মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
Online Edition

চট্টগ্রামে ২৪ ঘন্টায় ১২ জনের মৃত্যু ॥ নতুন শনাক্ত ৮৪৮ জন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা এর জন্য দায়ী বলে চিকিৎসকরা বলছে। লকডাউন দেয়ার পরেও মানুষ ঘরে থাকতে চাইছে না। যার ফলে চট্টগ্রামে প্রতিদিন করোনা পজিটিভ এখন আর ৮০০-র নিচে নামছেই না। এদিকে গত ২৪ ঘন্টায় চট্টগ্রামে করোনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।এর মধ্যে ৪ জন চট্টগ্রাম নগরের এবং বাকি ৮ জন উপজেলার। এছাড়া চট্টগ্রামে আরও ৮৪৮ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা যেমন তুলনামূলক বেশি হচ্ছে, শনাক্তও হচ্ছে বেশি।গতকাল সোমবার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৮৪৮ জনের নমুনায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হলে চট্টগ্রামে মোট করোনারোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ৩২৬ জনে।   
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নগরীর আটটি ল্যাব ও এন্টিজেন টেস্টে গত ২৪ ঘন্টায় ২ হাজার ২৮২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলে নতুন ৮৪৮ জন করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন। এদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাব, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাব এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাবে কোনো নমুনা পরীক্ষা হয়নি।নতুন শনাক্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে রয়েছে ৫৮০ জন এবং ১৪ উপজেলায় ২৬৮ জন। উপজেলায় আক্রান্তদের মধ্যে পটিয়ায় সর্বোচ্চ ৪৩ জন, বোয়ালখালীতে ৩৮ জন, সন্দ্বীপে ৩৩ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৩২ জন, চন্দনাইশে ৩০ জন, সীতাকুন্ডে ১৭ জন, লোহাগাড়ায় ১৬ জন, ফটিকছড়িতে ১৪ জন, হাটহাজারীতে ১০ জন, মিরসরাইয়ে ১২ জন, সাতকানিয়ায় ৭ জন, রাউজানে ৪ জন, আনোয়ারায় ৩ জন, বাঁশখালীতে রয়েছেন ৯ জন। চট্টগ্রাম জেলায় করোনাভাইরাসে মোট সংক্রমিতের সংখ্যা এখন ৭৬ হাজার ৩২৬ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দা ৫৭ হাজার ৫৮৯ জন এবং ১৪ উপজেলার ১৮ হাজার ৭৩৭ জন।গত ২৪ ঘন্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরে আরও ৪ জনের মৃত্যু হল। এদিন উপজেলায় মারা গেলেন ৮ জন। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে করোনায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯৭ জনে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের ৫৪৭ জন ও উপজেলার ৩৫০ জন।
ল্যাবভিত্তিক রিপোর্টে দেখা যায়, ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস ল্যাবে (বিআইটিআইডি) ১১৯ জনের নমুনা পরীক্ষায় চট্টগ্রাম নগরের ৫০ ও উপজেলার ৩ জন জীবাণুবাহক পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ল্যাবে ২৩৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলে নগরের ৯৭ জন ও উপজেলার ২১ জনের শরীরে জীবাণুর উপস্থিতি চিহ্নিত হয়। অন্যদিকে ১ হাজার ৪৪টি এন্টিজেন টেস্টে মহানগরের ১৪১ জন ও উপজেলার ২০৩ জন মিলিয়ে মোট ৩৪৪ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। নগরীর বিশেষায়িত কোভিড চিকিৎসা কেন্দ্র আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের আরটিআরএল-এ পরীক্ষা করা ৮২টি নমুনায় উপজেলার ৪৯টি নমুনার ফলাফল পজিটিভ আসে। এদিকে বেসরকারি ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির মধ্যে আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালে ১২০টি নমুনায় চট্টগ্রাম নগরের ৬৮ ও উপজেলার ৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। অন্যদিকে বেসরকারি শেভরন ল্যাবে ৩২২টি নমুনার মধ্যে উপজেলার ১৯টিসহ ৮৫টি নমুনার ফলাফল পজিটিভ আসে। এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে ৬৫টি নমুনায় চট্টগ্রাম নগরের ৩০ ও উপজেলার ১ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। ইপিক হেলথ কেয়ারে ৪৬টি নমুনায় চট্টগ্রাম নগরের ২৮ ও উপজেলার ২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। ইমপেরিয়াল হাসপাতাল ল্যাবে ২৪৬টি নমুনায় চট্টগ্রাম নগরের ৬০ ও উপজেলার ৫ জনের শরীরে করোনা চিহ্নিত হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামে যেমন বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা, চিকিৎসা পাওয়ার আশায় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ছোটাছুটির পরিমাণও সেভাবেই বেড়ে গেছে ব্যাপকভাবে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কোথাও আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা আক্রান্তদের মধ্যে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের জন্য আইসিইউ বেডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা। তবে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার ব্যবহার হচ্ছে অনেকটাই কম।চিকিৎসকরা বলছেন, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন। তাই সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ বলছে, আপাতত এর চেয়ে বেশি হাই ফ্লো ব্যবহার করার পরিকল্পনা তাদের নেই।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর জন্য সাধারণ শয্যা রয়েছে ১ হাজার ৬০০টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৯৫০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৬৫০টি। এছাড়া চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা আছে ২৬টিতে। সরকারি ৪৭টিসহ হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে ১৭১টি। ৮০টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৫৬টি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোববার (২৫ জুলাই) পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যা কোথাও খালি ছিল না। আইসোলেশন ওয়ার্ডেও শয্যা খালি আছে হাতেগোনা কয়েকটি। হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি করানোর আগে বলে দেওয়া হচ্ছে, নরমাল বেড দিতে পারলেও আইসিইউ বেড কিংবা উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দেয়ার ব্যাপারে তারা নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
জানা গেছে, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার মাধ্যমে রোগীদের ৮০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া যায়। আর করোনাভাইরাসে ভোগা বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই এখন উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দরকার হচ্ছে।অনেক রোগীকে সঠিক সময়ে হাই ফ্লো দেয়া গেলে আইসিইউর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রয়োজন থাকলেও অনেক রোগীকে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবহার হচ্ছে মা ও শিশু হাসপাতালে। সেখানে ৩৩টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবহার হচ্ছে। অথচ সরকারি দুই হাসপাতাল মিলিয়ে ব্যবহার হচ্ছে এর চেয়ে কম। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এই মুহূর্তে ১৮টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্র ১৩টি। তবে তাদের হাতে আরও ১৩টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা রয়েছে, যেগুলো সচল হলেও ব্যবহার হয় না। অন্যদিকে চমেক হাসপাতালে ৪০টির মতো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে, যেগুলো নষ্ট। গত কয়েকদিনে চট্টগ্রামে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার প্রয়োজন হওয়া রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে ভোগান্তির কথা শোনা যাচ্ছে বেশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ