রবিবার ২৮ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

চট্টগ্রামে নষ্ট হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ কুরবানির পশুর চামড়া

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে কুরবানির পশুর অর্ধেক চামড়া নষ্ট হয়েছে। ৬ লাখ ৮০ হাজার পশু কুরবানি হলেও তার বিপরীতে চামড়া সংরক্ষণ হয়েছে সোয়া ৩ লাখ। এতে আরও প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কুরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হয়েছে। কুরবানিদাতাদের চামড়া বিক্রির টাকা পেয়ে থাকেন সমাজের অসচ্ছল মানুষ। এতে দেশীয় সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশপাশি অসচ্ছল মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কারসাজিতে চামড়ার দাম কমেছে। এখানে চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা থেকে ২৫০টাকায়। ফলে অনেকে চামড়া বিক্রি না করে ফেলে দিয়েছে। অনেকে মাটিতে পুঁতে ফেলেছে। মৌসুমী চামড়া ব্যসায়ীরা ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকায় চামড়া কিনে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেছে অর্ধেক দামে।
মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, আজ থেকে পাঁচ বছর আগে গরুর চামড়া দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ২০১৮ সালের পর থেকে চামড়ার দর নিচের দিকে নামতে থাকে। ২০১৮ সালে ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে চামড়া। ২০১৯ সালে চামড়া বিক্রি হয়েছে ৪শ’ টাকায়। গত বছর ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা দিয়ে চামড়া কিনে মারাত্মক লোকসানে পড়তে হয়েছিল। এবার কেনা পড়েছে চারশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকা। অন্যদিকে আড়তদাররা চামড়ার সাইজ অনুসারে দাম দিয়েছে মাত্র ১শ’ থেকে সর্বোচ্চ আড়াইশ’ টাকা।
চামড়ার আড়তদাররা জানিয়েছে, এবছর কুরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৩ লাখ। তার বিপরীতে সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ। হিসাব অনুযায়ী এবছর চামড়া সংগ্রহ অর্জিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দেড় লাখ কম হয়েছে। গত দু’বছর সাড়ে ৫ লাখ করে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ২০২০ সালে ৪ লাখ ও ২০১৯ সালে সাড়ে ৩ লাখ কুরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাদের দাবি, গ্রামগঞ্জে আরও প্রায় সোয়া এক লাখ চামড়া লবণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা চামড়াগুলো আড়তে পৌঁছালে আড়তদারদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।
চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সেতু ভূষণ দাশ  জানান, চট্টগ্রামে এবার ৬ লাখ ৮০ হাজার ৩৭৮টি পশু কুরাবানির প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন তারা। এর মধ্যে মহানগরীতে কুরবানি হয়েছে ২ লাখের মতো। গতবছর চট্টগ্রামে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার পশু কুরবানির তথ্য পেয়েছিলেন তারা। প্রশ্ন উঠেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী এবছর চট্টগ্রামে পশু কুরবানির পরিমাণ ছয় লাখের বেশি। আর চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ সোয়া ৩ লাখ। তাহলে বাকি চামড়া গেল কোথায়?
এ প্রসঙ্গে ডা. সেতু ভূষণ দাশ বলেন, ৬ লাখ কুরবানি হলে ৬ লাখ চামড়া সংগ্রহ হওয়ার কথা। অর্ধেক চামড়া সংগ্রহ হলে বাকি অর্ধেক নিশ্চয় নষ্ট হয়েছে। আমরা দেখেছি, চট্টগ্রামে নাকি মাত্র ২০০-২৫০ টাকায় চামড়া কেনা হয়েছে। ছাগলের চামড়া ফ্রি দেয়া হয়েছে। টেলিভিশনে দেখেছি, অনেকে সেই দামে চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। অনেকে ফেলে দিয়েছেন। এভাবে হয়ত কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে।
চামড়া সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন সংক্রান্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সদস্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, চট্টগ্রামে সব মিলিয়ে প্রায় সোয়া ৩ লাখের মতো চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। শনিবার এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে বলা যাবে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আড়তদারেরা ট্যানারি মালিকদের দোষারোপ করেন আর ট্যানারি মালিকরা করেন আড়তদারদের। আসলে এটা অভিনয়। তারা একই সিন্ডিকেটের। তারা দরপতন ঘটিয়ে মৌসুমি সংগ্রহকারীদের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এজন্য এবার মৌসুমি সংগ্রহকারীরা সেভাবে চামড়া সংগ্রহ করেননি। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকদের নির্দেশে আড়তদারেরা তাদের লোকজনের মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এতে সব চামড়া সংগ্রহ করা যায়নি। অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। ট্যানারি মালিকরা তো দেশের বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি। দেশ তাদের কাছে জিম্মি।
আড়তদারদের নিয়ে তাদের কারসাজির কারণে দেশ বড় ধরনের রফতানির সুযোগ হারাল। কারণ যে চামড়া সংগ্রহ হয়েছে, তার চাহিদা দেশের বাজারেই আছে। সেখান থেকে সামান্য হয়ত রফতানি হতে পারে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে ১১২ জন কাঁচা চামড়ার আড়তদার রয়েছে। এখানে ছোট-বড় ২২৫টি আড়তে চামড়া সংরক্ষণ হয়। একসময় ১৫-২০টি ট্যানারি থাকলেও এখন আছে একটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ