বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনে মানুষের চরম ভোগান্তি

স্টাফ রিপোর্টার : কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে মানুষকে। যারা জরুরি প্রয়োজনে ঢাকার উদ্দেশে কিংবা কর্মস্থলে এসেছেন তাদের অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আবার যারা অযথায় বাসা থেকে বের হয়েছেন তাদের কেউ গ্রেফতার হয়েছেন আবার কেউ জরিমানা দিয়ে মুক্তি পেয়েছেন।
ঈদের ছুটি শেষে শুরু হওয়া লকডাউনের প্রথম দিন শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে বন্ধ ছিল বাসসহ বড় ধরনের গণপরিবহন। রিকশা চলাচলও কম। এতে আগের রাতে রওনা হয়ে সকালে রাজধানীতে পৌঁছানো লোকজন পড়েন বিপাকে। গাড়ি না পেয়ে মাথায়, হাতে ব্যাগ নিয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছে তাদের। এদিন ভোরে সদরঘাটে লঞ্চ থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন হাজারো মানুষ। সড়কে যানবাহন না থাকায় চরম বিপাকে পড়েন তারা। শিশুসন্তান, নারী, বয়স্কদের নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে বাসার দিকে যান অনেকে। কেউ আবার অ্যাম্বুলেন্সে করে, ভ্যান, পিকভ্যানে রওনা হন গন্তব্যে।
ঈদের ছুটি শেষে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শুক্রবার থেকেই দেশজুড়ে আবার দুই সপ্তাহের লকডাউন শুরু হয়েছে। মানুষের অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে এবারের বিধিনিষেধ ‘সবচেয়ে কঠোর’ হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি জানান, শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত চলমান থাকবে এই কঠোর অবস্থা। এ বিষয়ে ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের প্রজ্ঞাপনেই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। সবচেয়ে কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনে সদরঘাট থেকে গুলিস্তান সড়কে হাজার হাজার মানুষের ভিড় দেখা যায়।
রামপুরা-বাড্ডা সড়কেও হেঁটে অনেক মানুষকে বাসায় ফিরতে দেখা যায়। রামপুরা পুলিশের চেকপোস্টে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পটুয়াখালী থেকে লঞ্চে করে সদরঘাট এসে নেমে মগবাজার পর্যন্ত আসতে খোদেজা খাতুনের ৪শ’ টাকা গুণতে হয়েছে। ভোলা থেকে লঞ্চে করে সকালে সদরঘাট নামেন আমজাদ আলী। শিশুসহ পরিবার নিয়ে যাবেন গাজীপুর। সন্তান কোলে নিয়ে হাঁটা শুরু করেন তিনি।
আমজাদ জানান, সকালে সদরঘাট পৌঁছেন। ঢাকা এসে খুব বিপদে পড়েছেন। বাসা গাজীপুর। গাড়ি পাচ্ছেন না। তাই হেঁটেই গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। ঢাকায় ফিরে গাড়ি না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের একজন ফারুক হোসেন বলেন, ‘সদরঘাট থেকে এসেছি। আমার বাড়ি ভোলা। আমার কথা হচ্ছে দেশের প্রয়োজনে লকডাউন দিচ্ছে সরকার। নিশ্চয়ই এটা আমাদের ভালোর জন্য। আসলে সিস্টেমটা হওয়া উচিত ছিল পজিটিভলি।
‘আমার অফিস খোলা। কোম্পানি আমাকে ছুটি দিচ্ছে না। চাকরি চলে যাবে আমি যদি ঢাকায় না আসি। আমাকে তো অফিসে আসতেই হবে। যদি সাধারণ সিটি থেকে সবকিছু বন্ধ করে দিত তাহলে আমরা আসতে পারতাম না।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মন্ত্রী-এমপিরা তো আরামে আছেন। আমরা যারা খেটে খাওয়া মানুষ, আমরা আছি বিপাকে। আমরা তো কেউ ঢাকায় পিকনিক করতে আসি নাই। যা করবে একটা নিয়মের মধ্যে রেখে করা উচিত।’ রাজধানীতে সকাল থেকে রিকশা চলতে দেখা যায়। অনেকে দাবি করেছেন, রিকশা ভাড়া বেশি নিচ্ছেন চালকরা।
রামিজ উদ্দিন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমার বাসা মোহাম্মদপুর। অফিস ফার্মগেট। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ফার্মগেট রিকশা ভাড়া সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ টাকা। কিন্তু ভাড়া চাচ্ছেন দেড়শ’ টাকা। গণপরিবহন না থাকার কারণে তারা তাদের মনমতো ভাড়া চাচ্ছেন। কারণ মানুষ তাদের কাছে জিম্মি। সেটা তারা বুঝে গেছেন।’
ঈদের আগে শাটডাউন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কঠোর লকডাউনে রাজধানীর মোড়ে মোড়ে দেখা গেছে পুলিশের চেকপোস্ট। তবে ঈদ পরবর্তী লকডাউনের প্রথম দিনে তেমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। যেসব জায়গায় চেকপোস্ট ছিল সেগুলোতে গাড়িগুলো চেক করা হয়।
রাজধানীর গুলিস্তান ফ্লাইওভারের নিচে চেকপোস্টের ট্রাফিক সার্জেন্ট আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আমরা সকাল থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। লকডাউন বাস্তবায়নে যে সকল স্টেপ নেয়া দরকার, সেই স্টেপ অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা আছে, আজ সকাল ৬টা থেকে লকডাউন বাস্তবায়ন হবে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যানবাহন বন্ধ আছে। যার যার ব্যক্তিগত উপায়েই যেতে হবে। এ ছাড়া কোনো ওয়ে নাই।
এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ নিশ্চিতে প্রথম দিনে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বাইরে বের হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হাতে গ্রেফতার হন ৪০৩ জন। এ সময় ২০৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ২৭০ টাকা। এছাড়া ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক ৪৪১টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলায় জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।
পবিত্র ঈদুল আজহার পর শুক্রবার দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিনে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয় ডিএমপির ৮টি বিভাগ। এসব তথ্য জানান ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইফতেখায়রুল ইসলাম।
তিনি বলেন, লকডাউনের প্রথম দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিএমপির ৮টি বিভাগের রমনা, লালবাগ, মতিঝিল, ওয়ারী, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা এলাকায় সরকারি নিয়ম অমান্য করে বাইরে বের হওয়ায় ৪০৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লকডাউনে সড়কে যানবাহন নিয়ে বের হওয়ায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাফিক বিভাগ ৪০৩টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলায় জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, সরকার করোনার সংক্রমণরোধে দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ নিশ্চিতে প্রথম দিনে রাজধানীজুড়েই সক্রিয় ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীতে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে অকারণে ও নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হওয়ায় ও লকডাউনেও প্রতিষ্ঠান খোলা রাখায় ২০৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ২৭ হাজার ২৭০ টাকা জরিমানা করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ