বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৪১ প্রাণ

স্টাফ রিপোর্টার : ঈদুল আযহার ছুটিতে পাঁচ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়কে ঝরেছে  অন্তত ৪১ প্রাণ। এর মধ্যে বাগেরহাটে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় সাত, মুন্সিগঞ্জে তিন, রাজবাড়ীতে তিন, রংপুরে চার, মুজিবনগরে তিন,  চকরিয়ায় দুই, বরিশালে দুই ও পটুয়াখালীতে দুইজন নিহত হয়। এছাড়াও নেত্রকোনা, ফরিদপুর, কুমিল্লা. দাউদকান্দি, শেরপুর, সীতাকুন্ডু ও শ্রীপুরে একজন করে নিহত হয়েছেন। ঈদ যাত্রার শুরুতে ১৯ জুলাই থেকে গতকাল ২৩ জুলাই পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। কারোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এ বছর ঈদের ছুটির পরই সারাদেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এরপরও হাজার হাজার মানুষ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে গেছেন। যাওয়া আসার সময় সড়ক পথে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
বাগেরহাটে ৭ : বাগেরহাটে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল ও বৃহস্পতিবার রাতে জেলার ফকিরহাট ও মোল্লাহাট উপজেলায় এ পৃথক দুর্ঘটনা ঘটে। গতকাল বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ছয়জন। এর মধ্যে তিনজনের পরিচয় মিলেছে। এরা হল- রামপাল উপজেলার চাকশ্রী বাজার এলাকার আবদুল হাই (৫৫), ফকিরহাটের নলদা মৌভোগ এলাকার উৎপল রাহা (৪২) ও একই এলাকার নয়ন দত্ত (২৫)। অপর তিনজনের নাম এখনো জানা যায়নি। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকাল সাতটার দিকে মহাসড়কের বৈলতলী এলাকায় একটি মিনিট্রাক ও ইজিবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকের ছয়জন নিহত হন। ইজিবাইকটিতে যাত্রী, চালকসহ মোট সাত আরোহী ছিলেন। একজনকে আহত অবস্থায় ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। আহত ব্যক্তির নাম নূর মোহাম্মদ। তার বাড়ি ফকিরহাট উপজেলার নলদা এলাকায়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বাগেরহাট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক গোলাম সরোয়ার বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে একজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে এলাকাবাসী হাসপাতালে পাঠান। দুর্ঘটনার পর মিনিট্রাকের চালক ওসমান গনিকে (২০) আটক করেছে ফকিরহাট থানাপুলিশ। তার বাড়ি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থানার রঘুনাথপুর গ্রামে। ওসমান গনি সাতক্ষীরা থেকে পানের বরজের ১০ শ্রমিক নিয়ে মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে ওই যাত্রী নামিয়ে ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ফকিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম খায়রুল আনাম বলেন, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকটি যাত্রী নিয়ে মহাসড়কের নওয়াপাড়া থেকে ফকিরহাটের দিকে যাচ্ছিল। পথে বৈলতলী এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা মিনিট্রাকটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইজিবাইকটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই এর ছয় আরোহী নিহত হন। অপরদিকে, একই সড়কের মোল্লাহাট উপজেলার চাঁদেরহাটে রাস্তার পাশ থেকে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কোনো যানবাহনের ধাক্কায় অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই পথচারী নিহত হন। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনার চিহ্ন রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জে নিহত ৩ : মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে পড়ে ৩ জন নিহত হয়েছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আলীপুরা এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- প্রাইভেটকারের চালক মো. নয়ন মিয়া (৪৫), নেত্রকোনা জেলার মেদীর কান্দা থানার কলমাকান্দা গ্রামের হেকিম মিয়ার ছেলে। গাড়ির যাত্রী জারা আক্তার (১৭), ঢাকা বংশাল নাজিমউদ্দীন রোড এলাকার আবু জাফরের মেয়ে এবং লিজা আক্তার স্বর্না (১৯), ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার মাস্টার পাড়া এলাকার মৃত লিটন মিয়ার মেয়ে।
গজারিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অফিসার রিফাত মল্লিক জানান, একটি প্রাইভেটকার আলীপুরা নামক এলাকা অতিক্রম করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলে ৩ জন নিহত হয়। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িসহ নিহতদের উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গাড়িটি পানির উপর উল্টে পড়ে ছিল যার ফলে গাড়িতে থাকা কেউ গাড়ি থেকে বের হতে পারেনি। তবে লাশগুলি উদ্ধারকালে মনে হয়েছে, তারা গাড়ি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেও পানির মধ্যে গাড়ির ডালা খুলে বের হতে পারেননি। নিহতদের লাশ গজারিয়া থানার মাধ্যমে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাকিব জানান, কুমিলা থেকে ঢাকাগামী প্রাইভেটকারটি মহাসড়কের আলীপুরা এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। ভোরে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে আমরা সকাল ৮টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পাই। পরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে আসলে নিহত তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্বজনরা এলে লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
মুজিবনগরে নিহত ৩ : ঈদের দিন বুধবার মোটরসাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের শাকিল ও তার বন্ধু শামীম। মুজিবনগর কমপ্লেক্সে যাওয়ার পথে মানিকনগর গ্রামে তাদের মোটরসাইকেলের সঙ্গে একটি ভটভটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে শাকিল, শামীমসহ মুস্তাকিম নামের আরও একজন নিহত হন। বেলা দুইটার দিকে মেহেরপুরের মুজিবনগরের মানিকনগর গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত তিনজন হলেন মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর মাঠপাড়ার বাসিন্দা শরিফুল ইসলামের ছেলে শাকিল হোসেন (১৮), একই গ্রামের মিনারুল ইসলামের ছেলে শামীম হোসেন (২০) ও গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের মুস্তাকিম হোসেন (২৫)। এ ঘটনায় আহত উমর ফারুক (২৯) ও রাকিবুল ইসলাম (২৩) মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কটি ঈদের জামাতের পরপরই সরব হতে শুরু করে। দীর্ঘ বিধিনিষেধের কারণে মানুষ বেরোতে পারেনি। হঠাৎ করেই মুজিবনগর সড়কে মোটরসাইকেল চলাচল বেড়ে যায়। দুপুরের দিকে একটি মোটরসাইকেল উপজেলার বাগোয়ান সড়ক থেকে মুজিবনগর সড়কে দ্রুতগতিতে ওঠে আসে। এ সময় মুজিবনগর কমপ্লেক্স থেকে ছেড়ে আসা একটি ভটভটির সঙ্গে এর মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। পরে আরও একটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল সেখানে এলে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় সোনাপুর গ্রামের দুই বন্ধু শাকিল ও শামীম ঘটনাস্থলে মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুস্তাকিম মারা যান। মুজিবনগর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হাসেম জানান, মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়ক দিয়ে দুটি মোটরসাইকেল ও একটি নছিমনের ত্রিমুখী সংঘর্ষে এই হতাহত হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ রয়েছে। লাশ ও তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
চকরিয়ায় বাসের ধাক্কায় জিপ খাদে ॥ নিহত ২: কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ঝনঝইন্যা সেতু নামক এলাকায় বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে যাত্রাবাহী বাসের ধাক্কায় একটি জিপ গাড়ি (চান্দের গাড়ি) খাদে পড়ে দুজন নিহত হয়। একই সঙ্গে আরও ১৪ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহত ব্যক্তিরা হলেন চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল স্টেশন এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ আলমের স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৩২) ও বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মিয়াজি বাপের পাড়া গ্রামের তালেব আলীর ছেলে আলী হোসেন (১৩)। আলী হোসেন জিপ গাড়িটির চালকের সহকারী।
পটুয়াখালীতে নিহত ২ : ঈদ শেষে মাকে নিয়ে নানাবাড়ি যাওয়ার পথে মাইক্রোবাস উল্টে খাদায় পড়ে নিহত হন ইমরুল করিব সিকদার (২১) ও মাইক্রোবাসচালক মাহাবুব হাওলাদার (২৮)। বৃহস্পতিবার বিকেলে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের শরীফ বাড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ইমরুলের মা লাইজু বেগম (৩৫) আহত হয়েছেন। ইমরুল ঢাকার উত্তরায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মানের ছাত্র। তিনি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখারী ইউনিয়নের লোন্দা গ্রামের রেজাউল কবির সিকদারের ছেলে। নিহত মাহাবুর কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নীলগঞ্জ গ্রামের দেলোয়ার হাওলাদারের ছেলে।
ফেনীতে চালক ও সহকারী নিহত : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীতে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পিকআপ ভ্যানের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন। বুধবার রাতে ফেনী সদর উপজেলার মহিপালের কাছের একটি এলাকায় এ দুর্ঘটনায় তারা আহত হন। বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান। মারা যাওয়া দুজন হলেন পিকআপ ভ্যানের চালক মো. পলাশ (২২) ও তার সহকারী মো. আরিফ (১৫)। তারা ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার বাসিন্দা। তাদের লাশ অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় শেখ সৈকত (১৯) নামের এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। ঈদের দিন বুধবার রাত ১০টার দিকে শ্যামনগর গোলাঘাটা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এছাড়া কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঢাকাগামী বাসের চাপায় কমলা বেগম (৬৪) নামের এক নারী নিহত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বাসটি তিশা পরিবহনের। কমলা বেগম ইছাপুর গ্রামের আবদুর রশিদ শিকদারের স্ত্রী। বৃহস্পতিবার সকাল আটটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। চালক পালিয়ে গেলেও বাসটি জব্দ করেছে দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার পুলিশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ