রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

ক্লাব মানেই কি অসামাজিক কর্মকাণ্ড!

মোহাম্মদ আবু নোমান : ক্লাব মানেই অসামাজিক কর্মকাণ্ডের জায়গা? বাস্তবেও কি তাই? এমন একটি নেতিবাচক ধারণা মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ভালো কিছু নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের বন্ধুপ্রতীম ও প্রথমদিককার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া দেশ সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর ঘুরে ঘুরে ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করাকালে রাস্তার মোড়ে মোড়ে যুবকদের আড্ডা ও গল্প গুজবরত দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এসব ছেলেরা এখানে কী করছে? তাকে যখন বুঝিয়ে বলা হলো, ওরা আড্ডা ও গল্প গুজব করছে। তখন তিনি আশ্চর্য হয়ে বলেন, কেন? এ সময়তো ওদের খেলার মাঠে অথবা ক্লাবে, নয়তো বইয়ের টেবিলে থাকার কথা। পৃথিবীর সমস্ত সভ্য দেশেই ক্লাব সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু ক্লাব সংস্কৃতির দ্বারা সেবা, জ্ঞান ও সুস্থ বিনোদনের মানসিকতা বাংলাদেশে কখনোই গড়ে উঠেনি।
আমাদের দেশেও বিশেষত শহরে ৭০ থেকে ৯০ এর দশকে খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোর কর্মকাণ্ড যতোটুকু আমরা দেখেছি, তাও ছিলো দাঙ্গা-সংঘাতে ভরপুর। বর্তমানেও ইউরোপে ফুটবল সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোতে লা-লিগা, কোপা আমেরিকা অথবা চ্যাম্পিয়নলীগগুলো ছাড়াও যে খেলাগুলো হয়, তার তাপে পুরো বিশ্ব গরম থাকে। সে খেলায় কোন পক্ষের জয়-পরাজয় নিয়ে সাপোর্টারদের মধ্যে আমরা কোনো দিন সংঘাতের সংবাদ পাইনি। বাংলাদেশের খেলাপ্রেমিরা রাত জেগে সেসব খেলো দেখে থাকেন। অথচ আমাদের দেশে যখনই আবাহনী, মোহামেডান ক্লাবগুলোর খেলা হয়েছে, তা লীগের প্রথম রাউন্ডের খেলা হোক বা সেমিফাইনাল অথবা ফাইনাল খেলা। খেলায় যে পক্ষই হারুক বা জিতুক খেলা শেষেই শুরু হয়েছে জ্বালাও, পোড়াও, গাড়ি ভাঙচুর, সংঘাত-সংঘর্ষ। স্টেডিয়ামে খেলা মানেই অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন, রায়ট কার, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপসহ এক ভীতিকর অবস্থা! পরবর্তীতে খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলো তার মান-মর্যাদা হারিয়ে দখলে গেছে ক্যাসিনো সম্রাটদের, যা আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি।
এতো গেলো খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোর হালহকিকত। এর বাইরে বর্তমানে শহরে কতগুলো ক্লাব চলছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে রাতের আঁধারে মাদক আর নারী নিয়ে মনোরঞ্জনের জন্য গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লাব, শিসা বার ও ডিজে পার্টি। যেখানে থাকে গানের তালে তালে অশ্লীল নৃত্য ও মাদক-ইয়াবার নীল নেশায় অবাধ যৌনতার আনন্দ বাজার। রূপের হাটে রঙের দোকানের ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিনোদনের জন্য সেখানে কাগজের মতো টাকা উড়ে। চিত্র নায়িকা পরীমনিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলায় গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় আবারও ডিজে পার্টির নামটি পাদপ্রদীপের আলোচনায় চলে এসেছে। যে প্রসঙ্গে গত ১৭ জুন জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমাদের ঢাকা শহরে বিভিন্ন ক্লাব আছে, সে সব ক্লাবে আসলে কি হয়- আমরা জানি না। আমরা প্রায়ই দেখি যে এখানে ক্লাবে জুয়া খেলা হয়, মদ খাওয়া হয়। আমরা শুনি, বিভিন্ন ক্লাবে মেম্বার হতে নাকি ১৫, ৩০ বা ৫০ লাখ টাকা লাগে। এই ৫০ লাখ বা ১ কোটি টাকা দিয়ে কারা মেম্বার হয়? এ সমস্ত লোকের আয়ের উৎস কী? বিশেষ করে অনেক সরকারি কর্মকর্তাও নাকি এসব ক্লাবে মেম্বার হয়, তারা টাকা কই পায়, এসব কীভাবে হচ্ছে?’ বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদ বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, সব থানার পুলিশ এসব ক্লাব থেকে টাকা নেয়। ক্লাবে মদের ব্যবসার সঙ্গে সরকারি লোক জড়িত।’ আওয়ামী লীগের শেখ ফজলুল করিম সেলিম বাংলাদেশে মদ ও জুয়ার লাইসেন্স দেয়ার জন্য বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে দায়ী করে বলেন, ‘এটা তো বোট ক্লাব, জিয়াউর রহমান স্টিমার ক্লাব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মদ-জুয়ার লাইসেন্স বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান আবার তা চালু করেছিলেন।’
আমরা মনে করি, সমস্যার সমাধান না করে একে অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ালে পাল্লায় খারাপের সংখ্যাই ভারি হবে। মানলাম জিয়াউর রহমান চালু করেছে। আওয়ামী লীগের কেউ কী এসব ক্লাবের সদস্য নেই। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা সেগুলার ফলোয়ার কেন? তারা তাদের আদর্শকে ডুবিয়ে কিভাবে ক্লাবগুলোর সদস্য হলো? পাপিয়ার কথা দেশবাসী ভুলে যায়নি? অভিজাত রেস্টুরেন্ট, বার, ক্লাবে পাপিয়া বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদের মনের খোরাক মেটাতে উঠতি বয়সী তরুণীদের পাঠাতো। প্রতিরাতে সে বিভিন্ন বারে লাখ লাখ টাকা বিল দিতেন, এ খবর আমরা শুনেছি।
মুনিয়া, পাপিয়া, পরীমনি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। বিভিন্ন মিডিয়ায় নায়িকা পরীমনির কান্না সবাই দেখেছে। দেশবাসীকে বোকা বানানোর সুযোগ নেই। আজকাল কারো অজানা নয় যে, দেনা-পাওনায় সমস্যা হলে, বছরের পর বছর স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক রেখে বা ভালোবাসায় ভাঙন ধরলে ধর্ষণের মামলা করা হয়। পরীমনি কান্নাজরিত কণ্ঠে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘মা’ ডেকে বিচার চেয়েছেন; কিন্তু গভীর রাতে তিনি যখন ক্লাবে গেলেন তখন ‘মা’কে বলে গিয়েছিলেন কী?
পরীমনিকে কেউ ভুলভাল বুঝিয়ে বা নিজেই ভুল করে রাস্তা ভুলে নীশিরাতে বোটক্লাবে যাননি; অথবা কেউ জোর করে তার বনানীর বাসা থেকে তুলে নিয়েও যায়নি। পরীমনি কেন কোন কাজে গিয়েছিল তা আমরা জানি না। তবে সিনেমার কাজে তিনি গিয়েছেন, তা তিনি অঝোর কান্নায়ও বলেননি। পরীমনিকে সেদিনের সব ঘটনা খুলে বলা উচিত। আসলে বোটক্লাবে সেদিন কী ঘটেছে? আর কী ঘটলে তিনি কাঁদতেন না!
বাস্তব কাহিনী ঘিরেই সিনেমা তৈরি হয়ে থাকে। যাতে থাকে দর্শকদের জন্য শিক্ষণীয়। পরীমনির মতো টপ স্টার সেলিব্রিটিরা যখন সিনেমার কাহিনীতে অপহৃত বা রেপ হয়ে যান, তখন ‘নায়ক’ এসে তাদের সন্ত্রাসী বা গুণ্ডার হাত থেকে রক্ষা করে থাকেন। বোটক্লাবে গভীর রাতে তার সাথে যথোপযুক্ত রক্ষক বা নায়ক আমরা দেখিনি। তাহলে তার পরবর্তী কাহিনীতো ইজ্জত ও সম্মান নষ্ট হওয়ার সাথেই এগিয়ে যাবে! নারীরা যখন নিজেই নিজের স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন করবে; কতিপয় মানুষরূপি পশু তখন তার ভেতরের পশুত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে, আশুলিয়ায় বোট ক্লাবই তার প্রমাণ।
রাত বিরাতে একটা ক্লাবে পরীমনি কতটা সেইফ? সে নিজেই বলেছেন, ক্লাবে অন্যরা মদ্যপ ছিলেন, আর তাকে জোর করে মদ খাওয়াতে চেয়েছিলো। গভীর রাতে মদ খাওয়া মানুষের সামনে কোন সাহসে গেলেন পরীমনি? তাও আবার মদ্যপানরত ব্যক্তির সাথে সাক্ষাতে এর থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না কী? কথায়ই বলে, ‘পাগলে কিনা বলে... মাতালে কি না করে?’ পরীর ভাষ্যমতে তার সাথে যা কিছু ঘটেছে, এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় কী?
৭০ থেকে ৯০ দশকের নায়িকারা যতোটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো, আজকের পরীমনিরা তার ধারে কাছেও আসতে পারবেন কী? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক সময় শাবানা, ববিতা, কবরী, রোজিনা, চম্পা, মৌসুমির মতো কালজয়ী অভিনেত্রীগণ অনেক দাপটের সাথে অভিনয় করেছেন। এ সব অভিনেত্রীদের কোন বার বা নাইট ক্লাবে গিয়ে আনন্দ ফুর্তি করার খবর আমরা পাইনি। সর্বসাধারণ সপরিবারে তাদের সিনেমা দেখেছেন। এখনকার চলচিত্র মানে অশ্লীলতা ছড়ানো। যে কারণে মানুষ সিনেমা হলে যান না। ওই সব অভিনেত্রীরা জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় বিয়ে করে সংসার করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন, আবার সেই চলচ্চিত্রেও দাপটের সাথে অভিনয় করে গেছেন। তাদের বুঝ-ব্যবস্থা, পোশাক-আশাক, চলন-বলন অনেক নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে বর্তমানের নায়িকাদের খাজনা থেকে বাজনা বেশি! সিনেমা করা থেকে সিনেমার বাহিরে এদের লাইফ স্টাইল দেখে যে কোন মানুষের অবাক হয়ে যাবার কথা।
বর্তমান প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কথিত তারকারা (দুই/একজন ছাড়া) সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কি ভূমিকা রাখছে তা প্রশ্নের সম্মুখীন। কী অর্জন করবে বোট ক্লাবের মতো জায়গা থেকে ভবিষ্যত প্রজন্ম? বিনয় ভাব মানে দুর্বলতা, শিক্ষিত হওয়া এখন আর গৌরব নয়, অহংকার আর টাকা উপার্জন, নারী মানে যৌনতা এসব সাধারণ জ্ঞান নিয়ে আমাদের সন্তানেরা বড় হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন জাগে বর্তমান নায়ীকাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের উৎস কী? কিছুদিন পরপর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এরা ভাইরাল হয় সংসার গড়ার আর ভাঙনের খবর দিয়ে। উত্তরার বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনায় পরীমনিকেই দোষারোপ করছেন খোদ নারী উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, জয়যাত্রা টেলিভিশনের চেয়ারম্যান এবং বোটক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীর।
দুর্নীতি করে হাতে গোনা কিছু মানুষ আঙ্গুল ফুলে বট গাছ বনে যাবার ফলে ঢাকা এখন মাদক কারবারি, বেহায়া ও বেলেল্লাপনাসহ নরকের নগরীতে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রত্যেকটি মানুষ মাথাপিছু প্রায় ১ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত। এহেন পরিস্থিতিতে ৫০ লাখের অধিক টাকা দিয়ে যারা ক্লাবের সদস্য হয়ে প্রতিদিন গ্যালনের পর গ্যালন মদ পান করে এবং বেহায়া-বেলেল্লাপনা করে সমাজ, রাষ্ট্রে বিষবাষ্প ছড়ায় তাদের অতীত ও বর্তমান অর্থের উৎস খুঁজে বের করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় থাকার পরেও প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে বিনা বাধায় মদ বিক্রয়, মদ পান, অভিজাত এলাকায় ডিজে পার্টি, সিসা বারের আয়োজন, ফ্ল্যাটে অবাধে দেহব্যবসার বিস্তারের খবর দেশবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ঢাকায় মদ্যপদের আস্তানা, অশ্লীলতায় ভরপুর সকল ক্লাব, ডিজে পার্টি নিষিদ্ধ করাসহ দেহব্যবসা বন্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পছন্দনীয় না হলেও পরীমনির পেশাগত ট্র্যাকে নাইটক্লাবে আড্ডা একটি স্বাভাবিক ঘটনা! কিন্তু জবরদস্তি হেনস্তা, বলপ্রয়োগ, রেপ চেষ্টা এসব তো অরাজকতা। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আমরা আশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ