রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

চট্টগ্রামে কঠোর লকডাউনে ৭টি প্রবেশ পথে চেকপোস্টে তল্লাশি ॥ আটক ২১

সারাদেশে কঠোর লকডাউনে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে চট্টগ্রামের প্রবেশ পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। ছবিটি নগরীর সিটিগেট এলাকা থেকে তোলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: করোনা ভাইরাস সংক্রমন বিস্তার রোধে লক্ষ্যে সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার ১৪ টি উপজেলায় সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে।লকডাউনের বিধিনিষেধ মানা হচেছ কিনা তা তদারকিতে প্রশাসন ও  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর আছে। মার্কেট শপিংমল বন্ধ রয়েছে।সরকারী বেসরকারী সকল অফিস,প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কঠোর লকডাউনে চট্টগ্রামের ৭টি প্রবেশ পথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি শুরু করেছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।বৃহস্পতিবার ভোর থেকে কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যারটেক এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি শুরু করেছে। লকডাউনে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন প্রবেশ পথে মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মাঠে রয়েছে পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও আনসার সদস্যরা।এদিকে, নগরীতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশের সঙ্গে রয়েছেন ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনাররা (ভূমি)। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্যদের নিয়ে সকালে নগরীর সার্কিট হাউস থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে।

এদিকে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে না আসার অনুরোধ জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান।বৃহস্পতিবার  সকালে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ অনুরোধ জানান।জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণের হার ২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ শতাংশ হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত জরুরি কাজগুলো ছাড়া অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।তিনি বলেন, নগরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ১০০ জন ভলান্টিয়ার কাজ করছেন। কাঁচাবাজার ছাড়া সব শপিংমল, বিপণী বিতান বন্ধ থাকবে। কাঁচাবাজারে যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয়, সেজন্য প্রতিটি বাজারের সামনে আনসার সদস্য ও ভলান্টিয়ার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। মমিনুর রহমান বলেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে টহল চলবে। যেহেতু শিল্পকারখানা চালু আছে, কেবলমাত্র শিল্প-কারখানায় চালাচলকারী যানবাহন ছাড়া সব যন্ত্রচালিত যানবাহন বন্ধ থাকবে।  

 লকডাউনের সকাল থেকে নগরীতে প্রচুর রিক্সা চলাচল করছে।ট্রাক পন্যবাহী যানবাহন চলছে।জরুরী সাভিস সংক্রান্ত অফিস খোলা ছিল ।পোষাকশিল্প ও শিল্প কারখানার কর্মকর্তারা,শ্রমিকরা যানবাহনের অভাবে খুব দুর্ভোগ পোহায় বিভিন্ন স্থানে। অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। কাচাঁ বাজার সহ অলিগলির দোকান পাট খোলা ছিল।বিভিন্ন এলাকায়  কাজ না থাকলেও অনেক মানুষ অযথা রাস্তায় বের হয়ে জটলা করে আড্ডা দিতে দেখা যায় । কারো মুখে মাস্ক আর কারও সেটা দেওয়ারও গরজ নেই। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। পুলিশ দেখলেই দৌড়ে পালাচ্ছেন।এদিকে নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে লকডাউন কেমন চলছে তা দেখতে এসে ২১ জন আটক হয়েছে পুলিশের হাতে। এসময় ৫টি গাড়িও জব্দ করা হয়।মামলা দায়ের করা হয়েছে আরও ১০টি গাড়ির বিরুদ্ধে।পরেআটককৃতরা মুচলেখায় মুক্ত হন।বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সকালে বাদামতলী মোড়ে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে অযথা ঘোরাঘুরির দায়ে অভিযুক্তদের আটক ও গাড়ি জব্দ করে। এদিকে লকডাউনের প্রথম দিন আগ্রাবাদ এলাকা পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সানা শামিমুর রহমান, উপ-কমিশনার (পশ্চিম) আব্দুল ওয়ারীশ, সহকারী কমিশনার (ডবলমুরিং) মাহমুদুল হাসান মামুন সহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।  ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, লকডাউনে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া লোকদের আমরা গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করছি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই একটি চেকপোস্ট ও ৫টি টহল টিমের মাধ্যমে আমরা লকডাউন কার্যকরের চেষ্টা করছি। অকারণে যারা বের হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। তিনি বলেন, লকডাউন কেমন চলছে তা দেখতে বের হওয়ায় ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সময় ৫টি গাড়ি জব্দ ও ১০টি গাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে। লকডাউন কার্যকর করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।  

এদিকে যাত্রী পরিবহনের সময় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।বৃহস্পতিবার  দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সটি আটক করা হয়।পরে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুকান্ত সাহা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১ হাজার টাকা জরিমানা করেন।জানা গেছে, আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সটি সকালে মেডিক্যাল স্টাফ নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসে। ফিরে যাওয়ার সময় চালক কয়েকজন যাত্রী ওঠায়। পরে মইজ্জারটেক এলাকায় বসানো চেকপোস্টে তল্লাশির মুখে পড়লে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি আটক করে পুলিশ।  

মিরসরাই (চট্টগ্রাম)সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ভয়াবহ বিস্তারের মধ্যে কঠোর লাকডাউন শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই উপজেলায় জনজীবন প্রায় স্থবির ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে কঠোর লকডাউন কার্যকর করতে মাঠে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রশাসন। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে গিয়ে অনুমোদনের বাইরে দোকান খোলা রাখা ও মাস্ক ব্যবহার না করায় ১৭জনকে ১৮৮০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মিনহাজুর রহমান, উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) সুবল চাকমা, মিরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মজিবুর রহমান ও মঘাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসাইন মাষ্টার মাঠে ছিলেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পন্যবাহী ও ঔষুধ সরবরাহকারী গাড়ি ছাড়া অন্য গাড়ি চলতে দেখা যায়নি। উপজেলার বারইয়ারহাট পৌর বাজার, মিরসরাই সদর, আবুতোরাব, মিঠাছড়া, জোরারগঞ্জ, আবুরহাট সহ সব বাজার বন্ধ ছিল। শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত দোকানপাট খোলা রয়েছে।মিরসরাই উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) সুবল চাকমা বলেন, অনুমোদনের বাইরে দোকান খোলা রাখা ও মাস্ক ব্যবহার না করায় তিনি আবুতোরাব বাজার, সাধুর বাজার, বামনসুন্দরহাট, মিঠাছড়া বাজারে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ১০জনকে ১৩০০ টাকা জরিমানা করেছি।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনার বাইরে দোকান খোলা রাখা ও মাস্ক ব্যবহার না করায় ৭জনকে ৫৮০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ওইসব ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা এবং মানুষদের মাস্ক ব্যবহার করতে সচেতন করা হয়েছে। লকডাউন চলাকালীন সময়ে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।এদিকে মিরসরাইয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। উপজেলার প্রায় সব এলাকায় ঘরে ঘরে জ্বর সর্দি ও কাশির রোগী রয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার উপজেলায় করোনা পজেটিভ হয়েছে ২১ জনের। গত এক সপ্তাহে উপজেলায় ১০৯ জনের করোনা পজেটিভ হয়েছে।

 আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় চলমান লকডাউনের প্রথম দিনের সকাল থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। গণপরিবহন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে সবধরনের দোকানপাট । বৃহস্পতিবার (১লা জুলাই) দিনের শুরু থেকেই প্রশাসন উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ও সড়কে ব্যারিকেড দেয়। লকডাউন চলাকালীন জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করছেন উপজেলা প্রশাসন। সকাল থেকেই উপজেলা প্রশাসনের দুইটি টিম মাঠে থাকতে দেখা যায়। এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জুবায়ের আহমেদ এর নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি টিম জয়কালী বাজার, মালঘর বাজার ও ছাত্তার হাট এলাকায় টহল দিতে  দেখা যায়। অপর দিকে বটতলী, সেন্টার, চাতরী এলাকায় টহল দেন উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি)  তানভীর হাসান চৌধুরী। তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন ক্যাপ্টেন শুয়াইবের নেতৃত্বে সেনা বাহিনীর একটি টিম।সরেজমিনে দেখা যায়, কঠোর এ বিধিনিষেধের প্রথম দিনের সকাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়েছে থানা প্রশাসন। জরুরি সেবা ব্যতীত সব দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রয়েছে। আনোয়ারার সঙ্গে বাঁশখালী ও চন্দনাইশসহ বিভিন্ন সড়ক যোগাযোগের পয়েন্টগুলিতে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। এছাড়াও রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রশাসনের সাথে সাধারণ মানুষ লুকোচুরি খেলতে দেখা যায়। আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম দিদারুল ইসলাম সিকদার জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ভোর থেকেই উপজেলার  বিভিন্ন সড়কে তৎপর রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। লকডাউনের প্রথম দিনের সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি করোনা সংক্রমক বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে আজকে থেকে লকডাউন চলছে। মানুষ মোটামুটি আইন মেনে চলছে। লকডাউন  বাস্তবায়ন করতে আমরা কঠোর অবস্থানে মাঠে রয়েছি। প্রয়োজনে কাল থেকে আরো কঠোর হবো আমরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ