বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

‘নূর কুতুবুল আলমের চিঠি’ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু 

ইবরাহীম খলিল:

বিশিষ্ট সাংবাদিক হারুন ইবনে শাহাদাতের ‘নূর কুতুবুল আলমের চিঠি’ উপন্যাসটি আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। বইটির প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে নাটক নাটক মনে হয়েছিল। কিন্তু ঘটনার গভীরতা বিবেচনায় এবং পরিণতিতে গিয়ে উপন্যাসের ধাঁচ চলে আসে। মনে হলো লেখক বইটিতে নাটক এবং উপন্যাসের সহজাত ব্যাকরণ ভেঙ্গে নতুন ঢং দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মূলত ‘নূর কুতুবুল আলমের চিঠি’ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। ইতিহাসকে ধারণ করে সমসাময়িকতাকে সামনে রেখে উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে বিন্যাস করা হয়েছে। উপন্যাসটিতে আছে প্রেম, পরম সেবা ধর্ম, রাজনৈতিক সংকট, ব্যতিক্রমী রণকৌশল, কূটনীতি এবং মাধুর্যপূর্ণ চরিত্রের সমাহার। 

একটি খানকাকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি সাজানো হয়েছে। এই খানকাকে কেন্দ্র করেই মূল চরিত্র নায়কের আবির্ভাব। উপন্যাসের পরতে পরতে থাকা অন্য চরিত্রগুলোও নক্ষত্রের মতো জ্বল জ্বল করছে। আছে ভিলেনের নির্মম অট্টহাসি। চাটুকার এবং বিশ্বাসঘাতকের চরিত্র অলংকরণেও লেখক বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। গতানুগতিক রাজনীতির  বাইরে গিয়ে শিক্ষা এবং সেবাধর্মী কাজের মাধ্যমে গণ মানুষের মণিকোঠায় জায়গা করে নেওয়ার বিষয়টি যত্ন করে তুলে এনেছেন উপন্যাসিক। কঠিন সময়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং নীরব বিপ্লবের জন্য চ্যারেটি বা স্বেচ্ছায় জন-সেবামূলক কাজের প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে সহজ-সংলাপ, অবয়বের পরিমিতিবোধ, সাবলিল শব্দ চয়ন বইটি বর্তমান সময়কে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। উপন্যাসটির শুরুতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ,গবেষক ও সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান লিখেছেন, এখন থেকে ছয়শ’ বছর আগের মহানায়ক নূর কুতুবুল আলমকে সামনে রেখে উপন্যাসের আধারে মধ্য যুগের একটি ক্রান্তিকালের সমাজচিত্র স্বচ্ছ-সংযত-সরল ভাষায় পাঠকের সামনে হাজির করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক হারুন ইবনে শাহাদাত। তিনি আরও লিখেছেন ইতিহাসের নানা বাঁকে জাতীয় নানা বিপদে-দুর্যোগে কারা ছিলেন এ জনপদবাসীর সামাজিক- সাংস্কৃতিক সীমানার প্রকৃত পাহারাদার তা বুঝতে এ ধরণের উপন্যাস সহায়ক।

মলাটের ভাঁজের ভেতর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের লেখাটি পড়ার পরই মূলত বইটির ভেতরের অংশ পড়ার প্রবল আগ্রহ জাগে এবং সারারাত জেগে পড়ে বইটি পড়ে শেষ করি।

মূলত চিঠির ইসুটি এসেছে ৯ নম্বর অংকে যখন ঘটনার ঘনঘটা। রাজা গণেশ বিদ্রোহ শুরু করেছে। বিদ্রোহী ফৌজদের হাতে শহীদ হয়েছেন সুলতান শিহাব উদ্দীন বায়জিদ শাহ। গণেশ ক্ষমতা দখলের পরপরই ওমান শেখের মুখোশ খুলে গেছে। তার আসল পরিচয় যে অমল নাথ তা রাজ্যের সবাই জেনে গেছে। নূর কুতুবুল আলমের ছেলে জাহিদ শাহের হাতে দু’টি জরুরী চিঠি। শায়েখ নূর কুতুবুল আলম একটি চিঠি লিখেছেন জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে। অন্যটি লিখেছেন শায়েখ কুতুবুল আলমের পিতা শায়েখ আলাউল হকের ছাত্র জৌনপুরের প্রখ্যাত আলেম আশরাফ সিমনানির ভক্ত। 

মোট ১৭ অংকের উপন্যাসের প্রথম অংকের শুরুটা এরকম- পশ্চিম আকাশে আবির রঙের মেঘের ভেলার ফাঁকে সূর্য মুখ লুকাচ্ছে। পাখিরা দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে নীড়ে। দেখে মনে হয় যেন বিনে সুতোয় গাঁথা এক একটি উড়ন্ত মালা। মহানন্দা নদীর তীরে কার্পেটের মতো নরম ঘাসের উপর আনোয়ার শাহ আর জিতমল বসে গল্প করছেন। উনারা দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জিতমলের ডাক নাম যদুনাথ। আনোয়ারের বাবা প্রখ্যাত আলেম শাহ নূর কুতুবুল আলম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার সব মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। সবাই তাকে দরবেশ বলে সম্মান করেন। আর জিতমলের বাবা গণেশ বড় জমিদার বাংলার সুলতানের সাহেব-ই-ইখতিয়ার-ই-মুলুক ও মাল মানে অর্থমন্ত্রী। কুটবুদ্ধি আর চাটুকারিতা দিয়ে তিনি বড় পদে আসিন হয়েছেন। যদুনাথ আবার আনোয়ারের বাবার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের ছাত্র। রাজ্যের বড় দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে প-িতদের টোলে না পাঠিয়ে নূর কুতুবুল আলমের বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। উপন্যাসের শুরুতেই ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এবং একটি মান সম্মত বিদ্যালয়ের কথা বলা হয়েছে। যা কি-না সর্ব সাধারণকে আকৃষ্ট করার মূল মন্ত্র। নূর কুতুবুল আলম সর্বজন শ্রদ্ধেয় আর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির মানের কারণে পন্ডিতের টোলে না পাঠিয়ে পাঠানো হলো দরবেশের পাঠশালায়। যেখানে পড়াশোনা করলে রাজ্যের বড় কর্মকর্তা হওয়ার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠবে।

২ নম্বর অংকে এসে দেখা যায় গ্রামে কলেরা দেখা দিলে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যারা নিন্ম বর্ণের তাদের না আছে পূজা করার অনুমতি; না আছে ডাক্তার ডাকার সামর্থ্য। তাই রোগে-শোকে তাদের শেষ গন্তব্য শ্মশান। গ্রামের হরিদাসের ছেলে রতি লালের পাতলা পায়খানা শুরু হলে তার মনে হতে থাকে যে ওলাদেবী তার ওপর ক্ষেপে গিয়ে নির্বংশ করতেই পাতলা পায়খানা বা কলেরা রোগ দিয়েছে। কিন্তু হুমায়ুন মাওলানা যখন টমটম নিয়ে বাড়িতে হাজির হয় আর মধু মেশানো পানি খেতে দেয় তখন রতির শরীরের অবস্থা কিছুটা ভাল হতে থাকে। সেইসাথে নূর কুতুবুল আলমের দাওয়াখানার আপ্যায়ন ব্যবস্থায় মুগ্ধ করে রতির মা-বাবাকে। দাওয়াখানার বর্ণনা এভাবে দিয়েছে সাংবাদিক হারুন ইবনে শাহাদাত এটা শুধু দাওয়াখানা নয় মসজিদ, মক্তব, বিদ্যালয়, জামেয়া, মেহমানখানা, দরবার ঘর, হুজরা আরও কত কি! রোগী বহনকারী টমটম দাওয়াখানার ফটকে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে আসেন নূর কুতুবুল আলমের বড় সাহেবজাদা আনোয়ার শাহ। তিনি অসুস্থ নি¤œশ্রেণির হিন্দু রতিদাসকে কোলে তুলে নেন মলমূত্রসহ। কিন্তু তার চেহারায় কোন বিরক্তির ছাপ নেই। 

উপন্যাসের ৪ নম্বর অংকে এসে রাজা গণেশের ছেলে যদুনাথ এবং রাজার ঘনিষ্ঠবন্ধু অবনি বাবুর মেয়ে যমুনার প্রেমকাহিনীর অবতারণা করেছেন। এই প্রেমে চমৎকার কিছু সংলাপ আছে, আছে অভিসার। কিন্তু অশ্লীলতা নেই। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে- নায়ক-নায়িকার চরিত্র আছে। প্রেম কাহিনী আছে। কিন্তু সেখানে মান-অভিমানের পর্ব খোঁজে পাওয়া গেল না। সার্থক প্রেমের চরিত্রের জন্য মান-অভিমানের সংলাপ খুব বেশি জরুরী বৈকি! শুধু সুখ আর সুখ দিয়ে প্রেম হয় না; সংসারও হয় না। সার্থক প্রেমে থাকতে হয় মান-অভিমান-বিরহ। আমাদের এই অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে প্রেমে মান-অভিমান বাধ্যতামূলক। যা এই উপন্যাসে অনুপস্থিত। 

২৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ৭ নম্বর অংকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যায়। রাজা গণেশ বাঙ্গালা, বিহার, পা-ুয়া, বরেন্দ্র, সমতট অঞ্চল থেকে যবনদের তাড়িয়ে একাই শসন করার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু রাজা গণেশের বন্ধু অবনী ঠাকুর মনে করেন যে, এই অঞ্চলের কুতুবুল আলম এবং বদরুল ইসলামের মত পীর শায়খ দরবেশরা তাদের পথের কাঁটা। তাদের আছে মুসলমানের পাশাপাশি হিন্দু-বৌদ্ধ ভক্ত। ৯ নম্বর অংকে এসে ওমান শেখের মুখোশ খুলে যায়। তার আসল নাম ছিল অমল নাথ। অমল নাথ ওমান শেখ নামে ছদ্মবেশ ধারণ করে মুসলমানদের ক্ষতি করেছেন। উপন্যাসের এই অংশে নূর কুতুবুল আলমের টিঠির মাহাত্ম তুলে ধরা হয়েছে।  তার আগে ৮ নম্বর অংকে আনোয়ার শাহ এবং যদুনাথে সত্য সন্ধানের আলপন পাঠকের মনে দাগ কাটবে। এখানে সব চেয়ে বড় নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে বই। যদুনাথের সত্যানুসন্ধান এবং দুই বন্ধুর সংলাপ ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করেছে।  

১১ নম্বর অংকে রাজ দরবারে যখন নূর কুতুবুল আলমের বিরুদ্ধে অ্যাকশনের প্রশ্ন আসে তখন অবনী ঠাকুর রাজা গণেশকে সতর্ক করে বলে যে প্রজাদের মধ্যে তার এতটা প্রভাব যে, তার ওপর হাত দিলে প্রজা বিদ্রোহ শুরু হয়ে যাবে। আর তার বিশ্ববিদ্যালয়ে আশপাশের অনেক রাজ্যের শাহজাদা লেখাপড়া করে। ওখানে সেনা অভিযান পরিচালনা করা হলে আশপাশ থেকে আক্রমণ শুরু হবে।

উপন্যাসের সমাপ্তি হয়েছে অনেকটা গতানুগতিকতা দিয়ে। কোনো একটা নাটকীয়তা দিয়ে শেষ হলে বোদ্ধা পাঠকমহলে এর কদর আরও অনেকটা বেড়ে যেত বলে আমার বিশ্বাস। ভবিষ্যতে আরও  সময়োপযোগী-সমৃদ্ধ বইয়ের প্রত্যাশা রইলো অগ্রজ সাংবাদিক হারুন ইবনে শাহাদাত’র কাছে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ