বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

পবিত্র ঈদুল আযহা

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা:

পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় দুটো ধর্মীয় উৎসবের একটি। ‘ঈদুল আযহা’ আরবি বাক্যাংশ। অর্থ হলো ‘ত্যাগের উৎসব’। এ দিনটিতে মুসলমানেরা পর ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকাত ঈদুল আযহার নামায আদায় করে ও তারপরেই স্ব-স্ব আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য পশু কুরবানি করেন।

আমাদের উপর যে কুরবানির আবশ্যকতা আরোপিত হয়েছে, তা মূলত মহান আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে হযরত ইব্রাহীম (আ.) কর্তৃক শিশু পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে কুরবানি দেয়ার অনুসরণে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও  হযরত ইসমাঈল (আ.) আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বংশপরম্পরায় তারই স্মৃতি হচ্ছে ‘ঈদুল আযহা’। বিশ^ মুসলিম প্রতি বছর ১০ জিলহজ্ব এটি পালন করে।

প্রচলিত অর্থে ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ তরীকায় যে পশু যবহে করা হয়, তাকে ‘কুরবানি’ বলা হয়’। সকালে রক্তিম সূর্য ওঠার সময়ে ‘কুরবানি’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়।

ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল পবিত্র ঈদুল আযহা। পবিত্র কুরআন-হাদীসে দিবসটির কল্যাণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর কুরবানি পশুসমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে’ (হজ্ব ৩৬)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,  ‘আর আমরা তাঁর (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবহে করার জন্য দিলাম একটি মহান কুরবানি। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’ (ছাফফাত ১০৭-১০৮)। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় কর এবং কুরবানি কর’ (কাওছার ২)।

প্রত্যেক সামর্থ্যবান ও সাহেবে নেসাবের জন্য ঈদুল আযহা উপলক্ষে পশু কুরবানি করা ওয়াজিব। হাদিসে রাসূল (সা.) এ বলা হয়েছে, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়’। এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’ যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীম’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে মদীনায় প্রতি বছর এবং রাসূল (সা.)এর আসহাবগণ নিয়মিতভাবে কুরবানি করেছেন এবং সে ধারাবাহিকতায় মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে। বিষয়টি কুরআন- সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা সুপ্রমাণিত।

বস্তুত, ঈদুল আযহা হযরত ইব্রাহীম (আ.), তদীয় স্ত্রী হযরত বিবি হাজেরা ও পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) এর পরম ত্যাগের স্মৃতি বিজড়িত। হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে আল-কুরআনে মুসলিম জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে (হজ্ব ৭৮)। তাই ঈদুল আযহার দিন সমগ্র মুসলিম জাতি হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ত্যাগ-কুরবানির অনুসরণে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। কুরবানির স্মৃতিবাহী জিলহজ্ব মাসে হজ্ব উপলক্ষে সমগ্র পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলমান সমবেত হয় ইবরাহীম (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কা-মদীনায়। তাঁরা হযরত ইব্রাহীম (আ.) ত্যাগের মহিমায় অনুপ্রাণিত হয়ে হজ্বব্রত পালন করেন। হজ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ। যা প্রতি বছরই আমাদেরকে তাওহীদী প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। আর কুরবানি হ’ল আত্মশুদ্ধি এবং পবিত্রতার মাধ্যম। আমাদের বিত্ত, সংসার এবং সমাজ তাঁর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত এবং কুরবানি হচ্ছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক।

ঈদুল আযহার লক্ষ্য হচ্ছে সকলের সাথে সদ্ভাব, আন্তরিকতা এবং বিনয়-নম্র আচরণ করা। ঈদের দিন ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পরে কুশল বিনিময় করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে। 

শুধু পশু জবেহ করা কুরবানির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয় বরং পশু কুরবানির মাধ্যমে নিজের পশুপ্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় হলো ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার বান্দার তাকওয়ার পরীক্ষা গ্রহণ করেন। কালামে পাকে বলা হয়েছে, ‘কুরবানির পশুর রক্ত, গোশত কোন কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি’ (হজ্ব ৩৭)।

মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে ইহাকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে এবং ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে এই আদর্শই মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য ঐ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। মূূূূূূূূূলত, ঈদুল আযহার মূল আহ্বান হ’ল আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সকল দিক হ’তে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। সম্পদের মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ, স্ত্রীর ভালবাসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতি আত্মসমর্পণ করাই হ’ল ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা। হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পুত্র কুরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহর ভালোবাসার চাইতে যে পুত্রের ভালোবাসা বড় নয়, এটিই প্রমাণিত হয়েছে তাঁর আচরণে। এটাই হ’ল প্রকৃত তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। 

হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর প্রিয়পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি করতে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যাতে অনাগত ভবিষ্যতের অগণিত মানুষ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের বাস্তব শিক্ষা লাভ করতে পারে। প্রতি বছর জিলহজ্ব মাসে মুসলমানরা পশু কুরবানির মাধ্যমে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর স্মৃতি স্মরণ করে এবং পশু কুরবানির সাথে সাথে নিজেদের পশুপ্রবৃত্তিকে কুরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। মূলত আল্লাহর রাহে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার নামই হ’ল আত্মসমর্পণ। পিতা-পুত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে অনুপম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, তা যেমন অতুলনীয়, তেমনি চির অনুকরণীয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকালের ভয় কর তাদের জন্যে ইবরাহীম ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (মুমতাহিনা ৪-৬)।

হযরত আদম (আ.)-এর সময় থেকেই চলে আসা কুরবানির প্রথা পরবর্তীকালের সকল নবী-রাসূল, তাঁদের উম্মত আল্লাহর নামে, কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করে গেছেন। এ কুরবানি কেবল পশু কুরবানি নয়। নিজের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকার ত্যাগের কুরবানি। নিজের সালাত, কুরবানি, জীবন-মরণ ও বিষয়-আশয় সব কিছুই কেবল আল্লাহর নামে, শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানস এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত কুরবানি। এই কুরবানির পশু যবেহ থেকে শুরু করে নিজের পশুত্ব যবেহ বা বিসর্জন এবং সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় আত্মোৎসর্গ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। এই কুরবানি মানুষের তামান্না, নিয়ত, প্রস্তুতি, গভীরতম প্রতিশ্রুতি থেকে আরম্ভ করে তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত সম্প্রসারিত। ঈদুল আযহার সময়, হজ্ব পালনকালে মুসলিমের পশু কুরবানি উপরোক্ত সমগ্র জীবন ও সম্পদের কুরবানির তাওহীদী নির্দেশের অঙ্গীভূত এবং তা একই সঙ্গে আল-কুরআনে আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত মানব জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর পুত্র কুরবানির চরম পরীক্ষা প্রদান ও আদর্শ চেতনার প্রতীকী রূপ।

মূলত প্রত্যেক মুসলমানের আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন তাঁর সন্তানদের। তাই হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ঈমান-তাকওয়া ও ইসমাঈলী আত্মত্যাগের মহিমা যদি আবার জাগ্রত হয়, তবে আধুনিক জাহেলিয়াতের তমাশা ভেদ করে পুনরায় মানবতার বিজয় নিশান উড্ডীন হবে। সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে আসবে। 

তাই কুরবানির পশুর গলায় ছুরি দেয়ার আগে নিজেদের পশুত্বের গলায় ছুরি দিতে হবে। মহান আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী ও আত্মত্যাগী হ’তে হবে। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মুমিন বা মুত্তাকী হ’তে হবে। সে নির্দেশই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে দিয়েছেন। কালামে হাকীমে বলা হয়েছে, ‘(হে নবী) আপনি বলুন: নিশ্চয় আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণ সবকিছু বিশ^প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (সূরা আল আনআম, আয়াত-১৬২) সুতরাং আমাদের সালাত, কুরবানি, জীবন-মরণ সবকিছু হোক আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আর এটিই হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ