শুক্রবার ২০ মে ২০২২
Online Edition

সরকারি সংস্থার অপচয়

সরকার তথা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার আর্থিক অপচয় ও কেলেংকারি সম্পর্কে প্রায় নিয়মিতভাবেই অভিযোগ উঠে থাকে। এসব অভিযোগের সত্যতা অনস্বীকার্য হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই সঠিক তদন্ত এবং দায়ী কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলেই আর্থিক অপচয় ও কেলেংকারি শুধু অব্যাহত থাকে না, নতুন নতুন খবরেরও সৃষ্টি হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ উপলক্ষে অপচয়ের খবর সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। গতকাল গণমাধ্যমের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় বোর্ডের প্রধান কার্যালয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের নামে রীতিমতো বিলাসিতার আয়োজন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তোপখানা রোডে অবস্থিত সরকারের প্রশাসনিক সদর দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়ে ৩৬টি মন্ত্রণালয়ের জন্য যেখানে সব মিলিয়ে চার হাজার টন ক্ষমতার এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি মাত্র ১২ তলা ভবনের জন্যই দুই হাজার চারশ’ টন ক্ষমতার এসির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেটাও আবার সাধারণ এসি নয়, সেন্ট্রাল এসি। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, এটাই দেশের প্রথম সরকারি অফিস, যেখানে সেন্ট্রাল এসির ব্যবস্থা রয়েছে। 

ওদিকে আপত্তি উঠেছে বিভিন্ন কারণে। প্রধান কারণ বিদ্যুতের বিল। জানা গেছে, প্রায় চার লাখ ২০ হাজার বর্গফুটের ভবনটির সেন্ট্রাল এসির জন্য প্রতি মাসে ২৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা বিল গুনতে হচ্ছে। সে হিসাবে বছরে বিলের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে তিন কোটি টাকার মতো। তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন সরকারের পক্ষ থেকে সব সময় যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার কথা বলা হচ্ছে সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটিমাত্র ভবনের সেন্ট্রাল এসির জন্য এত বিপুল পরিমাণ বিলকে বিরাট অপচয় না বলে পারা যায় না।  

আপত্তির দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এসেছে অন্য কয়েকটি স্থাপনায় এসি ব্যবহারের উদাহরণ। যেমন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রয়েছে এক হাজার দুইশ’ টন ক্ষমতার এসির ব্যবস্থাÑ যদিও সেখানে ব্যবহার করা হয় আটশ’ টন। আরেক বড় স্থাপনা ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ব্যবহার করা হয় আড়াইশ’ টন ক্ষমতার এসি। এগুলোর বাইরে রান্নার জন্য সর্বক্ষণ চুলা জ্বালাতে হলেও সরকার নিয়ন্ত্রিত পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে রয়েছে ৯২০ টন ক্ষমতার এসি। 

প্রকাশিত রিপোর্টে বিশেষজ্ঞদের অভিমত এবং আরো কিছু উদাহরণের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই দফতরটি এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অফিস নয়, যেখানে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় করে সেন্ট্রাল এসির ব্যবহার করতে হবে।  এই ভবনে যারা বসেন ও কাজ করেন তাদের মধ্যে মন্ত্রী-উপমন্ত্রী এবং সচিবসহ জনা কয়েক ব্যক্তির জন্য দেড়-দুই টন ক্ষমতার উইন্ডো বা স্পিøট এসির ব্যবস্থা করলেই চলতো। কারণ, সচিবালয়সহ অন্য সকল স্থানেই এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ সকলে কাজও করছেন বছরের পর বছর ধরে। এ ধরনের কোনো স্থানেই সেন্ট্রাল এসির জন্য ইশারা-ইঙ্গিতেও বলা হয়নি। 

উল্লেখ্য, ‘আধুনিক পানি ভবন’ নামের এ দফতরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে। এর উদ্বোধন করা হয় ২০২০ সালের ১ অক্টোবর। ভবনটিতে পানি সম্পদ মন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দফতর রয়েছে। এটাকেই সেন্ট্রাল এসির ব্যবস্থা করার প্রধান যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে বিশিষ্টজনেরা একে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘এসি বিলাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বিলাসিতাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সুযোগ নেই। সরকারের উচিত, অন্তরালের দায়ী ও উদ্যোগী ব্যক্তিদের সম্পর্কে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া এবং অনতিবিলম্বে সেন্ট্রাল এসির পরিবর্তে প্রচলিত সাধারণ এসির ব্যবস্থা করা, যাতে বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়। একথা বুঝতে হবে যে, বাস্তব সকল কারণেই বাংলাদেশের কোনো সংস্থার বিলাসিতার আড়ালে আর্থিক অপচয় করা উচিত নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ