সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

করোনার ঊর্ধ্বমুখীর মধ্যে নতুন আতংক ‘ডেঙ্গু’

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : আবু হাসান। পেশায় সংবাদকর্মী। কাজ করেন একটি জাতীয় দৈনিকে। মাস ছয়েক আগে করোনা আক্রান্তের পর এবার আক্রান্ত হয়েছেন ডেঙ্গুজ্বরে। অবস্থার অবনতি ঘটায় ভর্তি হতে হয়েছে পান্থপথের হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালে। ভর্তির এক সপ্তাহ পার হলেও এখনো হাসপাতালেই আছেন। জানা গেছে, তার মতো করোনা মহামারির মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হাসপাতালে। প্রতিদিন ২৫-৩০ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হলেও ভয়ে টেস্ট না করিয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যে শঙ্কার বার্তা দিয়ে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। এতে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে অবহেলাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যে জানা যায়, প্রতিদিন রাজধানীর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছেন ২৫-৩০ জন। বর্তমানে ঢাকার ৪১টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন শতাধিক রোগী। তবে এখনো ডেঙ্গুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ২০১৯ সালে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৭৯। ২০২০ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৩৯২ জন, মারা গিয়েছিলেন তিনজন। গত বছর থেকে করোনার প্রকোপে বিপন্ন হয়েছে জনজীবন। শনিবার পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন আট লাখ ৮৩ হাজার ১৩৮ জ ন। মারা গেছেন ১৪ হাজার ৫৩ জন। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান। এর মধ্যে গত মাস থেকেই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃষ্টির মৌসুম শুরু হতেই জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করতে শুরু করেছে এডিস মশা। এ পরিস্থিতিতে গত ৯ মে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেছিলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার যে উপস্থিতি দেখা গেছে তা আশঙ্কাজনক বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ভার্চুয়াল বিফ্রিংয়ে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হতে শুরু করেছে। এই করোনাকালে ডেঙ্গু যেন আমাদের নতুন করে বিপদগ্রস্ত না করে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ নম্বর ওয়ার্ড (লালমাটিয়া ও ইকবাল রোড) ও ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে (সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী) অনেক বেশি পরিমাণে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, ডিএনসিসির ১৩, ৩১, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মালিবাগ, গুলবাগ, শান্তিবাগ, মিন্টো রোড, বেইলি রোড, কাকরাইল, সিদ্দিক বাজার, ওসমান গণি রোড, শাঁখারীবাজার, আরকে মিশন রোড, অভয় দাশ লেন, মিল ব্যারাক এলাকায় অনেক বেশি পরিমাণে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করতে পেরেছি। প্লাস্টিকের পাত্র, পানির ট্যাংক, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন, লিফটের গর্তে অত্যন্ত আশঙ্কাজনকভাবে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর কারণে যে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে, সেটি যদি এই করোনাকালে হয় তাহলে মৃত্যুর মিছিল বাড়াবে কি না বরাবরই সে আশঙ্কা থেকে যায়।’
জানা গেছে, মশক নিধনে দুই সিটি করপোরেশনে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি মাঝে মাঝে চলছে বিশেষ চিরুনি অভিযান। গত ১২ জুন এডিস মশার লার্ভা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ২১টি মামলায় ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে মশার লার্ভা ও উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট করা হয়। মশক নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টি এডিস মশার বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে। বৃষ্টির জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে মশা বংশবিস্তারের সুযোগ পায় এবং লার্ভার ঘনত্ব বেড়ে যায়। লার্ভার ঘনত্বের কারণে কিছু কিছু এলাকা ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। নির্মাণাধীন ভবন, খালি কনটেইনারে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব থেকে সতর্ক থাকতে হবে। বালতি, বোতলে কিংবা কোনো পাত্রে পানি যেন জমতে না পারে এ জন্য কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের খেয়াল  রাখতে হবে।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই ২০১৯ সালের মতো মারাত্মক আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা সংস্থার (ডিজিএইচএস) মুখপাত্র ও পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. নাজমুল ইসলাম।  বলেছেন, করোনাভাইরাসের মধ্যেই যদি ২০১৯ সালের মতো কিংবা তার চেয়েও খারাপ ডেঙ্গু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তবে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকবে। সম্প্রতি এক আলোচনায় ডিজিএইচএসের প্রাক-মৌসুমী এডিস জরিপের কথা উল্লেখ করে ডা. নাজমুল বলেন, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩২ নং ওয়ার্ডে এডিস লার্ভা সর্বাধিক ঘনত্ব পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়া ও ইকবাল রোড অঞ্চল রয়েছে। এছাড়া একই পরিস্থিতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে, যার মধ্যে রয়েছে সায়েদাবাদ ও উত্তর যাত্রাবাড়ী অঞ্চল। লার্ভাগুলোর ঘনত্ব ব্রেটিও সূচক (বি আই) এ পরিমাপ করা হয়। ডিএনসিসির ৩২ নং ওয়ার্ডে বি আই স্কোর ২৩ রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে ডিএনসিসি ৪৮ নং ওয়ার্ডে বি আই ২০ রেকর্ড করা হয়েছে। ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত সংখ্যক র‌্যাপিড টেস্টিং কিট রয়েছে উল্লেখ করে ডা. নাজমুল জনগণকে অনুরোধ করেন, এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরির ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য কোনো স্থানে পানি জমিয়ে না রেখে, বাসাবাড়ির চারপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখার জন্য।
এদিকে এডিস মশা নিধনে খাল ও জলাশয়ে থাকা কচুরিপানা এবং ভাসমান ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করতে জার্মানি থেকে অত্যাধুনিক মেশিন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। গেল মাসে অনলাইনে আয়োজিত এডিস মশা নিধন এবং ডেঙ্গু সংক্রমণ প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, ঢাকাসহ সব সিটি কর্পোরেশনের খাল ও জলাশয় থেকে কচুরিপানা এবং অন্যান্য ভাসমান পদার্থ পরিষ্কার করে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস ও পানির প্রবাহ ঠিক রাখার লক্ষ্যে এই মেশিন আমদানি করা হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, চীন, জাপান, কোরিয়া এবং ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এই মেশিনগুলো চালু রয়েছে। সবগুলো দেশের মেশিন যাচাই-বাছাই করে জার্মানি থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই মেশিন কচুরিপানাসহ ভাসমান পদার্থ, এমনকি পানির এক মিটার নিচের ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করতেও সক্ষম। চলমান সময়কে এডিস মশার প্রজননের উর্বর সময় উল্লেখ করে মো. তাজুল ইসলাম বলেন, এডিস মশা স্বচ্ছ পানিতে জন্মে থাকে তাই বাসাবাড়িতে কোথাও পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এ ব্যাপারে অনেক সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে। এরপরও যারা এডিস মশার প্রজননে ভূমিকা রাখবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাজুল ইসলাম জানান, এডিস মশা নিধনে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ওষুধ বিশেষ করে এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় এডিস মশার পরিমাণ বেশি। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জরিপেও রাজধানীর অন্তত ত্রিশটি স্থানে মশার ভয়াবহতার কথা বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে নতুন মেয়রদের প্রধান কাজ হবে, এসব স্থানগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো রাজধানীতেই মশার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। ওয়ার্ডভিত্তিক এডিস মশা নিধনে টিম গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও পরিচ্ছন্ন সিটি গড়ার কার্যক্রমে যুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, মশা নির্মূল কিন্তু হঠাৎ করে সম্ভব নয়। এটা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত চারজন কর্মীকে ডেঙ্গু নিধনে কাজে লাগাতে হবে। যারা প্রতি মাসে মেয়র বরাবর রিপোর্ট দেবেন।
মাঝে বিরতি দিয়ে আবারো লকডাউনে যাচ্ছে দেশ। ফলে কিছুদিন নগরবাসীকে গৃহবন্দী থাকতে হবে। সবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে করোনা। তাই বাড়ির আশপাশ পারিষ্কার রাখার বিষয়ে উদাসীন সবাই। অনেকেই তাকিয়ে আছেন সিটি করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে। অথচ নিজের যেটুকু দায়িত্ব সেটাতেও তারা অবহেলা করছেন। গেল বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও দুই সিটি করপোরেশন মেয়রসহ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘মশার গান আমি শুনতে চাই না। মশা মারতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে করোনার পাশাপাশি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ডেঙ্গুুর মাত্রা গেল বছর থেকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ডেঙ্গুর প্রকোপ জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ