম ও দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতালে তিনি ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. এমজাদ হোসাইন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সে করে বেলা সাড়ে ১২টায় বাবুনগরীকে হাসপাতালে আনা হয়। আনার পরই আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। তিনি হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। 

 হেফাজতে ইসলামের চট্টগ্রাম মহানগরের প্রচার সম্পাদক আ ন ম আহমদ উল্লাহ বলেন, ‘বুধবার থেকে হুজুর অসুস্থবোধ করেন, রক্তচাপও বেড়ে যায়। এরপরও ভালো ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে স্ট্রোক করেন। নাকে-মুখে ফেনা চলে আসে। উপস্থিত ছাত্ররাও এ অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায়। এরপর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম সিএসসিআর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।’ মৃত্যুকালে আল্লামা বাবুনগরী স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে রেখে যান।

সিএসসিআর হাসপাতালের চীফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ওনাকে (জুনায়েদ বাবুনগরী) সোয়া ১২টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। এর আগেই অবশ্য তিনি মারা গিয়েছিলেন। মৃত অবস্থায়ই ওনাকে হাসপাতালে আনা হয়। এরপরও পরীক্ষা শেষে আমরা সাড়ে ১২টায় ওনাকে মৃত ঘোষণা করেছি। আমার তার কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের সমস্যা পেয়েছি।

এদিকে দুপুর দেড়টার দিকে হাসপাতাল থেকে আল মানাহিলের অ্যাম্বুলেন্সে লাশ হাটহাজারী মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর লাশ হাটহাজারী মাদ্রাসায় এসে পৌঁছালে তার ছাত্র, সহকর্মীরা কান্নায় ভেংগে পড়ে। মৃত্যুর সংবাদে হাজার হাজার ছাত্র জনতা বাবুনগরীর লাশ দেখতে ছুটে যায় মাদ্রাসায়। বিকালে মাদ্রাসার সামনে মানুষের ভীড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। আল্লামা শফির কবরের পাশে বাবুনগরীকে দাফনের জন্য কবর খোড়ার কাজ শুরু করে মাদ্রাসার লোকজন।

দুপুরে হাসপাতাল থেকে নিকটাত্মীয়দের দেখানোর জন্য জুনায়েদ বাবুনগরীর লাশ জন্মস্থান চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার বাবুনগর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে লাশ হাটহাজারী মাদ্রাসায় আনা হয় এবং এখানেই রাত ১১ টার পর তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। রাত ৯টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, জানাজায় অংশ নিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলেম-ওলামারা ছুটে আসেন। জানাযা শেষে আল্লামা শফির কবরের পাশেই তাকে দাফন করার কথা রয়েছে। 

গত ১০ আগস্ট দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর একটি হাসপাতালে জুনায়েদ বাবুনগরীর চোখের একটি অপারেশন করা হয়। এর দুদিন আগে তিনি করোনার টিকাও গ্রহণ করেন। 

জুনায়েদ বাবুনগরী ১৯৫৩ সালে ফটিকছড়ি থানার বাবুনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখনে মাধ্যমিক স্তর থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। তারপর পাকিস্তানের দারুল উলূম আল্লামা বিন্নুরি টাউন মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ইলমে হাদীসের উপর উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রথমে আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস পদে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। এরপর ২০০৫ সালে দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন। ২০১৭ সালে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের শায়খুল হাদীস পদে পদোন্নতি পান। গত বছরের সেপ্টেম্বরে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ইন্তেকালের পর তিনি মাদ্রাসার শিক্ষাসচিব পদে নিয়োগ হন।

অপরদিকে ২০১৩ সালে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র মহাসচিবের দায়িত্বপান। ওই বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশের পরদিন তিনি গ্রেফতার হয়ে আলোচনায় আসেন। গত বছর হেফাজতের আমীর আল্লামা আহমদ শফী মারা যাওয়ার পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর সম্মেলনে বাবুনগরীকে আমির করে হেফাজতের ১৫১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত হয়েছিল। পরে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল নানা কারণে এ কমিটি ভেঙে দিয়ে পাঁচজনের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এ কমিটির নেতৃত্বেও ছিলেন বাবুনগরী। এ কমিটি গত ৭ জুন ৩৩ জনে উন্নীত হয়। হেফাজতের নেতাকর্মীরা মনে করেন, আল্লামা বাবুনগরী ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও ধার্মিক মানুষ। তিনি সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। হেফাজতের নেতৃত্বকালে তিনি সাহসের সাথে সবকিছু মোকাবেলা করতেন। হেফাজতের কমিটি গঠন নিয়ে সংকট দেখা দিলে তিনি চাপ ও লোভের কাছে নতি স্বীকার না করে দৃঢ় মনবলের পরিচয় দেন। এজন্য তিনি সবার শ্রদ্ধায় পাত্র হয়ে ওঠেন। 

বিভিন্ন সংগঠনের শোক: আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তিকালে বিভিন্ন সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, চরমোনাই পীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরীয়ত মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মহাসচিব মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, অপর অংশের আমির আল্লামা জাফরুল্লাহ খান, নায়েবে আমির শাইখুল হাদিস মাওলানা আবুল কাশেম কাশেমী, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আলহাজ আজম খান, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর আমির মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন আকন্দ, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দার ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আহসান হাবীব লিংকন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদীস আল্লামা ইসমাঈল নূরপুরী, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, অপর অংশের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাওলানা আবদুর রকিব ও মহাসচিব অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল করিম খান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল্লামা শায়খ জিয়া উদ্দীন, সহসভাপতি আল্লামা আব্দুর রব ইউসুফী, আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তাফাজ্জুল হক আজিজ, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নাজমুল হাসান, অপর অংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শায়খুল হাদিস আল্লামা মনসুরুল হাসান রায়পুরী, নির্বাহী সভাপতি মাওলানা আব্দুর রহিম ইসলামাবাদী, মহাসচিব শায়খুল হাদিস হাফেজ মাওলানা ড.গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি মুফতি শেখ মুজিবুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরী, মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোঃ আজহারুল ইসলাম, পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বর নুরুল আমিন এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গোলাম মোস্তফা আকন্দ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আল্লামা সরওয়ার কামাল আজিজী, সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, অপর অংশের সভাপতি মুফতি মুজিবুর রহমান, নির্বাহী সভাপতি ও জাতীয় সংহতি মঞ্চের প্রধান সমন্বয়কারী মাওলানা এ কে এম আশরাফুল হক, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তজা, মহাসচিব মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল এর নির্বাহী সভাপতি এ বি এম ফাখরুজ্জামান খান ও মহাসচিব অ্যাডভোকেট শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান আবু তাহের চৌধুরী, মহাসচিব মোঃ আবুল কাশেম, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ এজাজ হোসেন, ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ ভূঁইয়া, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শওকাত হোসেন, মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল আমীন, ডক্টর মাওলানা মুহাম্মদ এনামুল হক আজাদ ও সেক্রেটারী জেনারেল অধ্যাপক তারেকুল হাসান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী ও সেক্রেটারি জেনারেল রাশেদুল ইসলাম, জাতীয় তাফসীর পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম, মহাসচিব হাফেজ মাওলানা মাকসুদুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব মুফতী বাকি বিল্লাহ ও মুফতী ওমর ফারুক মুক্তিবাদী, খিদমাহ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও রাজধানীর গুলিস্তান পীর ইয়ামেনী জামে মসজিদের খতিব মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী। 

এ দিকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মো. নাছির উদ্দীন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা বেগম রোজী কবির, গোলাম আকবর খন্দকার, এস এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন, সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আবু সুফিয়ান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ খান।

এ ছাড়া কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (বীর প্রতীক) ও স্থায়ী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইলিয়াস শোক প্রকাশ করে শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। এ দিকে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের খান ও সাধারন সম্পাদক এস এম লুৎফর রহমান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ