রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মুনির পাটোয়ারী ও তার নোনা জলের গল্প

মুহাম্মদ ইসমাঈল

কবিতা মানুষ ভালোবাসে। কবিতা না থাকলে পৃথিবীতে সাহিত্য থাকত না। কবিতাই আসল সাহিত্য। কবি ও কবিতা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এখন থেকে নয়, রাসূল সঃ-এর যুগ থেকে, তারও আগ থেকে কবিরা কাব্যচর্চা করত। কবিতা নিছক খারাপ কিছু নয়। কবিরা স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসে। নিজেও স্বপ্নের মধ্যে থাকে। স্বপ্নের রাজ্যে বসবাস করে। রাজনীতিবিদরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে। আমাদের মাঝে একটা ভ্রান্ত ধারণা। কবিরা পাগল, বাউন্ডেলে, চরিত্র খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন যাপিত হয়। এ কথা মোটেও ঠিক নয়। 

কারণ দু’চারজনের জন্য আপনি সবাইকে খারাপ বলতে পারেন না। রাসূলপাক (স) নিজেও কবিদেরকে ভালোবাসতেন। উৎসাহ দিতেন। কবিদের মুখের কবিতা শুনতেন। আনন্দ পেতেন। সাহাবীদের মধ্যে অনেকে ভালো ভালো কবি ছিলেন। 

মানুষের মনন ও সুবোধ জাগিয়ে তোলা এবং সত্য ও সুন্দরের সন্ধান দেওয়াই সাহিত্যের কাজ। আর ভাষা সাহিত্য জগৎ কাব্য ও ছন্দ নিয়েই তার যাত্রা শুরু করেছিল। কবিতাই ছিল সাহিত্য সৃষ্টির মানুষের প্রাথমিক মাধ্যম। মানব, মনন, প্রেম, অনুভূতি, আবেগ, ভালোবাসা, ঘৃণা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক কবিতা। কবি ও কবিতা কালের মহা এক সাক্ষী।

কবি মুনির পাটোয়ারীর কবিতার বই “নোনা জলের গল্প” আমার পাঠ করার সুযোগ হয়েছে। পা-ুলিপির প্রতিটি লেখায় আবেগের বেশ ঠাসাঠাসি অবস্থান। একজন লেখক কবিতা লিখতে এসে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। এটাই স্বাভাবিক। মুনির পাটোয়ারীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। 

বাংলাদেশের সকল কবিই কমবেশি প্রকৃতির বিশালত্ব ও বৈচিত্র্যের গভীরতায় বিচরণ করে। একই সাথে মানুষের চাওয়া পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নবোনার সম্ভাবনা চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। কেউ চেষ্টা করেন রাজনীতি নিয়ে, কেউ চেষ্টা করেন সামাজিক সচেতনতা নিয়ে, কেউ চেষ্টা করেন ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তি নিয়ে। মুনির পাটোয়ারীর কবিতা থেকে দুটি সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতা। রাজনীতির নির্মম দিক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। 

কাশ্মীরের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন দীর্ঘদিনের। এখানে তাদের স্বাধীনতা নেই, কথা বলার অধিকার নেই। এখানেও কবি কলম ধরেছেন কাশ্মীর প্রসঙ্গে-

“ডাকে কাশ্মীর নামে-

জাগো মানবতা জাগো, জাগো মনুষ্যত্ব জাগো

জাগো মুসলিম জাগো, জাগো মুজাহিদ জাগো

জাগো অরুণ তরুণ যত বীর।

ছেলেবেলা কার না ভালো লাগে; ছেলেবেলার স্মৃতির রোমন্থন কবিকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জীবনে। এক সময় আমাদের সবার বসবাস গ্রামে ছিল। গ্রামের অনেক স্মৃতি আমাদের মনে পড়ে। 

“ছেলেবেলা” কবিতায় তাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে-

উঠান জুড়েই চলতো খেলা

বল ক্রিকেট ডাংগুলি।

জ্যাঠার ভয়ে থাকত খাড়া

সদাই সবার কানগুলি।

লাঙল কাঁধে লাঠি হাতে

ফিরতো জ্যাঠা যেই বাড়ি ।

যে যার মত ভো-দৌড় দিতাম

থাকতো পড়ে পাততাড়ি।

 

দেশকে ভালোবাসে না এমন লোক হয়তো আমার জানা নেই। দেশের জন্য অনেকে অনেক কিছু করেছেন। কবির হৃদয়ের গহীন কোঠায় দেশের মায়াজালে এভাবে ধরা পড়েছে। 

“এদেশটাকে অনেক ভালোবাসি” কবিতায়

আমরা যারা এ দেশটাকে অনেক ভালোবাসি

হাজারটা ক্ষোভ থাকবে বুকে

বুকটা নুয়ে আসবে শোকে

থাকবো তবু মিলেমিশে

রাখবো মুখে হাসি

আমরা যারা দেশটাকে অনেক ভালোবাসি।

 

এ সমাজটা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। সমাজে ঐক্য নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। কবি তার সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে এ কবিতাটি আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন।

“এসো” কবিতায়-

এসো ঐক্যের গান গাই

এসো মিলনের গান গাই

এসো গলাগলি করি

এসো কোলাকুলি করি

এসো ভেদাভেদ ভুলে যাই।

 

শিরোনামে যে কবিতাটি “নোনা জলের গল্প”। এটি অত্যন্ত বাস্তবতার সাথে মিল রেখে লিখেছেন আমরা অনেকে অনেকভাবে কষ্ট করি। নিজের জীবনকে একটু সুন্দরভাবে চলার জন্য। এতে অনেকের আশাই গুড়েবালি হয়ে যায়। কারো চাওয়া পাওয়ার বাস্তবতার কোন মিল নেই। 

নোনা জ্বলে হয় একাকার জেলের চোখের জল

সব কিছু নেয়, পারে না নিতে জেলের বুকের বল

সাঁতরে চলে দিনে রাতে

যুদ্ধ চলে ঢেউয়ের সাথে

ভেসে ভেসে অবশেষে পায়রে পায়ে তল।

নতুন করে স্বপ্ন বুনে হার না মানার দল।

 

রাজনীতি, বিবেক বুদ্ধি আজ আমাদের লোপ পেয়েছে সব জায়গায় আজ আমরা পরাজিত। “সেলুকাস” কবিতাটি রাজনৈতিক কিছু ইঙ্গিত বহন করেছে। 

বড়ই অবোধ জাতি!

এখন জানে না কিসে তার লাভ কিসে তার মহাক্ষতি!

অবোধ না বলে বলবো কি বলো এ জাতি বড়ই চালাক

বিভেদকে যে নিকা করে নেয় মিলনকে দেয় দিয়ে তালাক।

 

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের নিষ্ঠুর বর্বরতা সব সময় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সে সময়কার পরিস্থিতি নিয়েও কবি লিখেছেন।

“মরু মেশকের গল্প” কবিতায়-

বাবা তার মেয়েকে মাটি চাপা মারতেন

আরবের মায়েরা মুখ ঢেকে কাঁদতেন।

রক্তের বন্যায় ডুবে যেত মরু বুক

দাসদের কান্নায় আকাশে হতো শোক।

 

যেমন তার রাজনৈতিক কবিতায় তিনি এভাবে লিখেছেন ‘চোর গেরস্ত খেলা’ কবিতায়-

রাতের আঁধারে পালাতেই হবে ভেবেছিল কোন দিন?

একেই বলে দশ দিন চোরের, গেরস্তের একদিন।

জানি না আরও কত কত চোরে অচিরে পড়বে ধরা

হয়তোবা তারা আছেন এখনো রঙিন চশমা পরা।

 

‘হতবাক’ কবিতায় এইভাবে উদ্ধৃতি এসেছে-

চারদিকে আজ বিভীষিকা ভয়

মৃত্যুর হাতছানি।

যার আসে ডাক সে চলে যায়

নেই কোন জানাজানি।

 

সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়েও কবিকে ভাবিয়ে তোলে। তাই তিনি ‘লোভী স্বার্থের অন্ধ’ কবিতা দিয়ে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করেছেন।

লোভী আর স্বার্থের অন্ধ

খুঁজে ফিরে অর্থের গন্ধ।

করে না কাউকে বিশ্বাস

একাকার করে ভালোমন্দ।

 

সমাজে চাষ করে দ্বন্দ্ব

খুঁড়ে যায় শুধু খানাখন্দ।

 

ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চিন্তা থেকে কবির কবিতা বাদ পড়েনি তিনি এভাবে লিখেছেন-

যা সরে যা নাফরমান, যা সবে যা জাহান্নাম

দুনিয়াতে একটি বারও লইলি না তো আমার নাম।

আজকে যতই ডাক রে, শুনব না আজ আমি রে

সুক্ষ থেকে সুক্ষ পাপের, আজকে পাবে প্রতিদান।

 

অন্ধ কি তুই ছিলিরে? ঘুরলি কিসের পিছে রে?

বলিনি কি আমি রে দুনিয়াটা মিছে রে

ছেড়ে দিয়ে পাপের পথটা হতে খাঁটি মুসলমান।

 

মুনির পাটোয়ারীর জন্ম চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তী থানার চাঁদপুর গ্রামে ১৯৮০ সালের ১মার্চ। লেখাপড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে ফিশারিজে অনার্স এবং একোয়াকালচারে মাস্টার্স। কর্মজীবনে ব্যাংকার। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের লোকাল অফিস, মতিঝিলে কর্মরত আছেন। স্ত্রী শাম্মী আক্তার শোমা, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে কর্মকর্তা। 

কবি তার বাবা-মায়ের এগারো সন্তানের মধ্যে সপ্তম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই নিয়মিত লিখে চলেছেন। জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সংখ্যা ৫০ এর অধিক। এটি কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ এর আগে “ভালোবাসি এক টুকরো জমিন” শিরোনামে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। 

কবিতা ছাড়া তিনি পাশাপাশি গানও রচনা করেন। ২০১১ সালে উৎসব শিরোনামে একক এ্যালবাম  প্রকাশিত হয়। জনপ্রিয় সুরকার মিল্টন খন্দকারের করা সুরে কণ্ঠ দেন ক্লোজআপ তারকা রাজিব, সাজুসহ ৬ জন জাতীয় পর্যায়ের তারকা শিল্পী যা বিটিভি, জিটিভি, চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন চ্যানেলে একাধিকবার করে সম্প্রচারিত হয়। 

কবিতার আরেক নাম সাধনা। সাধনাটি হতে হবে ক্রমাগত এবং আন্তরিক। অস্থির কুয়াশা ঠেলে ঠেলে একা অন্ধ হাঁটার নাম কবিতা। জীবনের অতল জলে ডোবা আর ভাসার নাম কবিতা। তাই কবিতার পৃথিবীতে মুনির পাটোয়ারীর সাফল্য কামনা করছি। এগিয়ে যাও মুনির। সাহিত্যের আসরে কবিতাই শ্রেষ্ঠ উপহার। ‘নোনা জলের গল্প’ বইটি প্রকাশ করেছেন ‘পরিলেখ’ প্রকাশনা। একুশে বইমেলা ২০২১। প্রচ্ছদ- আহম্মেদ ইউসুফ। বইটিতে ৫৩টি কবিতা স্থান পেয়েছে। যার মূল্য ২০০/- (দুইশত) টাকা। আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ