বুধবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জোয়ার এলেই খুলনা শহরের নিম্নাঞ্চল ভাসে রূপসা নদীর পানিতে

# জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে রূপসা নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে। সে তুলনায় আমাদের জনবসতি ও লোকালয় নিচে চলে যাচ্ছে। ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতা  সমস্যা আজকের নয়, অনেক আগের।
খুলনা অফিস : জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানিতে খুলনা শহরের টুটপাড়া মেইন রোড, দারোগাপাড়া, আজিজুর রহমান সড়ক, গগণবাবু রোড, খান জাহান আলী রোডস্থ খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল ও কেসিসি উইমেন্স কলেজ মোড়, টিবি ক্রস রোড, রূপসা স্ট্যান্ড রোড, নতুন বাজার চরবস্তি, নতুন বাজার এ্যাপ্রোচ রোডসহ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এসব এলাকার বাসাবাড়িতে জোয়ারের সময় নদীর পানির চাপে ড্রেনের পানি ঢুকে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে গৃহস্থালির মালামাল। অধিকাংশ বাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে গেছে। আসবাবপত্রের নিচে ইট দিয়ে উঁচু করে তার ওপর মালামাল রাখা হয়েছে। চুলায় পানি প্রবেশ করায় রান্নাবান্নায় সমস্যা হচ্ছে। বাথরুমে পানি প্রবেশ করায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এসব এলাকার নারী-শিশুরা সর্দি-কাশি ও পায়ের চামড়ার রোগে ভুগছেন। বিভিন্ন এলাকার গলিসহ প্রধান সড়কগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী, ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও যানবাহনের আরোহীরা। ফুটপাতে পানি জমে যাওয়ায় জুতা খুলে কাপড় গুছিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে পথচারীদের। আবার অনেকে রিকশায় চড়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় রাস্তাঘাটে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে পড়ে চলাচলরত যানবাহন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। টুটপাড়া মেইন রোডের একটি অংশ ড্রেনে ভেঙে পড়েছে।
রূপসা স্ট্যান্ড রোড এলাকার বাসিন্দা রওশনারা বেগম জানান, তাদের বাড়িসহ আশপাশের কয়েকটি বাড়ির মধ্যে পানি ঢুকে গেছে। এখন সব মালামাল খাটের ওপর তুলে রেখেছেন।
গগণবাবু রোড এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. জামসেদ আলী জানান, কয়েক দিন ধরে পানিতে রাস্তা ডুবে যাচ্ছে। পানি বাড়ির মধ্যেও ঢুকে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয় তাহলে নিচু এলাকার মানুষ বেকায়দায় পড়ে যাবে।
টুটপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহিন জানান, কড়া রোদের মধ্যেও জোয়ার এলে আমাদের এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। আর সেই সঙ্গে বৃষ্টি হলে বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। মাসের পর মাস এ অবস্থা চলছে। আমরা শহরের মানুষ না উপকূল এলাকার বাসিন্দা পার্থক্য করতে পারি না।
ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শাহাদাৎ হোসেনের অভিযোগ, সাহেবখালী খালের স্লুইস গেটের পাত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে জোয়ারের আগে গেট বন্ধ করতে না পারায় এমন অবস্থা হচ্ছে।
রূপসা পাইকারি মাছ বাজার সংলগ্ন সাহেবখালি খাল স্লুইস গেটে গিয়ে দেখা গেছে, স্থাপনাটি বহু পুরানো হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পিলারের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে বড় আকারের ফাটল। প্রতিদিন জোয়ারের সময় স্লুইস গেটের পাটা বন্ধ করা এবং ভাটার সময় খুলে দেওয়ার জন্য একজন কর্মচারী নিযুক্ত আছেন। তবে তিনটি পাটার পাশে রাবারের তৈরি ওয়াটার সিল বহুল ব্যবসায়ে ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। জোয়ারের সময় পানির চাপ বাড়লে গেট উপচে ভেতরে প্রবেশ করছে।  
দারোগাপাড়ার বাসিন্দা চৌধুরী হাসানুর রশিদ মিরাজ দুর্বিসহ অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, জোয়ারের সময় আর বৃষ্টি হলেই দারোগাপাড়া পানির নিচে চলে যায়। হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিবন্দি হয়ে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। বর্তমানে জোয়ার চলছে। এখন হাঁটু পানি। জোয়ারের পানি নামতে প্রায় চায় ঘণ্টা সময় লাগে। এ দীর্ঘ সময় দুর্বিসহ অবস্থার মধ্যে থাকতে হয় আমাদের।
তিনি জানান, দারোগাপাড়ার আজিজুর রহমান সড়কের দুই/তিনটি ড্রেনের কালভার্ট ভেঙে গেছে। সম্প্রতি জোয়ারের পানিতে না দেখে একজন ড্রেনে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে জোয়ারের পানি খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল ও কেসিসি উইমেন্স কলেজের মাঠে থৈ থৈ করছে। জাহাননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের নির্মাণকাজ জোয়ারের পানির জন্য বন্ধ আছে।
একই এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুর রহমান বলেন, জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা। জোয়ার-ভাটার খেলা চলে এ এলাকায়। এতে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ পথচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
টিবিক্রস রোডের বাসিন্দা মাহবুবুল আলম বলেন, চলমান বর্ষা মওসুমে টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বর্তমান জোয়ারের পানিতে রিকশাও ডুবে যাচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সড়কটি দিয়ে চলাচলকারীদের।
সাহেবখালি খালের স্লুইস গেট জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় জোয়ারের পানি ঠেকাতে পারছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। আর খুলনা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, রূপসা নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের চাপে পানি উপচে শহরে ঢুকছে।
স্লুইস গেট তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কেসিসির সুপারভাইজার হাফিজুর রহমান বলেন, পাটার পাশের রাবারের ওয়াটার সিল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের পানি আটকানো যাচ্ছে না। তাছাড়া স্লুইস গেটটি অনেক পুরানো হয়ে গেছে। পিলারে ফাটল ধরেছে, ভেঙে পড়েছে। তবে স্লুইস গেটের অব্যবস্থাপনার কারণে নয়, বরং রূপসা নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের পানি উপচে শহরে প্রবেশ করছে বলে দাবি করেছেন কেসিসির সহকারী কনজারভেন্সি অফিসার নুরুন্নাহার এ্যানি। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে রূপসা নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে। সে তুলনায় আমাদের জনবসতি ও লোকালয় নিচে চলে যাচ্ছে। ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা আজকের নয়, অনেক আগের। স্লুইস গেটে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে মেরামত করা হচ্ছে। জোয়ারে পানি উঠলেও ভাটায় নেমে যায় বলে খুব একটা সমস্যা হয় না। সমস্যা সমাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কেসিসির পরিকল্পনা বিভাগ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে বলে জানান এ্যানি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ