রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

গজনির পতনে দশম রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ তালেবানদের হাতে

১২ আগস্ট , বিবিসি, রয়র্টাস, এএফপি, আল জাজিরা :  কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আফগান শহর গজনির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান। এ নিয়ে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দশম প্রাদেশিক রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নিলো তারা। কাবুল-কান্দাহার মহাসড়কে অবস্থান গজনির। ফলে এই শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের দক্ষিণে তাদের অবস্থান জোরালো হলো। তালেবান এখন যেকোনও সময়ে কাবুল অভিমুখে লড়াই শুরু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রাদেশিক রাজধানীর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের দখল এখন তালেবানের হাতে। প্রায় ২০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদেশী সেনা প্রত্যাহার শুরু হওয়ায় দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে তালেবানরা। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে তারা। গজনির প্রাদেশিক কাউন্সিলের এক সদস্য জানিয়েছেন, শহরের প্রায় পুরোটাই দখল করে নিয়েছে তালেবান। কেবল গজনির উপকণ্ঠে একটি পুলিশ ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণ করছে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী।

গত বুধবার কান্দাহার শহরেও তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। শহরটির কারাগারের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দাবি করেছে তালেবান। দক্ষিণাঞ্চলীয় হেলমান্দ প্রদেশের রাজধানী লস্করগাহের পুলিশ সদর দফতর দখল করে নিয়েছে তালেবান। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাসে আফগানিস্তানে এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। কেবল এই সপ্তাহেই উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার আশায় কাবুলে পাড়ি জমাচ্ছেন তারা।

কাবুলের বাইরে স্থাপন করা হচ্ছে অস্থায়ী তাঁবু। আবার অনেকেই খোলা আকাশের নিচে কিংবা পরিত্যক্ত গুদামঘরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তালেবানের দেওয়া আগুনে বাড়ি পুড়ে যাওয়ার পর কুন্দুজ প্রদেশ থেকে পালিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী এক অস্থায়ী দোকানদার। তিনি বলেন, ‘রুটি কেনার অর্থ নেই, সন্তানের জন্য ওষুধ কিনবো তারও কোনও উপায় নেই।’

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলকে ৩০ দিনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে তালেবান। আর ৯০ দিনের মধ্যে তালেবানের হাতে কাবুলের পতন ঘটতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দারা এমনটাই মনে করছেন বলে দেশটির এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। আফগানিস্তানে তালেবানের জোর অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করছে। তালেবান দ্রুত বিভিন্ন এলাকা দখল করছে। এ প্রেক্ষাপটে তালেবানের হাতে কাবুলের পতন হতে কতটা সময় লাগতে পারে, তা মূল্যায়ন করেছেন মার্কিন গোয়েন্দারা।

মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নে কাবুল পতনের সম্ভাব্য যে সময়ের কথা বলা হয়েছে, তা একদম চূড়ান্ত নয় বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আফগান নিরাপত্তা বাহিনী আরও প্রতিরোধ গড়ে তুলে চলমান যুদ্ধের গতি পরিবর্তন করে দিতে পারে।

রাজধানী কাবুলের পতন নিয়ে ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বাইরের দেশের পাঁচজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, বিদেশী দেশগুলো কাবুল থেকে তাদের কর্মীদের দ্রুত সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। তালেবান যে নয়টি প্রাদেশিক রাজধানী দখলে নিয়েছে, সেগুলো হলো ফাইজাবাদ, ফারাহ, পুল-ই-খুমরি, জারাঞ্জ, কুন্দুজ, তাকহার, সার-ই-পল, তালুকান ও সেবারঘান।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত মঙ্গলবার জানান, আফগানিস্তানের মোট ভূখ-ের ৬৫ শতাংশ এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। আর দেশটির ১১টি প্রাদেশিক রাজধানী পতনের হুমকিতে রয়েছে। 

ফাইজাবাদের পতনের পর প্রচ- চাপে পড়েছে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় শহর মাজার-ই-শরিফ। তালেবান যোদ্ধারা শহরটির কাছাকাছি চলে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি মাজার-ই-শরিফ সফর করেন। শহরটি রক্ষায় তিনি সেখানকার তালেবানবিরোধী যোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। 

দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার শহরে তালেবানের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াই চলছে। শহরে মুহুর্মুহু রকেট হামলা হচ্ছে। সেখানকার এক চিকিৎসক বলেন, লড়াইয়ে আফগান বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়েছেন। একের পর এক তাঁদের লাশ আসছে। তালেবানের আহত যোদ্ধারাও চিকিৎসা চাইছেন। এদিকে, হেলমান্দেও উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচ- লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে।

সাধারণ মানুষের প্রাণহানি নিয়ে যা বললো তালেবান:  তালেবানের এমন উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দলটির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকেও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার এক বিবৃতিতে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে দলটি।

বিবৃতিতে বেসামরিক মানুষকে হত্যার অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান। একইসঙ্গে এ ধরনের হত্যাকা-ের জন্য সরকারি বাহিনী ও বিদেশী সেনাদের দায়ী করেছে দলটি। এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা। তদন্তে নিজেদের পক্ষ থেকে সহায়তা দেয়ারও অঙ্গীকার করেছে দলটি।

তালেবানের মুখপাত্র সুহাইল শাহীন বলেন, তার দল কোথাও কোনও বেসামরিক নাগরিক বা তাদের বাড়িঘরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেনি। বরং অপারেশনগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে। আফগানিস্তানের নাগরিকদের এটা নিশ্চিত করতে চাই যে, কোনও ঘরবাড়ি কিংবা পরিবার তালেবানের দিক থেকে কোনও হুমকির সম্মুখীন হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ