শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানই পারে কঠিন বর্জ্যের উৎপাদন হ্রাস করতে

দীপিকা পাল পিউ : আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার বা ভোগ করার পর অব্যবহারযোগ্য যে আবর্জনা তৈরি হয় সেগুলিকে বর্জ্য পদার্থ বলে। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন- এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশ দূষণ ও অবনমন রোধের উদ্দেশে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলা হয়। সাধারণত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বর্জ্য বস্তুর উৎপাদন হ্রাস করা।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে বর্জ্য উৎপাদনের হার। বাংলাদেশে বর্জ্য সৃষ্টির পরিমাণ প্রতি বছরে প্রায় ২২.৪ মিলিয়ন টন অথবা মাথাপিছু ১৫০ কিলোগ্রাম। এভাবে যদি বর্জ্যের পরিমাণ বাড়তে থাকে তাহলে ২০২৫ সালের মধ্যে দৈনিক বর্জ্যের পরিমাণ হয়ে দাঁড়াবে ৪৭০৬৪ টন। যা আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে আমাদের বর্তমান অবস্থাও যে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূলে রয়েছে তাও নয়। কঠিন বর্জ্যের এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি পরবর্তীতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে একটি বিরাট সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বর্তমানে এই করনাকালীন সময়ে কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ যেন বেড়েই চলেছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডোর) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার একমাস পর উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় প্রায় তিন হাজার ৭৬ টন কঠিন বর্জ্য। যেখানে সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং স্যানিটাইজারের বোতল এই কঠিন বর্জ্যের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া ত্রাণ বিতরণে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগও ভূমিকা রেখেছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে পলিথিন ব্যাগের বর্জ্য পাঁচ হাজার ৭৯৬ টন, পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস তিন হাজার ৩৯ টন, সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাভস দুই হাজার ৮৩৮ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক এক হাজার ৫৯২ টন এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ৯০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেছে।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হচ্ছে এর উৎপাদন হ্রাস করা। এক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে কঠিন বর্জ্যের উৎপাদন হ্রাস করায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোতে  3R,4R,5R বিভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে 3R নীতি বহুল সমাদৃত ও আলোচিত। এই তিনটি R নীতি হলো - Reduce (কমানো), Recycling (পুনর্ব্যবহার), Reuse (পুনঃব্যবহার)। তবে 3R এর প্রচলন বাংলাদেশের এখনো তেমনভাবে শুরু হয়নি।
3R কৌশলকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হলে প্রথম শর্ত হচ্ছে, উৎপন্ন বর্জ্যগুলো সংগ্রহ করার উৎসমুখেই তার ভৌত, জৈব ও রাসায়নিক উপাদান অনুযায়ী পৃথক করে ফেলা। সচরাচর, তিনটি স্তরে এই পৃথকীকরণ সম্পন্ন করা হয়, যেমন : (১) বসতবাড়ির স্তরে (২) পৌর পরিচ্ছন্নতা কর্মী কর্তৃক সংগ্রহ ও পরিবহনকালীন স্তর এবং (৩) বর্জ্যের ভাগাড় স্তরের। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পৌর এলাকার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ৮০ শতাংশ বর্জ্যকে 3R কৌশলের মাধ্যমে হ্রাসকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে পুনঃব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব।
3R দ্রব্য গুলো খুব সহজেই আলাদা করে জমানো কিংবা বর্জ্য হিসাবে ফেলে দেয়া সম্ভব। এর জন্য প্রতিটি বাড়ির সামনে তিনটি ডাস্টবিন থাকবে। যার তিনটি রঙ হবে, যেমন হলুদ, লাল, নীল এবং গায়ে লেখা থাকবে – ক্যান, প্ল্যাস্টিক সামগ্রী, পেপার কিংবা অন্যান্য পচন বর্জ্য। তবে ঢাকা শহরে অধুনা কিছু কিছু এলাকায় ডাস্টবিনের এমন ব্যবহার  দেখা যাচ্ছে। তবে চোখে পড়েছে কেবল দুইটি ডাস্টবিন। একটি কালো রঙের অন্যটি সবুজ রঙের। বাড়িতে বসবাসরত মানুষরা নিজে থেকে এসেই ফেলে যাচ্ছেন বর্জ্যগুলো। যার থেকে খুব সহজেই সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য সংগ্রাহকরা আলাদা করেই তুলে নিতে পারছেন। তবে এর ব্যবহার এবং প্রয়োগ যথাযথভাবে হলে পরিবেশবান্ধব একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা যেত। যার থেকে শুধু পরিবেশ দূষণ-ই রক্ষা পেতো না সাথে সাথে 3R পদ্ধতির মাধ্যমে ভাল একটি মুনাফাও অর্জন করা সম্ভব হতো।
প্রতি বছর শুধু আমেরিকানরা ৫০ বিলিয়ন খাদ্য ও পানীয় ক্যান, ২৭ বিলিয়ন কাচের বোতল এবং বয়াম,  ৬৫ মিলিয়ন প্লাস্টিক এবং ধাতব বয়াম ফেলে দেয়। এই বর্জ্যের ৩০% হলো প্যাকেজিং এর উপকরণ। আমাদের দেশেও এই শতকরা হার প্রায় একই রকম।
প্রতিদিন যে পরিমাণ কঠিন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে, তাতে এই বর্জ্যের পরিমান হ্রাস করে পরিবেশের বিশুদ্ধতা রক্ষায় সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল 3R নীতি।
১) Reduce (হ্রাস করা)- রিডিউস বলতে অতিরিক্ত দ্রব্য ব্যবহার হ্রাস করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করাকে বোঝায়। ক্ষতিকর, অপচনশীল এবং পুনর্ব্যবহারে অযোগ্য দ্রব্যের ব্যবহার সর্বনিম্ন হারে কমিয়ে আনতে হবে এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করায় আগ্রহী হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পুনরায় ব্যবহার অযোগ্য দ্রব্য যেমন- কাগজের থালা, ন্যাপকিন, রেজর ইত্যাদির ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। এসবের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে কঠিন বর্জ্যের সৃষ্টি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে প্যাকেটজাত কিছু পণ্য আছে যা কিনতে গেলে পণ্যটি মোড়ক করার প্রয়োজন নেই। তারপরও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় করতে প্লাস্টিক কিংবা কাগজের মোড়ক ব্যবহার করা হয়, যা অপ্রয়োজনীয়। এই ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে।
একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে বর্জ্য কমানো যেতে পারে। অনেক সংবাদপত্র ও পত্রিকা এখন অনলাইনের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। এছাড়াও শুধুমাত্র প্রয়োজনে প্রিন্ট আউট করতে হবে এবং কাগজের উভয় পৃষ্ঠাই ব্যবহার করতে হবে।
“ওয়ান টাইম ইউজ” এই ধরনের দ্রব্য ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে এবং এর উৎপাদনও বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে -ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাস, বাটি ইত্যাদি এবং প্ল্যাস্টিক জাতীয় পণ্য ব্যবহার থেকে নিজেকে সংযত রাখা অতি আবশ্যক।
২) Reuse (পুনঃব্যবহার)-পুনঃব্যবহার বিষয়টি বলতে বোঝায় একই পণ্য একাধিক বার ব্যবহার করাকে। আমাদের গৃহস্থালী ও কর্মক্ষেত্রের অনেক পুরানো, ভাঙা, নোংরা, অপ্রয়োজনীয় জিনিস আছে যা আমরা কোনো প্রকার বিচার বিবেচনা না করেই ফেলে দেই। যা শুধু বর্জ্যের উৎপাদনই বৃদ্ধি করে না, পরিবেশের ও ক্ষতি করে থাকে।
বাজার করার জন্য একটি কাপড় কিংবা পাটের ব্যাগ সাথে নিয়ে গেলে দোকান থেকে প্লাস্টিক বা কাগজের ব্যাগের ব্যবহার কমে যাবে। আর এই বস্তা বা ব্যাগ পুনঃব্যবহারযোগ্য। যা কঠিন বর্জ্যের উৎপাদন হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
কফির ক্যান, জুতার বাক্স এবং প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার বা অন্য জিনিস সঞ্চয় বা চারু ও কারুশিল্প প্রকল্প করা যেতে পারে।
জামাকাপড়, খেলনা, আসবাবপত্র কিংবা অব্যবহারযোগ্য দ্রব্য ফেলে না দিয়ে বিক্রি করা বা অনুদান হিসাবেও দেয়া যেতে পারে।
একটি কাগজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে উভয়পার্শ্ব ব্যবহার করা, কোন উপহার সামগ্রী মোড়কের জন্য চকচকে কাগজ না কিনে বাসার পূরানো বইয়ের পাতা, ক্যালেন্ডার কিংবা পত্রিকা ইত্যাদি দিয়ে মোড়ক করলে নতুনত্ব তো আসবেই পাশাপাশি অর্থ সাশ্রয় হবে।
প্লাস্টিকের তৈরি প্লেট, চামচ, থালার পরিবর্তে এলুমিনিয়ামের পাত্র ব্যবহার করা, পলিথিন কাগজে খাবার সংরক্ষণ না করে প্ল্যাস্টিক পাত্রে খাদ্য সঞ্চয় করা। এছাড়া ঘরের পূরানো কাপড় দিয়ে খুব সুহজেই একটা সুন্দর মোরা বা সোফা বা চেয়ার তৈরি করা সম্ভব। কিংবা কোমল পানীয়ের বোতলের তলার অংশটি কেটে সুন্দর একটি ফুলের টব তৈরি করা যেতে পারে।
এই পুনঃব্যবহার পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। যা কঠিন বর্জ্য হ্রাসের সাথে সাথে অর্থসাশ্রয়ী ও বটে।
৩) Recycle (পুনঃব্যবহারের জন্য নতুন করে তৈরি করা)- রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার পদ্ধতি একটি ক্রমান্বয়িক ধাপ যেখানে কোনো ব্যবহৃত পণ্য পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে সম্পূর্ণ নতুন পণ্যে রূপান্তর করা হয়। এই পদ্ধতিতে কঠিন বর্জ্য হ্রাস করতে হলে আমাদের সেসব উপাদানের দ্রব্য ক্রয় করতে হবে, যা পরবর্তীতে রিসাইকেলের মাধ্যমে পুনরায় উৎপাদন করা সম্ভব হয়। যেমন - ধাতব পাত্র, কাঁচ, প্লাস্টিক ইত্যাদি।
দৈনিক অনেক জিনিসই ব্যবহার করা হয়, যেমন কাগজের ব্যাগ, ক্যান, এমন আরো অনেক জিনিস যা পুনর্ব্যবহৃত হতে পারে।
নতুন কোনো পণ্য কিনতে গেলে পুনঃব্যবহার করা যায় এবং যার থেকে নিজেই কিছু তৈরি করে ফেলা যায় এমন দ্রব্য ক্রয়ে আগ্রহী হতে হবে।
একটি নষ্ট হয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক বাল্বের ভিতরে মোম ঢুকিয়ে সহজেই একটি পেপার ওয়েট তৈরি করা যায়। ঘরে বসেই কোনো যন্ত্র কিংবা বাড়তি ঝামেলা ছাড়া গলে যাওয়া মোমগুলিকে এক করে গলিয়ে সুন্দর পুতুল, খেলনা, শো পিস তৈরি করা সম্ভব। কিংবা চাইলে নিজেই আবার মোমবাতি তৈরি করা সম্ভব যার জন্য সঠিক জ্ঞান  প্রয়োজন।
সর্বোপরি, কঠিন বর্জ্যের হ্রাস করায় সবাইকে অগ্রসর হতে হবে। কারো পক্ষে একা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব না। আমাদের দায়িত্বশীলতা এবং সচেতনতাই পারে এই কঠিন বর্জ্যের এই চলমান বৃদ্ধি হ্রাস করতে। এছাড়া আজকের শিশু দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে এবং এ শিক্ষা দিতে হবে পরিবার থেকেই। পরিবার থেকে যেখানে সেখানে বর্জ্য না ফেলার শিক্ষা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন হতে সাহায্য করবে। তাছাড়া পাঠ্যপুস্তকে  বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্দিষ্ট অধ্যায় সংযুক্ত করলে এবং গণমাধ্যমে যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনামূলক অনুষ্ঠান প্রচারসহ কার্যকর বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে শিশুসহ আমাদের সকলকে সচেতন করে তুলতে হবে। আর এভাবেই নিরাপদ, সুস্থ-সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন হ্রাস করায় অংশ নিতে হবে ব্যক্তি থেকে বৃহত্তর পর্যায়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ