মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ইট-পাথরের শহরে নৈসর্গিক স্বর্গরাজ্য ‘ঠিকানা ডে আউটার্স’

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : রাজধানীর একেবারেই কাছে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন এক রিসোর্ট। হাজারো ফুল দিয়ে সাজানো এ রিসোর্ট এখন পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের ঠিকানা। ছুটির দিনগুলোতে সেখানে থাকে উপচেপড়া ভিড়। একপাশে সুদৃশ্য বড় লেক, অন্যপাশে প্রাকৃতিক পরিবেশের আবহ। মাঝখানে সাদা, লাল, গোলাপি, বেগুনিসহ বাহারি ফুলের মিশেল- এ যেন এক নৈসর্গিক স্বর্গরাজ্য। রেস্টুরেন্টটির পুরোনাম ‘ঠিকানা ডে আউটার্স’ হলেও সবাই একে ‘ঠিকানা’ বলেই চেনে। ইট পাথরের ঢাকায় প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে আমরা কত জায়গায়ই না ছুটে বেড়াই। অথচ, আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে গ্রামীণ পরিবেশের রেস্টুরেন্ট ‘ঠিকানা’।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে অনেকে আমরা দূর-দূরান্তে পাড়ি দেই-কিন্তু রাজধানীতেই রয়েছে এমন একটি জায়গা যেখানে বসেই দেখতে পাবেন সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ভরা পূর্ণিমা একসঙ্গে। আর সেটা গুলশান বনানী বা বারিধারা থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে। বর্তমান বেশিরভাগ রিসোর্ট বা আউটিং গড়ে উঠেছে গাজীপুরকেন্দ্রিক, যার ফলে সেখানে যেতে আসতে রাস্তার যানজটের কারণে আপনার দিন ফুরিয়ে যায়, আর এসব মাথায় রেখে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ঠিকানা’। ঢাকার নতুন বাজার থেকে মাদানী এভিনিউ ১০০ ফিট হয়ে একটু ডানে মোড় নিলেই বেরাইদে বালু নদীর তীর ঘেঁষে এ ঠিকানা ডে আউটার্সের অবস্থান, শুধু ঠিকানা বললে ভুল হবে-বলতে হবে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, খোলা মাঠ, সবুজ ধান ক্ষেত ও গ্রামীণ পরিবেশে চিরসবুজের ঠিকানা।
ঠিকানা ডে আউটার্স তৈরি করা হয়েছে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ির নান্দনিক কারুকার্য সমৃদ্ধ করে। ঠিকানার পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে আপনাকে। মনে হবে যেন আপনি রয়েছেন শুধু গ্রামীণ পরিবেশ নয় চির সবুজের গ্রামে। স্বল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা শহরবাসী পরিবার ও কর্পোরেট হাউসগুলোর সর্বাধিক পছন্দের জায়গাতে রূপ নিয়েছে এ ঠিকানা ডে আউটার্স। ঠিকানার সম্মুখে রয়েছে আম বাগান ও সবুজ ঘাসের চাদরে মোড়া মাঠ, চাইলে আপনার বাচ্চারা খেলাধুলা করে মিষ্টি সময় কাটাতে পারবে এ গ্রামীণ পরিবেশে। নিয়ম অনুযায়ী অগ্রিম টেবিল বুকিং করে পছন্দমতো খাবার খেতে আসতে পারবেন এ ঠিকানায়। এখানের খাবারের তালিকার রয়েছে দেশীয় নানা রকমের পিঠার আয়োজন। আপনি দেখতে পাবেন গ্রামীণ মাটির চুলায় পিঠা তৈরি প্রণালী-চাইলে চুলার পাশে কুঁড়েঘরে বসে খেতে পারবেন গরম গরম পিঠা, এছাড়া ঠিকানার নিজস্ব ক্ষেতে চাষ করা শাকসবজি ও মাছ খাওয়ার সুযোগ তো থাকছেই।
ঠিকানায় প্রবেশের মূল ফটক থেকে শুরু করে পুরোটাজুড়ে খুঁজে পাবেন গ্রামীণ শৈল্পিক ছোঁয়া, আকাশ ও প্রকৃতির নানা সময়ে নানা রং ও রূপ। আপনি হয়তোবা আপনার ছেলেবেলার দিনগুলোতে অনায়াসে হারিয়ে যাবেন এ ঠিকানায়। যারা পিঠা খেতে ভালোবাসেন তাদের জন্য সকাল ৬টা থেকে খুলে যায় ঠিকানার রান্নাঘর-গ্রামের বৌ-ঝিরা পিঠা বানাতে শুরু করেন। বুকিং করে পিঠার ফরমাইশ দিয়ে চলে যেতে পারেন ঠিকানায়। ভোর ৬টা থেকে শুরু করে রাত বারোটা পর্যন্ত ঠিকানাতে আসতে ও অবস্থান করতে পারবেন। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে পিঠা ছাড়া সকালের নাস্তাও করতে পারবেন এ ঠিকানায়। আপনার যদি ধারণা হয়ে থাকে ঠিকানাতে শুধু দেশীয় খাবার পাওয়া যাবে তাহলে ভুল করবেন, ঠিকানাতে দেশীয় খাবারের পাশাপাশি পাওয়া যাবে উন্নত দেশগুলোর নামি-দামি সব খাবার ও কাবাবের সমারোহ। ঠিকানাতে রয়েছে উন্নতমানের কফিশপ যেখানে সুদূর ব্রাজিল থেকে বিন এনে কফি তৈরি করা হয়। সর্বোপরি বলা চলে যে ঠিকানা আপনার পরিবার বা প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানোর মতো এমন এক জায়গা যেখানে আপনি পাবেন আপনার পছন্দমতো খাবারের স্বাদ নেয়ার সুযোগ। পরিবার অথবা অফিসের- গেট টুগেদার, পিকনিক, কনফারেন্স, গায়ে হলুদ, বিবাহ, জন্মদিনের আয়োজন করতে পারবেন ঠিকানায়।
ঠিকানার ভেতরে একই সঙ্গে ৪০০ জনের যে কোনো আয়োজন করতে পারবেন আপনি। এছাড়া ঠিকানার মাঠেও আপনি করতে পারবেন আরও হাজারখানেক লোকের যে কোনো আয়োজন। রয়েছে পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ছবি তোলার জন্য এ রেস্টুরেন্টে বাহারি রঙের ফুল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্পট। যা সহজেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পুরো ঠিকানা জুড়ে রয়েছে কয়েক’শ ফুলের গাছ। দেখেই মনে হবে, কোনো ফুলের রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চাইলে পছন্দমতো ফুল গাছের চারাও কিনতে পারবেন এখান থেকে।
অল্প সময়ের মধ্যেই রেস্টুরেন্টটি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াও কর্ম দিবসের দিনগুলোতেও এখানে সাধারণ মানুষের ভিড় লেগে থাকে। প্রবেশ মূল্য: ঠিকানা রেস্টুরেন্টে জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য ২০০ টাকা। কমপক্ষে একদিন আগে বুকিং করতে হবে। ঠিকানা ডে আউটার্স রাজধানী ঢাকার বাড্ডার মাদানি এভিনিউ এলাকার ১০০ ফিটে অবস্থিত। খাবারের দরদাম: ঠিকানা ডে আউটার্স এর খাবারের মান অনেক উন্নত। এখানে সকল দেশীয় খাবারের পাশাপাশি বিদেশী খাবারও পাওয়া যায়। এই রেস্টুরেন্টে খাবারের একাধিক প্যাকেজ রয়েছে। খাবার প্যাকেজের মূল্য তালিকা-বোরহানি ৪০ টাকা। ড্রিঙ্কস ১২৫-৩০০ টাকা। কফি  ২০০-২৬০ টাকা। বার্গার এবং ফাস্ট ফুড ৩০০-৫৯০ টাকা। ফিঙ্গার ফুড ৩২০-৭০০ টাকা। চাইনিজ ফুড ৪৩০-৫৬০ টাকা। কাবাব ৫৮০-১৭২০ টাকা। সেট মেনু ৬৫০-১১৩০ টাকা। ঠিকানা স্পেশাল ৮৬০-৫৫০০ টাকা। এছাড়াও বাংলা, ইন্ডিয়ান, ইতালিয়ান এবং মেক্সিকোন ফুড রয়েছে। ঠিকানার রেস্টুরেন্টে যেসব খাবার তৈরি হয়, তার বেশিরভাগই এ মাঠের শাক-সবজি দিয়ে। মাটির চুলায় রান্না করা খাবারও আপনি সেখানে খেতে পারবেন। দেশীয় খাবারের পাশাপাশি ঠিকানায় বিভিন্ন বিদেশি খাবারের সেট মেন্যু পাবেন। পছন্দমতো খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ঠিকানাতে রয়েছে উন্নতমানের কফিশপ। যেখানে সুদূর ব্রাজিল থেকে বিন এনে কফি তৈরি করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী অগ্রিম টেবিল বুকিং করে পছন্দমতো খাবার খেতে আসতে পারবেন এ ঠিকানায়।
নিয়মাবলী : রেস্টুরেন্টে ঢুকতে গেলে ২০০ টাকা লাগবে। খাবার অর্ডার করলে খাবারের মোট বিলের উপর ২০০ টাকা কেটে নেওয়া হবে। আর খাবার অর্ডার না করলে এই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না।
কিভাবে যাবেন : নতুন বাজার থেকে লেগুনা পাওয়া যায়। বলতে হবে বেরাইদ ঠিকানা রেস্টুরেন্টে যাবো। ভাড়া নিবে ২০/২৫ টাকা। উওর বাড্ডা থেকে অটোরিকশাও পাওয়া যায়। ভাড়া নিবে ৬০/৭০ টাকা। আবার ঠিকানা ডে আউটার্স গুলশান থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাড্ডার বেরাইদ বালু নদীর পাড়ে দৃষ্টিনন্দন কাঠের বাড়িতে ঘুরতে যেতে পারেন সকাল ৬টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত।
থাকার ব্যবস্থা : ঠিকানা ডে আউটার্স’ এ থাকার জন্য রয়েছে গেস্ট হাউজ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলও এখানে রাত্রি যাপন করা যায় না। তবে আপনি চাইলে সারাদিন থাকতে পারবেন। এই গেস্ট হাউজে সারাদিন থাকার জন্য আপনাকে গুনতে হবে ৪০০০ টাকা। আর হ্যাঁ, গেস্ট হাউজে থাকার জন্য সময়কাল সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।
উল্লেখ্য, ঠিকানা ডে আউটার্স’ এ প্রবেশ বুকিং নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে ০১৭২৬-৬৬৬৬৬৩ নম্বরে কল করে যেতে পারবেন অথবা এস এম এস করেও বুকিং দেওয়া যাবে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের স্বপ্নের ঠিকানা গড়ে তুলেছেন তায়্যেবা আফরিন। তিনি জানান, করোনাকালীন সময়ে ঠিকানা নানা ধরনের শীতের ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকা। প্রতি মৌসুমেই বর্ণিল সব ফুল দিয়ে সাজানো হবে ঠিকানা।
এখানে রয়েছে ফুলে মোড়া কফি শপ। টিন-কাঠের তৈরি দোতলা ঘর। প্রথম দেখায় মনে হবে চীন-জাপানের কোনো বসতবাড়ি। কিন্তু না, রাজধানীর অদূরে বাড্ডার বেরাইদে গড়ে উঠেছে এমনই এক নান্দনিক কফি শপ। যেখানে ফুল, পাখিদের সঙ্গে ব্যস্ত নাগরিক জীবন খুঁজে ফিরে এক চলিতে প্রশান্তি। গ্রামীণ ঐতিহ্যের দোতলা টিনের ঘরটি ছেয়ে আছে পিটুনিয়া, ডায়ান্থাস, চন্দ্রমল্লিকায়। প্রকৃতির বাহারি রং আর কাঠ-টিনের নান্দনিক শৈলীতে গড়া ঠিকানা নামের ক্যাফেটোরিয়াটি।
দর্শনার্থীরা জানান, ঢাকার খুব কাছেই এতো সুন্দর একটি জায়গা। আমাদের একটা প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে নিয়ে আসে। এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে। এছাড়া করোনার মধ্যে তো খোলামেলা জায়গা বেছে নেই। তাই এই স্থানে আসা। তারা বলেন, এখানকার ঘর আর স্থানটাকে ফুল দিয়ে এতো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। এই পরিবেশটা বাচ্চা থেকে শুরু করে সব বয়সীদের কাছে খুব ভাল লাগছে। আসলে যিনি এটা করেছেন তিনি একটা রুচিশীলের পরিচয় দিয়েছেন। প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে কফি শপটিতে বাহারি ফুলের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে নিপুনভাবে। কাঠের সিঁড়ি, সাঁজঘর বা বেলকোনি সবকিছুই সাজানো রঙ্গিন ফুলে। বাইরের লন জেগে থাকে বর্নিল ফুলের কার্পেটে। সেখানে দর্শনার্থী ও পাখি খেলা করে একসঙ্গে।
ঢাকা থেকে এখানে আসতে বেশি সময় লাগে না। তাই যারা আসে তারা এসে দুপুরে খাবার খাই, বিকেলে ঘুরাফেরা করে, সন্ধায় নাস্তা করে চলে যান। ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় ঘুরতে আসা সকলেরই এই স্থানটি খুব পছন্দ করেন। মিষ্টি সকাল, অলস দুপুর বা দূরন্ত বিকেল পেরিয়ে গোধুলি বেলা পর্যন্ত বিশুদ্ধ বাতাসের আনাগোনা এখানে। বর্ণিল ফুলের সুবাসের সঙ্গে এসপ্রেসো বা ক্যাপাচিনোর গন্ধ মোহিত করে দর্শনার্থীদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ