বুধবার ২৫ মে ২০২২
Online Edition

টিকার সংকট

দফায় দফায় লকডাউনশেষে আজ, ১১ আগস্ট থেকে দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।  অন্যদিকে গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানা গেছে, লকডাউন শেষ হওয়ার আগেই রাজধানীসহ দেশের প্রায় সকল এলাকায় সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রাইভেট কার ও ট্রাক-বাস-মিনিবাসের পাশাপাশি সিএনজির মতো যানবাহনও প্রকাশ্যে চলাচল করেছে। শুধু তা-ই নয়, রাজধানীর কাকরাইলসহ অনেক স্থানে স্বাভাবিক সময়ের মতো যানজটেরও সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের সচিত্র রিপোর্ট দেখার পর কারো মনেই হয়নি যে, দেশে লকডাউন চলছে এবং যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
একই কারণে যাত্রীকল্যাণ সমিতি এবং বাসমালিক সমিতির মতো বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, নতুন পর্যায়ে যতো বিধিনিষেধই জারি করা হোক না কেন, যানবাহন যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, তেমনি ব্যর্থ হবে করোনার সংক্রমণ রোধের চেষ্টাও। উল্লেখ্য, ১১ আগস্ট থেকে মেনে চলার জন্য সরকার আট দফা বিধিনিষেধ জারি করেছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের আশংকা, এই সময়ে কোনো রকম বিধিনিষেধ আরোপ করতে গেলেই উল্টো বিশৃংখলার সৃষ্টি হবে। এমন অবস্থায় কেউই সরকারের নির্দেশ মান্য করবে না।
ওদিকে সাধারণভাবেও দেশের করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে চলেছে। গতকাল বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ৯ আগস্ট পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আরো ২৪৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। গতকাল মারা গেছে আরো ২৬৪ জন। এ নিয়ে দেশে করোনায় মৃতদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ২৬১।  অন্য একটি তথ্য হলো, এক সপ্তাহে করোনা ভাইরাসে নিশ্চিত আক্রান্তদের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪১৯ জনে। এদের মধ্যে সর্বশেষ এক সপ্তাহে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৪৬৩ জন। তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়া সম্পর্কে প্রথম জানানোর পর এত কম সময়ে এত বেশি রোগী আর কখনও শনাক্ত হয়নি। তাছাড়া মৃতদের সংখ্যাও প্রতিদিন গড়ে ২৫০ জনের বেশি থাকছে। এভাবে সব মিলিয়েই করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে উঠেছে।
এমন এক অবস্থায় সুচিন্তিত কৌশল ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ও আশাবাদের সৃষ্টি করা যেখানে সরকারের দায়িত্ব ছিল, তখন কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উল্টো সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, মন্ত্রীসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য ও কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বাস্তবে না পারলেও একের পর এক পরিকল্পনা ও কর্মসূচীর ঘোষণা দিচ্ছে সরকার। যেমন এরকম এক ঘোষণায় জানানো হয়েছিল, ৭ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এক কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। প্রথমদিনই ৩২ লাখ মানুষকে টিকা দেয়া হবে। এ উদ্দেশ্যে সারাদেশে প্রায় ১৪ হাজার টিকা কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। টিকা দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকবে ৮১ হাজার ১৬৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী।
অন্যদিকে টিকা দেয়া সম্পর্কিত সরকারের এ ঘোষণাটিও অসত্য এবং কেবলই প্রচারণা বলে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, এক কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৯ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের হাতে টিকাই ছিল ৭০ লাখের মতো। এ থেকেও আবার দ্বিতীয় ডোজের জন্য কয়েক লাখ টিকা রাখতে হবে। ওদিকে এক কোটি ১০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করে টিকার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। মোট নিবন্ধন করেছেন আড়াই কোটি। কিন্তু তাদের অধিকাংশই টিকা দেয়ার নোটিশ বা এসএমএস পাননি।
কর্তা ব্যক্তিরা অবশ্য কথায় পিছিয়ে থাকছেন না। যেমন ৯ আগস্টও স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ১২ আগস্টের মধ্যে ৩৪ লাখ নতুন টিকা আসতে পারে। এ ধরনের আরো কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়েও প্রমাণিত হয়েছে, যথেষ্ট পরিমাণ টিকার ব্যবস্থা না করেই সরকার এক কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। বড় কথা, ১০ আগস্ট পর্যন্তও সরকার সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি, কবে নাগাদ ঠিক কত পরিমাণ টিকা যোগাড় করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ টিকার দিক থেকে বাংলাদেশ চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, করোনার সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুও যখন লাফিয়ে বাড়ছে তেমন এক কঠিন সময়ে টিকাসহ চিকিৎসার ব্যাপারে এ ধরনের ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা এবং ভুল পরিকল্পনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারের উচিত, কেবলই আমলা এবং দলীয় নেতাদের কথাকে প্রাধান্য দেয়ার পরিবর্তে দেশপ্রেমিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং সে অনুযায়ী টিকা আমদানির জন্য জরুরিভাবে তৎপর হয়ে ওঠা। একই সঙ্গে বিশেষ করে চীনের সঙ্গে চুক্তি করে দেশেই টিকা উৎপাদনের জন্যও পদক্ষেপ নেয়া দরকার। একথা বুঝতে হবে যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে করোনার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং ব্যবস্থা নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ