শুক্রবার ২০ মে ২০২২
Online Edition

ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী:

গত সপ্তাহে প্রশ্ন তুলেছিলাম, ‘মন্ত্রীরা কি আউলাইয়া গেছে?’ আসলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী করতে হবে, কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক সে বিষয়ে সরকারের কোনো পর্যায়ে কেউ অবহিত আছে বলে মনে হয় না। আমরা শুনি, সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে মাস্ক পরুন, কিছুক্ষণ পর পর সাবান দিয়ে হাত ধোন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। একজন থেকে আর একজন কমপক্ষে ছয় ফুট দূরে দাঁড়ান।

গণপরিবহন নিয়ে সরকার অবিরাম নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। দুইজনের সীট হোক আর তিন জনের সীট হোক, সীট প্রতি একজন যাত্রী বহনের অনুমতি দেয়া হয় এক সময়। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বাসভর্তি করে যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে শুরু করেন। পুলিশ দিয়ে যে বাসে বাসে যাত্রী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, সরকারের সকল মহলের তা জানার কথা ছিল।

এরপর এলো লকডাউন। বিধান জারি হয়েছিল, গণপরিবহন চলবে না। কেউ ঘরের বার হতে পারবে না। বিনা কারণে ঘর থেকে বের হলেই জেল-জরিমানা। সেভাবে হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার ও জরিমানা করা হয়েছে। পকেটে এক টাকাও নেই, এমন লোককে হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যেও ব্যতিক্রম কিছু ছিল। খাবারের দোকান শর্ত সাপেক্ষে খোলা ছিল। রাত ৯টা পর্যন্ত খাবার সরবরাহ করা যাবে। কিন্তু হোটেলে বসে খাওয়ানো যাবে না। মুদি দোকানও বন্ধ রাখতে হবে। তা হলে পাড়ার লোকের চলবে কী করে! ডিমটা, আলু, গুঁড়ো সাবান বা লবণ এখন নিত্যপণ্য মহল্লাবাসী কিনবে কোথা থেকে। আবার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে কাঁচাবাজার। কিন্তু লকডাউন তো, কাঁচাবাজারের পণ্য আসবে কোন পথে?

ফলে লকডাউনে পাড়ায় পাড়ায় লুকোচুরি খেলা বেশ ভালই জমে উঠেছিল। যারা ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন, তারা নতুন পুরাতন প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে বের হয়েছেন। যুক্তি, ওষুধ কিনতে যাচ্ছেন। তা ধানম-ি থেকে কলাবাগান কেন? কারণ ধানম-ির যে ফার্মেসি খোলা, তাতে ওষুধগুলো নেই।

মুদি দোকানের খেলা ছিল আরও চমৎকার। এক দিকের শাটার অল্প একটু খোলা রেখে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ রেখে দোকানের সামনে বসেছিলেন মুদি দোকানের কর্মচারী। টাকা দিয়ে পণ্যের নাম বললে ঝাপ তুলে দোকানের ভেতর থেকে বের করে দিয়েছেন ক্রেতার পণ্য। তারপর আবার পুলিশের ধাওয়া। ধরতে পারলে জরিমানা। ঘুষ বাণিজ্যও চলেছে।

লকডাউনের সময় নগরজুড়ে শত শত পুলিশী চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল। এখানে পুলিশ প্রতিটি গাড়ি থামিয়েছে। পুলিশের প্রশ্নে নাজেহাল হয়ে সিএনজি চালকরা বাধ্য হয়ে ঘরে চলে গিয়েছিলেন। দু’চারজন যারা সিএনজি চালানোর চেষ্টা করেছেন, তারা জরিমানা দিতে দিতে ফতুর। এরপর সবচেয়ে বিপদে পড়েছিলেন মোটর সাইকেলওয়ালারা। প্রত্যেক পোস্টে তাদের থামিয়ে প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে। তারাও বোধকরি নিরূপায় ছিলেন। এরপর দেখলাম, বাইসাইকেল আরোহী পোলাপানদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। নাজেহালের একশেষ।

এরমধ্যে গার্মেন্ট মালিকরা ধুয়া তুললেন, যদি গার্মেন্ট খুলে দেয়া না হয়, তাহলে তাদের অর্ডার চলে যাবে ভারতে বা ভিয়েতনামে। জনস্বাস্থ্য উপেক্ষিতই থাকলো। গার্মেন্ট মালিকদের কথা হয়ত সত্য। কিংবা সত্য নয়। কিন্তু সরকার স্বাস্থ্যবিধিটিধি উপেক্ষা করেই ঘোষণা দিয়ে বসলো যে, রফতানিমুখী শিল্পকারখানা খুলবে। সরকার বলে দিল। গার্মেন্ট মালিকরা তাদের নিজস্ব পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকদের আনা নেয়া করবে। আজব নির্দেশ। সাধারণ সময়েই তারা শ্রমিকদের আনা-নেয়া করে না। শ্রমিকরা স্বাস্থ্যবিধিটিধির পরোয়া না করে গাদাগাদি করে অটোতে যাতায়াত করেন। করোনাকালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ফলে গার্মেন্ট খুলে দেয়া হলো। গণপরিবহন নেই। অটো নেই। মাইলকে মাইল পায়ে হেঁটে শ্রমিকরা কারখানায় গেছেন। মাইলকে মাইল পায়ে হেঁটে ফিরেছেন। কোথাও স্বাস্থ্যবিধির বালাই ছিল না। এরমধ্যে এলো ঈদ। আমরা গ্রামীণ মানুষেরা ঈদে লাখে লাখে একসঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যাই পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে। এই যাত্রায়ও কোনো স্বাস্থ্যবিধি ছিল না। মানুষ ছুটছে তো ছুটছেই। তারপর আবার ফিরে আসা। সেও ছিল অন্তহীন ভোগান্তি। তখনও লকডাউন বহাল ছিল। আমরা দেখেছি ৫০ টাকার রিকশা ভাড়া পাঁচশ টাকা দিয়ে ফিরেছেন অনেকে। অনেকে মাথায় ব্যাগ হাতে সন্তানের হাত ধরে ফিরেছেন ঢাকার বাসায়। এর মধ্যে কি মনে করে সরকার কয়েক ঘন্টার জন্য বাস-লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দিল স্বাস্থ্যবিধি মেনে। অতো অল্প সময়ে বাসও চলল না লঞ্চও চললো না। মানুষের ভোগান্তি যেমন ছিল তেমনই থাকল।

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সরকার গত ১১ আগস্ট থেকে গণপরিবহন চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এবারের ঘোষণা আরও অদ্ভূত। কারণ এখন থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চের কোনো সামাজিক দূরত্ব থাকবে না। বাস চালকরা প্রতি সিটে যাত্রী নিতে পারবেন, কিন্তু দাঁড়িয়ে কোনো যাত্রী নিতে পারবেন না। লঞ্চ মালিকরা লঞ্চের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী যাত্রী নিতে পারবেন, ট্রেনে প্রতি আসনে যাবেন যাত্রী।

এখন প্রতিদিন করোনায় মারা যাচ্ছেন প্রায় আড়াই’শ লোক। আক্রান্ত হচ্ছেন হাজারে হাজার। অর্থাৎ করোনা পরিস্থিতিরি উন্নতি হয়নি। সরকার বলছে, বাস চলবে অর্ধেক। অর্থাৎ ঢাকা-গাজীপুর রুটে আগে যেখানে ১০০ বাস চলত, এখন চলবে ৫০টি। কিন্তু প্রতি সীটে যাবে যাত্রী বাস কত সংখ্যক চললো, সেটা সমস্যা নয়। বাসের ভেতরে গাদাগাদি করে যে যাত্রী গেল- সেটাই বড় সমস্যা। এসব  ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে করোনা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণের জন্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে গণপরিবহন খুলে দিয়ে কি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

বাসে যদি প্রতি সীটে যাত্রী বসে তহলে খুব সহজেই করোনা পজিটিভ ব্যক্তি আরও ১০/২০ জনকে সংক্রমিত করতে পারবেন। লঞ্চেতো এ অবস্থা আরও ভয়াবহ। ট্রেনেও তাই। সরকার হয়তো মনে করছে, যে মাস্ক পরবে না, দূরত্ব বজায় রেখে চলবে না, তার দায়িত্ব সরকার নেবে কেমন করে। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ দায়িত্বে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তা না হলে তাদের পরিণতির দায়িত্ব সরকার নেবে না। আসলে এখন গণপরিবহন যেভাবে চালু করা হলো, তাতে করোনার বিস্তার ঘটার আশঙ্কাই প্রবল, করোনা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা নেই।

ভেবেছিলাম, এই দিকে টিকা নিয়ে কিছু লিখব না। কারণ টিকা নিয়ে সরকার কেবলই বলছে, কোটি কোটি ডোজ টিকা আসছে। টিকা কেনার চুক্তি হয়েছে। অমুক জায়গা থেকে লক্ষ লক্ষ ডোজ খয়রাতি টিকা আসছে। খয়ারত কি সহজে আসে? সরকার চীনের কাছে থেকে ৬ কোটি ডোজ টিকা কিনছে। ধরলাম এর প্রতি ডোজের দাম ১০ ডলার। টিকা দরকার কমপক্ষে ২২ কোটি ডোজ। গণস্থাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লা চৌধুরী বলেছেন, রাশিয়ার স্পুটনিক-ডি টিকা প্রতি ডোজ সাড়ে ৭ ডলারে অফার করছে তারা। প্রধানমন্ত্রী কথা বললেই এ টিকা সস্তায় আনা সম্ভব। কিন্তু সরকার সস্তায় জীবন রক্ষাকারী টিকা কিনতে চায় না। কারণ তাতে কমিশন বাণিজ্য কম হয়। আমরা বলি, মানুষের জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে কমিশন বাণিজ্যের কথা ভুলে সকলকে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করুন। শুধু লোক দেখানোর জন্য কিছু টিকা না ছিটিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করুন। জনগণকে বাঁচান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ