মঙ্গলবার ৩০ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

হাসপাতালের ‘পর্দাকাণ্ড’ মামলার তদন্ত আড়ালে ॥ বাকী মামলার খবর নেই

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : এক সেট পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা! চোখ কপালে ওঠার মতো এমন ব্যয় দেখানো হয়েছিল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কেনাকাটায়। তাও আবার ওই পর্দা কেনা হয়েছিল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ব্যবহার করার জন্য। যেখানে আইসিইউই ছিলনা। এমন অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
আলোচিত ওই ঘটনার কুশীলবদের ধরতে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তিন চিকিৎসকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়। পর্দার আড়ালে থাকা ঠিকাদার চক্রের কুৎসিত রূপ উন্মোচন করা গেলেও এখনও তাদের শাস্তির মুখোমুখি করা যায়নি। কারণ, মামলা দায়েরের পর পার হয়েছে দুই বছর। এরপরও তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি দুদক। অভিযোগপত্রও (চার্জশিট) দেওয়া হয়নি আদালতে। এ অবস্থায় ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। প্রশ্ন উঠেছে, আলোচিত ‘পর্দাকাণ্ডের’ কুশীলবরা কি পর্দার আড়ালেই থেকে যাবেন?
এদিকে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রয় সংক্রান্ত আরও বেশকিছু অভিযোগ থাকলেও সে বিষয়ে নতুন কোনো মামলা হয়নি। যদিও দুদকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, করোনা মহামারির কারণে মূলত অনুসন্ধান ও তদন্তকাজের গতি কমেছে। তদন্ত শেষ হলে আরও মামলা দায়েরেরও প্রস্তুতি রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে শুরু থেকেই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে দুদক। এ কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা দায়ের হয়। তবে করোনার কারণে তদন্তকাজ একটু ধীরগতিতে চলছে। ‘মহামারির সময় হাসপাতালের সেবা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে কারণে একটু ধীরগতিতে এগোচ্ছি আমরা। কারণ, মামলার আসামির সংখ্যা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে হাসপাতালের বেশকিছু চিকিৎসক ও কর্মকর্তা চার্জশিটভুক্ত আসামি হতে পারেন। করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আরও মামলা হতে পারে। এছাড়া দায়ের করা মামলার চার্জশিটও দ্রুত দেয়া হবে। আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।’
জানতে চাইলে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ থেমে নেই। করোনা মহামারির কারণে সার্বিক কাজের গতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারপরও যথা সময়ে অনুসন্ধান ও তদন্তকাজ শেষ করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারের ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর তিন চিকিৎসকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার আসামিরা হলেন-ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক প্যাথলজিস্ট, বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের প্রভাষক ডা. এ এইচ এম নুরুল ইসলাম, জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. মীনাক্ষী চাকমা, সহযোগী অধ্যাপক (ডেন্টাল) ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. গণপাতি বিশ্বাস, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেন, মুন্সী সাজ্জাদের দুই ভাই মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মালিক মুন্সী ফররুখ হোসাইন ও মেসার্স অনিক ট্রেডার্সের মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ নেই। তারপরও আইসিইউ ইউনিটের জন্য ৪০ গুণ বেশি দামে রোগীকে আড়াল করে রাখার জন্য এক সেট পর্দা কেনা হয়। ২০১৪ সালের কার্যাদেশ অনুযায়ী, মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর হাসপাতালে ১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও মালামাল সরবরাহ করে। বাজার মূল্যের চেয়ে যা কয়েকগুণ বেশি দাম ধরা হয়।
এদিকে, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিল দাখিল করা হলে আদালতের হস্তক্ষেপে তা আটকে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দরপত্রে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠান তিনটির মালিক তিন ভাই। ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসাইন মূলত প্রতিষ্ঠান তিনটি পরিচালনা করেন। তার দুই ভাই মুন্সী ফররুখ হোসাইন ও আবদুল্লাহ আল মামুনের নামে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। কাগজে-কলমে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও মুন্সী সাজ্জাদই ছিলেন ওই টেন্ডারের মূল নিয়ন্ত্রক। তিনিই সিন্ডিকেট করে সাজানো দরপত্র দাখিল করেন।
কার্যাদেশ পাওয়ার পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে হাসপাতালে মালামাল সরবরাহ করে দুটি বিল জমা দেয় অনিক ট্রেডার্স। এর মধ্যে একটিতে সাত কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং অপরটিতে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা বিল করা হয়। তদন্তে দুদক জানতে পারে, বাজারদর কমিটির মাধ্যমে মেডিকেল যন্ত্রপাতির অতিমূল্যায়ন, সরকারি অর্থের ক্ষতি করে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য ঠিকাদার সিন্ডিকেট উচ্চমূল্যে দরপত্র দাখিল ও কার্যাদেশ নেয়। হাসপাতালের জন্য অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা ও কেনাকাটার নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়।
তদন্তে উঠে আসে অবৈধভাবে ১০টি আইটেম কেনা দেখিয়ে সরকারের ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করে ওই সিন্ডিকেট। এজন্য অভিযুক্ত ছয়জনের বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ৪০৯, ৫১১, ১০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় মামলাটি করা হয়।
হাসপাতালের ক্রয় দুর্নীতির বিষয়ে দুদক সূত্রটি আরও জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মেসার্স অনিক ট্রেডার্স অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে হাসপাতালে ৫২ কোটি ৬৬ লাখ ৭১ হাজার ২০০ টাকার ১৬৬ ধরনের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। এসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত বাজারমূল্য ১১ কোটি ৫৩ লাখ ৪৬৫ টাকা। এরই মধ্যে অনিক ট্রেডার্স ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৩৭ টাকার বিল উত্তোলন করে। যেখানে পর্দা ছাড়াও তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা দামের একেকটি স্টেথোস্কোপের দাম দেখানো হয় এক লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে; ১০ হাজার টাকার ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মাপার মেশিন কেনা হয় ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। অব্যবহৃত আইসিইউর জন্য অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্টের দাম দেখানো হয় পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এভাবে কয়েকশ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে যন্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে মেসার্স অনিক ট্রেডার্স। এ কারণে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে আরও অন্তত ছয়টি মামলার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নানা অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে বিষয়টি উচ্চ আদালতেরও নজরে আসে। আদালত ২০১৯ সালের ২০ আগস্ট অনিয়মের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য দুদককে নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০১৯ সালের প্রথম সপ্তাহে সরেজমিনে ফরিদপুর যায় দুদকের বিশেষ টিম।
ওই সময় দুদকের উপপরিচালক শামছুল আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করে। টিমের বাকি সদস্যরা হলেন-দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমান ও ফেরদৌস রহমান। বর্তমানে ওই কমিটির প্রধান দুদকের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম।
১৯৭৯ সালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে পশ্চিম খাবাসপুর ও হারোকান্দি এলাকায় প্রথমে ২০০ শয্যা দিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যাত্রা শুরু। ১৯৯৫ সালে ২৫০ শয্যা এবং পরবর্তীতে এটি ৭৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ