শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের জন্য ২ হাজার ৪শত ৬৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। এবার উন্নয়ন অনুদান খাতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।গতকাল রবিবার (২৭ জুন) দুপুরে থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম (টিআইসি) মিলনায়তনে চসিকের বর্তমান (ষষ্ঠ) পর্ষদের মেয়র হিসেবে নিজের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন তিনি। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলমের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বাজেট বিবরণী উপস্থাপন করেন অর্থ ও সংস্থাপন বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মো. ইসমাইল।উপস্থিত ছিলেন প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটন, মো. গিয়াস উদ্দিন ও আফরোজা কালাম, চসিক সচিব খালেদ মাহমুদ, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক, অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির ও ওয়ার্ড কাউন্সিলররা।
বাজেট বক্তৃতায় মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, নগরবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশা ও চট্টগ্রাম মহানগরীকে পরিবেশগত, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও বসবাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করার স্বপ্ন নিয়ে বাজেট অধিবেশনে  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের ১ হাজার ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেট ও ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের ২ হাজার ৪ শত ৬৩ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নগরবাসীর সামনে উপস্থাপন করছি।তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৯৮৮ সালের সরকার অনুমোদিত ৩১৮০টি পদের জনবল কাঠামো রয়েছে। ১৯৮৮ সালের অনুমোদিত একটি জনবল কাঠামো থাকলেও তার বিপরীতে কোনো নিয়োগবিধি না থাকায় নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। দীর্ঘ প্রায় ৩১ বছর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০১৯ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি অতিরিক্ত ১০৪৬টি পদ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। ষাট লক্ষ নগরবাসীকে যথাযথ নাগরিকসেবা প্রদানে বিভিন্ন সময়ে অস্থায়ীভিত্তিতে লোক নিয়োগ করে কর্পোরেশনের বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মপরিধি বর্তমানে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদার আলোকে ৯৬০৪ জনের একটি পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ই-নথি ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই)-এর সহযোগিতায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অর্গানোগ্রাম অনুসারে নথি ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অ্যাকাউন্ট (ই-নথি অ্যাকাউন্ট) খোলা হয়েছে। সচিবালয় বিভাগের বেশ কিছু ফাইল ই-নথির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ই-নথি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালাও চলমান রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সকল বিভাগের নথি, ই-নথি সিস্টেমের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। এ ছাড়াও নগরে ৪১টি ওয়ার্ড কার্যালয় হতে প্রদত্ত সকল ধরনের সনদপত্র/প্রত্যয়নপত্র অনলাইনের মাধ্যমে প্রদানের ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়েছে। রাজস্ব এবং হিসাব বিভাগের সকল ধরনের কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের আরবান পাবলিক এন্ড এনভায়রনমেন্টাল হেলথ কেয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের (টচঊঐঈউচ) মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ সকল ধরনের ফি/চার্জ অনলাইনে গ্রহণের নিমিত্তে সফ্টওয়্যার প্রণয়ন, ব্যাঙ্কের সাথে সমঝোতা চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে এবং সফ্টওয়্যারটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ভেন্ডার নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থ বছরেই পৌরকর ও ট্রেড লাইসেন্স শতভাগ অনলাইনে আদায়/প্রদান করা সম্ভব হবে।   চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের   হোল্ডিং মালিক ও ব্যবসায়ীদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি, ভূমি হস্তান্তর কর, রিকশা লাইসেন্স ফি, বিজ্ঞাপন কর, মার্কেট-এর দোকানভাড়া প্রভৃতি চলতি আর্থিক সালের মধ্যে “অনলাইন ব্যাংকিং”-এর মাধ্যমে আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন,  জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত ৪ বছরে নগরীর প্রতিটি সড়কের পাশে পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬ শত ১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প সিডিএ কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে। যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সরকারের প্রকল্প সহায়তায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। আশা করা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান পরিবর্তন হবে।বিওটি-এর আওতায় প্রকল্পগ্রহণ করা হবেÑ  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প; চট্টগ্রাম মহানগরীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প; ঠাণ্ডাছড়ি পার্ক উন্নয়ন;  চট্টগ্রাম মহানগরীর আউটার রিং রোডের পাশে সী সাইটে ওশান পার্ক ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ। ডিপিপি : প্রক্রিয়াধীন রয়েছেÑ  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়ন;  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুট ওভারব্রিজ ও মেকানিক্যাল পার্কিং স্থাপন; চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ওয়ার্ড অফিসসমূহ সংস্কার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক প্রকল্প; * চট্টগ্রাম মহানগরীতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ,  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় স্বাধীনতা স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহের সংরক্ষণ প্রকল্প,আগ্রাবাদ ডেবা ও পাহাড়তলী জোড় দিঘির সংষ্কার। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসমূহÑ ১। আধুনিক নগর ভবননির্মাণ; চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্মার্ট সিটি প্রকল্প, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এয়ারপোর্ট রোড সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনির্মাণ;  সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবননির্মাণ;  মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশমতে প্রস্তাবিত নতুন সড়ক নির্মাণ;  মুরাদপুর, ঝাউতলা, অক্সিজেন ও আকবর শাহ রেলক্রসিং-এর ওপর ওভার পাস নির্মাণ;  ঢাকামুখী, কক্সবাজারমুখী ও হাটহাজারীমুখী বাস টার্মিনাল নির্মাণ; ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ;  নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফুট ওভার ব্রিজ ও ওভারপাস/আন্ডারপাস নির্মাণ;  সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব জায়গায় স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ;  নগরীর কাঁচা বাজারগুলো আধুনিকায়ন; ১২। চান্দগাঁও এলাকায় আধুনিক স্লটার হাউস-নির্মাণ; সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন বর্তমান বাকলিয়া স্টেডিয়ামে স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ;  ওয়ার্ডভিত্তিক খেলার মাঠ. শিশু পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার, মিলনায়তন, ব্যায়ামাগার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ;  চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে আধুনিক কনভেনশন হল নির্মাণ;নগরীর প্রধান সড়কসমূহের ফুটপাথ, মিডিয়ান, রাউন্ড-অ্যাবাউট, আধুনিকীকরণ এবং লেন পার্কিং ও জেব্রা ক্রসিংসহ উন্নয়ন; নগরীর কাঁচা সড়কসমূহ পাকাকরণ;  হকার পুনর্বাসন প্রকল্প।
তিনি বলেন, আমার দায়িত্বপালনকালে সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব আয়ের উৎসগুলোর পরিধি বাড়াব এবং রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়াকে সহজতর করব যাতে নগরবাসী কর প্রদানে উৎসাহিত হয়। চট্টগ্রাম নগরীতে যাঁরা আদিবাসী তাঁদের ওপর হোল্ডিং ট্যাক্সসহ কোনো ধরনের অযৌক্তিক কর আরোপ করা হবে না। তবে কর পরিশোধের ক্ষেত্রে সকলের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সহমত পোষণ করে সিদ্ধান্তগ্রহণ করা হবে।  বর্তমান সময়ে কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের সর্বত্র ভোগাচ্ছে। জনজীবন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে অত্র কর্পোরেশনে জরুরিভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে লালদিঘিপাড়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও লাইব্রেরি ভবনের ২য় ও ৩য়-তলায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এখান থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, ঔষধ, খাবার এবং অক্সিজেন সাপোর্ট ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে ২,৫৩,৫৭২ জন নিবন্ধনকৃত নগরবাসীকে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই টিকার প্রথম ডোজ প্রদান করা হয়েছে। ২য় ডোজ প্রদানের ক্ষেত্রে টিকার মজুত ঘাটতির কারণে আপাতত সীমিত আকারে দেয়া হয়েছে। এ-পর্যন্ত ১,৮৩,৫৯৮ জনকে ২য় ডোজ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্র্যাকের সাথে যৌথ উদ্যোগে করোনা শনাক্তের ৪টি বুথে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। এরপরেও ৪১টি ওয়ার্ডে ও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমের স্থানে করোনা প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষাসামগ্রী বুথ স্থাপন করা হয়েছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে মাস্ক, হ্যান্ড সেনিটাইজারসহ সকল সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ