বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

টিয়াপাখির দাওয়াত

ছাবিলা ইয়াছমিন

আজ ভোরের আকাশটা ভারি সুন্দর, সারা বনজুড়ে যেন পাখিদের কলরবে ভরপুর। পুবাকাশে সূর্যটা কেবল উঁকি দিয়েছে, এমন সময় ঘুম ভাঙলো মা টিয়া পাখির, বাবা টিয়া পাখিটা বড্ড আলসে, সে এখনও ঘুমাচ্ছে, সেই সাথে বাবার পালকে মুখ গুজে ঘুমাচ্ছে তাদের ছোট্ট ছানা দুটি। এই তো ক’দিন আগেই তাদের ছোট্ট দুটি ছানা হয়েছে। ছানা দুটি এখন একটু বড়ও হয়েছে। সারা গায়ে সবুজ পালক গজাচ্ছে, ঠোঁট দুটি লাল টুকটুক করছে। ছানা দুটির দিকে তাকালে মা-পাখির মনটা খুশিতে ভরে যায়। ওরা এখন একটু একটু মা বলে ডাকতেও শিখেছে। মা টিয়ার খুব শখ যখন তার বাচ্চারা মা বলে ডাকতে শিখবে তখন সে বড় করে একটা অনুষ্ঠান করবে। বনের সব পাখিদের দাওয়াত করে খেতে দিবে। বাবা টিয়াকে সে আগে থেকেই বলে রেখেছে দেখো, আল্লাহ আমাদের কত সুন্দর দুটি বাচ্চা দিয়েছে, এই খুশিতে আমি বনের সব পাখিদের খেতে দিতে চাই, এ কথা শুনে বাবা টিয়াও খুব খুশি। বাবা টিয়া মা টিয়াকে বললো তা বেশ তো, কবে খেতে দিতে চাও ? আগামী শুক্রবার । ইনশাআল্লাহ তাই হবে,বললো বাবা টিয়া।

আজ যে শুক্রবার বাবা টিয়া মনে হয় ভুলেই গেছে। মা টিয়া তাকে জাগিয়ে দিয়ে বললো তুমি যাও খাবারের ব্যবস্থা করো, আমি সবাইকে দাওয়া দিয়ে আসি। বাবা টিয়া একটা হাই তুলে ডানা ঝাপটে আলসেমি ছেড়ে বাইরে এলো। ছোট্ট ছানা দুটি ঘুমিয়ে আছে। বাবা কি ভেবে আবার ঘরে গেলো। মা টিয়া বললো আবার কি হলো ? বাবা বললো ওদের আর একটু দেখতে এলাম। মা বললো, ওদের আবার দেখার কি হলো, তুমি যাওতো, এখনও অনেক কাজ বাকি। সারারাত ধরে ওদেরকে দেখো। বাবা টিয়া মন খারাপ করে ঘর থেকে চলে এলো। তারপর ডানা ঝাপটে উড়ে গেলো। মা টিয়া দেখলো তার ছোট্ট বাচ্চা দুটি এখনও ঘুমাচ্ছে, তাই এই সুযোগে দাওয়াতের কাজটা সেরে ফেলা যাক। সে ছোট্ট ছোট্ট পাতা দিয়ে বেশ কিছু দাওয়াতি কার্ড বানালো। তারপর প্রথমে গেলো বাবুই পাখির বাসায়। টিয়ার দাওয়াত পেয়ে বাবুই পাখি ভীষণ খুশি। সে মা টিয়াকে বললো, তুমি ভেবোনা, ইনশাআল্লাহ আমি যাবো তোমার বাচ্চাদের দেখতে। আর সবাই তো আমাকে কারিগর পাখি বলে। তাই আমি তোমার বাচ্চাদের সুন্দর করে একটা বাসা তৈরী করে দেব, যাতে তোমার ছোট্ট বাচ্চা দুটি আরাম করে ঘুমাতে পারে। মা টিয়া এবার গেলো ময়না পাখির বাসায়। সাত সকালে ময়না পাখি টিয়ার দাওয়াত পেয়ে খুশি হয়ে বললো- আমাকে সবাই গানের পাখি বলে, আমি তোমার বাচ্চাদের মিষ্টি করে একটা গান শিখাবো, কেমন? মা টিয়া বাচ্চারা গান শিখবে ভাবতেই বুকের ভিতরে আনন্দে ভরে গেলো। সে এবার গেলো ময়ূরের কাছে। ময়ূর দাওয়াত নিয়ে ভাবলো, কি দেওয়া যায় টিয়ার ছোট্ট বাচ্চাদের? হঠাৎ মাথায় এলো সবাই তো তার পালকের প্রশংসা করে, আল্লাহ তার গায়ে অপরুপ পালক দিয়েছেন। সে টিয়ার বাচ্চাদের তার পালকের মালা গেঁথে দেবে বললো। মা টিয়ার চোখ দুটি জ্বল জ্বল করে উঠলো, ময়ূরের পালকের হার তার বাচ্চাদের কী সুন্দর দেখাবে! এভাবে এক এক করে মা টিয়া সব পাখিকে দাওয়াত দিয়ে বাসায় এলো। এতক্ষণে বাচ্চারা উঠে বসে আছে। মা টিয়া মিষ্টি হেসে বাচ্চাদের সব বললো। ছোট্ট বাচ্চা কিছু বুঝলো না, ফ্যাল ফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকালো। মা টিয়া তাড়াতাড়ি বাসার সব কাজ সেরে নিয়ে ঠোঁট দিয়ে বাচ্চাদের পরিষ্কার করে দিলো। বাহ্ কী চমৎকার দেখাযাচ্ছে তার বাচ্চাদের। দুপুর প্রায় হবে হবে, এর ভিতরে মা টিয়া কিছু পোকামাকর জোগাড় করে ফেলেছে আর বাবাটার আসার নাম নেই। বাবা টিয়াটি এখনও আসছে না কেন ? মেহমানরা তো একটু পরেই এসে পড়বে। মা টিয়া একটা করে কাজ সারে আর পথের দিকে চেয়ে থাকে- ঐ বুঝি ওদের বাবা এলো। না, দুপুর গড়িয়ে এলো, মেহমানরা এসে হাজির হচ্ছে, বাবার আসার নাম নেই। সবাই টিয়ার বাচ্চাদের প্রশংসায় মত্ত। মা টিয়া ওদের অপেক্ষা করতে বলে একটু সামনে গেলো বাবা টিয়ার খোঁজ করতে। কিন্তু? সামনে যেতেই মা টিয়ার বুকটা দুরু দুরু করে কেঁপে উঠলো, একজন শিকারী একটি খাঁচায় আটকে বাবা টিয়াকে নিয়ে যাচ্ছে। সাথে প্রতিবেশি আরও কয়েকটি টিয়া আছে। সবাই জোরে জোরে কাঁদছে আর বলছে হে আল্লাহ রক্ষা করো। মা টিয়া তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষণের ভিতরে শিকারী ওদের নিয়ে কোথায় যেন চলে গেলো। মা টিয়া নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলো না। চিৎকার দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে এলো। কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে সব ঘটনা খুলে বললো। মা টিয়ার কান্না দেখে সমস্ত পাখি কেঁদে ফেললো। ময়না পাখি মা টিয়াকে সান্ত¡না দিয়ে বললো কাঁদিস না বোন, ঐ অসৎ মানুষগুলোর জন্য আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারি না। আমাদেরও তো ইচ্ছে করে স্বাধীনভাবে নীল আকাশে উড়তে। বাবা মা ভাই বোন মিলে দিন কাটাতে। আমাদের খাঁচায় আটকে রেখে ওদের কি লাভ হয় ? ছোট্ট ছানা দুটি মায়ের কান্নার কারণ কিছুই বুঝতে পারলো না। ওরা ফ্যাল ফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আর মা টিয়া তো কেঁদেই চলেছে.....।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ