রবিবার ২৮ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

পথে পথে দুর্ভোগের ভারে ঈদের আনন্দ ফিকে

ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকা ফেরত মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। ছবিটি গতকাল শুক্রবার গাবতলী এলাকা থেকে তোলা -সংগ্রাম

* গণপরিবহনে চারগুণ বেশি ভাড়া আদায়
* সদরঘাট-আমিনবাজার-কাঁচপুর থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকায় প্রবেশ
* ১ দিনে ঢাকায় এসেছে ৮ লাখ ২০ হাজার মানুষ
স্টাফ রিপোর্টার : কঠোর লকডাউন আর শিথিল না হওয়ায় ঈদের পরের দিনই রাজধানী ফেরা শুরু করে মানুষ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গতকাল শুক্রবারও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীতে মানুষ আসছে। ফেরার পথে মানুষ পড়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে। পরিবহন সংকটের সুযোগে কোন কোন স্থানে আদায় করা হয়েছে ৩/৪ গুণ বেশি ভাড়া। বেশি বিপাকে পড়েছে গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীতে প্রবেশ করা মানুষ। বৃহস্পতিবার রাতে পথে আটকা পড়ার কারণে গাড়ীগুলো সময়মতো রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারেনি। অনেক যাত্রী ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর, সাভারের আমিন বাজারে আটকাপড়া বেশিরভাগ যাত্রী পায়ে হেঁটে ঢাকায় প্রবেশ করে। একই সাথে সদরঘাটের লঞ্চ যাত্রীরা পায়ে হেঁটে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। ঈদের আনন্দ দুর্ভোগের চাপে ফিকে হয়ে যায় অনেকের কাছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদ শেষে কঠোর বিধিনিষেধেও ফিরছে মানুষ। যে যেভাবে পারছেন রওনা দিয়েছেন ঢাকার উদ্দেশে। শুক্রবার ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ভোর থেকেই অধিক ভাড়ায় যাত্রীবাহী বাস থেকে শুরু করে ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা গেছে।
মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্বপাড়, এলেঙ্গা, রাবনা বাইপাস, টাঙ্গাইল বাইপাস, গোড়াই, মির্জাপুরসহ বিভিন্ন বাসটার্মিনালে ঢাকামুখী যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়ও দেখা গেছে। কোথাও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি।
দিনাজপুরের সদর থেকে বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে পরিবার নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন সোহেল হোসেন। ভোরের দিকে বঙ্গবন্ধু সেতু এসে যানজটে পড়েন। তাদের বহনকারী বাস সেতু পার হতেই সকাল হয়ে যায়।
পরে সকাল ৯টার পর মহাসড়কে পুলিশের টহল শুরু হলে সোহেল হোসেনদের বহনকারী বাস আটকে দেন তারা। এদিকে বিধিনিষেধ থাকায় রিকশার সংখ্যাও হাতেগোনা। অগত্যা স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে এলেঙ্গা থেকে পায়ে হেঁটে পরে রিকশায় করে ঢাকার শ্যামলী পর্যন্ত এসেছেন। পথে তাদের বেশ কয়েক জায়গায় পুলিশ চেকপোস্টের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি  বলেন, শুক্রবার থেকে ১৪ দিনের লকডাউন। কিন্তু ঢাকায় ফিরতেই হবে। তিনি কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। যেটি লকডাউনেও খোলা রয়েছে। তাই ঈদের পরদিনই তাকে তড়িঘড়ি করে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে।
কেবল সোহেল হোসেন নয় রাজধানীর রাজপথ ধরে গন্তব্যের উদ্দেশে দীর্ঘ সময়ব্যাপী হাঁটতে থাকা তার মতো হাজার হাজার যাত্রী বেকায়দায় পড়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কে সড়কে নারী-পুরুষ এমনকি শিশুরাও ভারি ব্যাগ ও বোঝা মাথায় কিংবা কাঁধে নিয়ে বাসার উদ্দেশে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে চলছেন। কোথাও কোথাও পুলিশ-সেনাবাহিনী-বিজিবির কাছে কৈফিয়তও দিতে হচ্ছে তাদের।
শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানীতে বন্ধ গণপরিবহন, সিএনজিচালিত অটোরিকশাও। রিকশার সংখ্যাও ছিল হাতেগোনা। অকারণে, অবাধে ঢাকায় প্রবেশ ঠেকাতে ঢাকা জেলার গাবতলী, ধানমন্ডি, পোস্তগোলা, জুরাইন, যাত্রাবাড়ি, গুলিস্তান, রমনা, শাহবাগসহ পুরো রাজধানীর প্রবেশ পথগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা বলছেন, রাতে যে সমস্ত বাস উত্তরাঞ্চল থেকে ছেড়ে আসছিলো সেই বাসগুলো গন্তব্যে যেতে সকাল হয়ে গেছে। তবে এখন কোনো বাস আসলে তা ফেরত দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও মামলা দেয়া হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে দেখা যায়, রাজধানীর প্রবেশ পথ আমিনবাজার ব্রিজে চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। যে কারণে দূরপাল্লার সব যাত্রীদের আমিনবাজারে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় হেঁটে, রিকশা ও ভ্যানে রাজধানীতে প্রবেশ করছেন যাত্রী।
ট্রাফিক বিভাগ পুলিশ জানিয়েছে, দূরপাল্লার কোনো পরিবহনকে রাজধানীতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ব্যক্তিগত গাড়িতে যারা গতকাল রাতে রওনা করেছেন, সেতুর টোল বক্সের টোকেন দেখে তাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায় কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল মোড়, গাবতলী, মাজার রোড এবং পর্বত এলাকায় যাত্রীরা পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। তাদের কারো হাতে ব্যাগ, আবার কারো কোলে শিশু বাচ্চা। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় আমিনবাজার থেকে তাদের হেঁটেই ফিরতে হচ্ছে।
আমিন বাজার ব্রিজে কথা হয় ঠাকুরগাঁও থেকে আসা শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে গিয়েছিলাম। লকডাউনে আটকা না পড়তে বৃহস্পতিবার  সন্ধ্যায় রওয়ানা দিয়েছিলাম। যানজটের কারণে বাস ঢাকায় ঢুকে সকাল ৯টায়। আমিনবাজার ব্রিজে আসলে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এখন হেঁটেই ফিরতে হচ্ছে মোহাম্মদপুরের বাসায়।
ট্রাফিক বিভাগের চেকপোস্টের কারণে আমিনবাজারে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট তৌহিদ বলেন, যারা বিধিনিষেধ শুরুর আগে রওয়ানা দিয়েও ঢাকা ঢুকতে পারেননি, শুধু তাদেরই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তবে পায়ে হেঁটে। লকডাউনের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো গণপরিবহনকে যাত্রীসহ ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
মিরপুর, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুরেও দেখা যায় একই দৃশ্য। টেকনিক্যাল মোড়ে কথা হয় ভ্যান যাত্রী সবুজের সঙ্গে। তিনি বলেন, পরিবারসহ ফরিদপুর থেকে ঢাকা এসেছি। আমিনবাজার ব্রিজে নামিয়ে দেওয়ায় হেঁটেই টেকনিক্যাল পর্যন্ত এসেছি। এরপর আড়াইশ টাকায় পীড়েরবাগের বাসার উদ্দেশে যাচ্ছি।
বিধিনিষেধ শুরুর পর আজ সকালে যারা নৌপথে সদরঘাট পৌঁছেছেন, তারা পড়েছেন বিপাকে। যানবাহন বন্ধ থাকায় সদরঘাট থেকে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে ফিরছেন।
শুক্রবার রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, মৎস্য ভবন মোড়, শাহবাগ, সাইন্সল্যাব মোড় ঘুরে দেখা যায়, শত শত মানুষ হেঁটে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছেন। তারা সবাই সদরঘাট থেকে আসছেন। কয়েকজনকে রিকশা বা ভ্যানযোগেও আসতে দেখা গেছে। অনেকে ব্যাগ মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। কঠোর বিধিনিষেধে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
প্রসঙ্গত, আট দিন শিথিল থাকার পর ২৩ জুলাই শুক্রবার থেকে কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়েছে। ১৪দিনের এই লকডাউন চলবে ৪ আগস্ট পর্যন্ত। এর আগে ঈদুল আযহার সময় মানুষের চলাচল ও পশুরহাটে কেনাবেচার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত লকডাউন শিথিল করেছিল সরকার।
ঈদুল আযহার ছুটি শেষে  সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়েছে সরকারের পূর্বঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে মাঠে কাজ করছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
 এদিকে ঈদুল আযহার পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার  আট লাখ ২০ হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেছেন। আর ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত এক কোটি চার লাখ ৯৪ হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন।
ঢাকায় প্রবেশ করা এবং ঢাকা থেকে বের হওয়া মোবাইল ফোনের সিমের হিসাব দিয়ে শুক্রবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমনটি জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।
মন্ত্রী একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে সেখানে লেখেন, ‘একটু আগে ঢাকা থেকে যাওয়া ও আসা সিমের হিসাব পেলাম।’
চারটি অপারেটর গ্রামীণ ফোন লিমিটেড, রবি অ্যাজিয়াটা লিমিটেড, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস ও টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিমের ওপর ভিত্তি করে পরিসংখ্যানটি তৈরি।
এতে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত গ্রামীণ ফোন লিমিটেডের মোট ৪৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৪ জন গ্রাহক ঢাকা ছেড়েছেন। একই সময়ে রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের যথাক্রমে ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৭, ২৭ লাখ ৪৫ হাজার ৮৭৮ ও  চার লাখ ৩০ হাজার ৬১৪ জন গ্রাহক ঢাকার বাইরে গেছেন। মোট হিসাব করলে গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়ায় এক কোটি চার লাখ ৯৪ হাজার ৬৮৩ জন।  
২২ জুলাই গ্রামীণ ফোন লিমিটেড, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের যথাক্রমে দুই লাখ ২৪ হাজার ৭০৯, তিন লাখ আট হাজার ৪৯১, দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৫২ ও ৩৯ হাজার ১৬৪ জন গ্রাহক ঢাকায় প্রবেশ করেছেন। মোট হিসাব করলে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় আট লাখ ২০ হাজার ৫১৬ জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ