বৃহস্পতিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

আলোচনায় মাদক কারবারীদের নজরদারীতে মোবাইলফোন ট্র্যাকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। দেশে অবৈধ মাদকের প্রবাহ রোধ, ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহার্য বৈধ মাদকের শুল্ক আদায় সাপেক্ষে আমদানি, পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মাদকদ্রব্যের সঠিক পরীক্ষণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ,  মাদকদ্রব্যের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরোধ কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে নিবিড় কর্ম-সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অধিদফতরের  প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু প্রবাদ বাক্যের সেই ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ এর মতো এই অধিদফতর চলেছে যুগের পর যুগ। এখন কেমন চলছে এই অধিদফতর তা নিয়েই পর্ব ভিত্তিক আয়োজনের আজ চতুর্থ পর্ব :
তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : মাদক কারবারে জড়িতরা  মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের ব্যবসার তথ্য আদান-প্রদান করে থাকেন। তাদের শনাক্ত করতে আধুনিক বিশ্বের মতো মোবাইল ট্র্যাকার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতর। ক্রিমিনাল ডাটায় এবং মাঠ পর্যায়ে কমকর্তাদের তালিকায় যেসব ব্যবসায়ীর নাম থাকবে তাদের আধুনিক মোবাইল ট্র্যাকার দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের অবস্থান নির্ধারণ এবং তাদের আইনের আওতায় আনার জন্যই মোবাইল ট্র্যাকার এর প্রয়োজন মনে করছে সংস্থাটি।
সংস্থাটির মতে , মাদক কারবারিদের নজরদারি ও গ্রেফতার করতে মোবাইলফোন ট্র্যাকার চেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর বলে শুরুতেই এই দাবি ‘না’ করে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ট্র্যাকারের দাবি প্রত্যাখ্যাত হলেও মাদক কারবারিদের নজরদারি ও তথ্য পেতে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) এ একজন কর্মকর্তা দেওয়ার সুযোগ পাবে বলে জানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় । কিন্তু সংস্থাটি তাদের জন্য মোবাইল ফোন ট্র্যাকারের বিষয়টি চুড়ান্ত করতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সভায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, ‘মাদকপাচারকারীদের অবস্থান নিশ্চিত এবং গতিবিধি ট্রেস করার জন্য মোবাইলে ফোন ট্র্যাকার প্রয়োজন।’ তবে গত ডিসেম্বরের এই দাবির বিষয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের মহাপরিচালকের দাবির বিষয়টিকে স্পর্শকাতর বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বৈঠকে বলেন, ‘মোবাইলফোন ট্র্যাকিং একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ফলে এ মুহূর্তে ট্র্যাকার কেনা সমীচিন হবে না। তবে তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে মাদক কারবারিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও গ্রেফতারের জন্য এনটিএমসি’র কার্যালয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।’
জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) হলো বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অধীন একটি অধিদফতর। সংস্থাটি সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে টেলিযোগাযোগ সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থাসমূহকে যোগাযোগ সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের মহাপরিচালকের মোবাইল ট্র্যাকারের দাবির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এনটিএমসিতে একজন কর্মকর্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তাকে সেখানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হবে।
দেশে পুলিশসহ বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের গ্রেফতারে প্রথাগত সোর্সের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক মোবাইলফোন ট্র্যাকিংয়ের সহায়তা নেয়। যদিও এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও ব্যক্তিদের অভিযোগ রয়েছে। মূলত অপরাধীদের অবস্থান নিশ্চিত হতে মোবাইলফোন ট্র্যাক করা হয়। তবে এর অপপ্রয়োগ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে আসছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, ‘কোনও দেশের সরকারি সংস্থা সাধারণ মানুষকে ট্র্যাক করতে পারে না। তবে বিভিন্ন দেশ গুরুতর ও প্রকৃত অপরাধ দমন করতে প্রায়শই মোবাইলফোন ট্র্যাকিং করে অপরাধীদের গ্রেফতার করে। বাংলাদেশেও বেশ কয়েকটি মামলার আসামিদের এভাবে গ্রেফতার করতে দেখা গেছে। তবে ট্র্যাকিংয়ের একটি সীমা থাকতে হবে। ট্র্যাকিং অপরাধ দমনের জন্য উপকারী, তবে এটি অবশ্যই আইনের মধ্যে থেকেই করতে হবে। জাতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।’ ট্র্যাকিংয়ের সীমাহীন ব্যবহারে গণমানুষের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
জানতে চাইলে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, মোবাইল ফোন ট্র্যাকার পেলে মাদক কারবারীসহ সংশ্লিষ্টদের খুঁজে পেতে সহজ হবে। এর মাধ্যমে অভিযান চালানোও সহজ হবে। তিনি বলেন, অধিদফতরের কার্যক্রমকে আধুনীকায়ন করতে এই ফোন ট্র্যাকার চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কে বিষয়টির গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি বিবেচনা করছে। চুড়ান্ত হতে এখন আলাপ আলোচনা চলছে বলেও জানান অদিদফতরের মহাপরিচালক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ