মঙ্গলবার ৩০ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

মহামারিতেও থেমে নেই অপহরণ-হত্যা

নাছির উদ্দিন শোয়েব: করোনা মহামারির মধ্যেও দেশে অপহরণ ও হত্যার ঘটনা থামছে না। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অপহরণের পর মুক্তিপণদাবি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। তবে কোনো কোনো ঘটনায় অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেও অনেক ঘটনায় অপহৃতকে হত্যার ঘটনা ঘটছে।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নিখোঁজের তিন দিন পর জিসানুল ইসলাম আকাইদ (৫) নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার শিশুটি নিখোঁজ হয়। গত সোমবার দুপুরে খিলগাঁও নন্দীপাড়া একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে শিশুটির গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটির হাত বাধা ছিল ও গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুকুল আলম জানান, শিশুটির বাবার নাম আবদুল মালেক। তিন দিন আগে এক রিকশাচালক শিশুটিকে রিকশা করে নিয়ে যায়। তারপর থেকে শিশুটি নিখোঁজ ছিল। পরিবারের লোকজন শনিবার থানায় একটি মামলা করেন। গত সোমবার নন্দীপাড়া নূর মসজিদ এলাকার একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। ওসি আরও জানান, ধারণা করা হচ্ছে অপহরণের পরে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এরআগে রাজধানীর কদমতলীতে অপহরণের পর নারী হত্যার রহস্য উদঘাটন করে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করেছে তারা। গ্রেফতারকৃত দু’জন হলেন- আবদুল হাই ও রানা। বৃহস্পতিবার রাতে রায়েরবাগ থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এর আগে কুমিল্লার মুরাদনগরে গত ২৯ মার্চ মুক্তিপণের ৫০ লাখ টাকা না পেয়ে আবদুর রহমান নামের পাঁচ বছরের একটি শিশুকে হত্যা করে তার আপন ফুফা! অপহরণের ৩৮ দিন পর আসামিদের দেওয়া তথ্য মতে মাটি খুঁড়ে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
আরেকটি ঘটনা, গত ২৩ জানুয়ারি গাজীপুরের গাছা এলাকায় নবম শ্রেণির ছাত্র তানভীর হোসেন সিয়ামকে তুলে নিয়ে ফোনে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পুলিশ পরে সিয়ামকে উদ্ধার এবং ছয় অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে। গাজীপুর ডিবির পরিদর্শক এ কে এম কাওসার চৌধুরী জানান, চক্রটি গাজীপুরে ১৭টি ঘটনা ঘটায়। ঢাকা, নরসিংদী, শেরপুর, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহে আছে একই চক্র। তারা স্কুল বা কোচিংগামী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে।
জানা যায়, অপহরণের এমন ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এসব ঘটনার শিকার বেশির ভাগই শিশু। পরিবারের কাছে মুক্তিপণ আদায় করার চেষ্টা করা হলেও হত্যা করা হচ্ছে শিশুটিকে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের হত্যা করার হার কম। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দ্রুত উদ্ধারে অভিযান না হওয়ায় মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে এবং মুক্তিপণ আদায় চলছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় দ্রুত পুলিশের কাছে যায় না অপহৃতের পরিবার তবে অভিযোগ পেলে তদন্তে নামে পুলিশ ও র‌্যাব।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাত বছরে শিশু অপহরণ বেড়েছে তিন গুণ। ২০১২ সালে অপহরণের শিকার হয় ৬৭ শিশু এবং ২০১৯ সালে ১৮৭ শিশু। ২০২০ সালের করোনাকালে অপহরণের শিকার হয় ১১৫ শিশু। অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, করোনা মহামারির এই সময়ে ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, দস্যুতাসহ প্রচলিত অপরাধ কমে এলেও অপহরণের ঘটনা তুলনামূলক বেড়েছে। গণমাধ্যমের খবর, পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে চার শতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়কালে ১১৫টি শিশুকে অপহরণ করা হয়। আর মুক্তিপণ দাবির পর ৩০টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।
পুলিশের সূত্র জানায়, অনেক ঘটনায় ছেলে-মেয়ে প্রেম করে পালিয়ে গেলেও অভিভাবকরা অপহরণ মামলা করেন। এসব ঘটনা পরে মীমাংসাও হয়ে যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টাকা লাভের আশায় অপহরণে ঝুঁকছে অনেকে। করোনার দুর্যোগকালে এই অপরাধ তাই বাড়ছে। অপহরণ কমাতে বিশেষ টিমের দ্রুত অভিযান প্রয়োজন। র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তিন মাসে ৫৯টি অপহরণের ঘটনায় অভিযান চালিয়েছে সংস্থাটি। জঙ্গি, মানবপাচার, হত্যা, প্রতারণা, ধর্ষণের চেয়ে বেশি এসেছে অপহরণের অভিযোগ। ২৮ নারী, ২৪ পুরুষ ও আট শিশুকে উদ্ধার এবং একজনের লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব। গত বছর ১৪৫টি ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ১৮৫ জনকে উদ্ধার কর হয়। একটি লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে সড়কের পাশে গত ৩ আগস্ট পাওয়া বস্তাবন্দি অজ্ঞাত তরুণীর হত্যা রহস্য জানিয়েছে পিবি আই পুলিশ। এ ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার্থী খোদেজা আক্তারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে রং নম্বরে পরিচয় হয় নরসুন্দর (নাপিত) কৃষ্ণ চন্দ্র দাসের (২৮)। নাম পরিচয় গোপন করে নিজেকে ব্যবসায়ী বলে সানি নাম ব্যবহার করে ওই ছাত্রীর সঙ্গে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস। এক পর্যায়ে তারা দুজনেই দেখা করতে চায়। দেখা করার পর একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয় খোদেজা। এরপর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। লাশ বস্তাবন্দি করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এনে রাস্তার পাশে ফেলে যায়। পরদিন লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ।
গত ৮ আগস্ট বিকেলে বস্তাবন্দি তরুণীর লাশের খুনের রহস্য জানান, টাঙ্গাইলের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিকেশন (পিবি আই) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সিরাজ আমীন। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছেন, গোপালপুর উপজেলার বেঙ্গুলা গ্রামের মৃত নগেন চন্দ্র দাসের ছেলে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস ওরফে সানি, ধনবাড়ী উপজেলার ইসপিনজারপুর গ্রামের মো. মোশারফ হোসেনের ছেলে সৌরভ আহম্মেদ হৃদয় (২৩), একই গ্রামের মো. গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মো. মেহেদী হাসান টিটু (২৮) ও মৃত মজিবর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান (৩৭)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ