শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মধ্যরাতেও গ্রামের দিকে ছুটছে মানুষ

ইবরাহীম খলিল : কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয়ার পর শনিবার ভোর থেকেই দলে দলে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। ইতোমধ্যেই ত্রিশে জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাতটি জেলায় লকডাউন কার্যকর থাকায় দূরপাল্লার বাস ঢাকায় আসা যাওয়া না করতে পারলেও বন্ধ করা যায়নি ঢাকামুখী এবং ঢাকা থেকে বের হওয়া মানুষের ঢল। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার সারাদিন এবং রাতে সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে গ্রামের দিকে ছুটছে মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউনে জরুরি পরিষেবা ছাড়া গাড়ির চাকা বন্ধ থাকার নির্দেশনার কারণে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। একারণে গত দুইদিন ধরে দিনে লুকোচুরি আর রাতের বেলায় অবাধে চলছে যানবাহন। সব বাধা  মারিয়ে গ্রামের দিকে ছুটছে মানুষ। যাতায়াতকারীরা বলছেন, রাতে কার্যত মহাসড়কে প্রশাসনের চেকপোস্টের নজরদারি কম। ফলে ছোট বড় যানবাহনের অবাধ বিচরণ দেখা যায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম এই সড়ক পথে। একই অবস্থা রাজধানী ছাড়ার অন্যান্য পয়েন্টেও।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে প্রাইভেটকার, মাক্রোবাস, লোকাল বাস, তিন চাকার ছোট যানবাহন, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল আর ট্রাকের সারিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সড়ক পথ। দিনের বেলায় মহাসড়কে বিভিন্ন পয়েন্টে প্রশাসনের চেকপোস্ট থাকায় ওইসব যানবাহন চলাচল করতে না পারায় রাতে অবাধে চলাচল করে। কারণ রাতে রোড ঘাটে প্রশাসনের নজরদারি কম থাকার সুযোগে মানুষজন চলাচলের জন্য রাত বেছে নিয়েছে।
রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ভেদ করে যানবাহনগুলো যাচ্ছে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে। ফেরি পার হয়ে মানুষজন ও যানবাহনগুলো যাচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চেলের বিভিন্ন জেলায়। ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে রাতে পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ বেশি থাকায় ১৫টি ফেরি সচল রাখা হয়েছে। সেসব ফেরিতে জরুরি পরিষেবার যানবাহন ছাড়াও প্রচুর যাত্রী পারাপার  হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রোববার সকাল থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে মানুষজন বিভিন্ন পন্থায় পাটুরিয়া অভিমুখে যাচ্ছিলেন। মহাসড়কের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পুলিশের চেকপোস্ট থাকায় মানুষজনকে ভেঙে ভেঙে যেতে হয়। পায়ে হেঁটে ও তিন চাকার যানবাহনের পাশাপাশি ভাড়ায় চালিক মোটরসাইকেলও ব্যবহার করছেন তারা। রোডে ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, রিকসা, ভ্যান, অটোরিকশা আর ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের অবাধ বিচরণ সকাল থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। লকডাউনের সুযোগে ওইসব যানবাহন এখন রোডের রাজা হয়ে গেছে বলে মনে করছেন সাধারণ যাত্রীরা। কারণ ঢাকা থেকে পাটুরিয়া ঘাট কিংবা মানিকগঞ্জ বাসসট্যান্ড পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় যাতায়াত করতে পারলেও লকডাউনে মানুষজেনের ভাড়া গুনতে হচ্ছে হাজার টাকা পর্যন্ত।
সাধারণত পাটুরিয়া ঘাট থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে ঢাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে এক হাজার থেকে পনেরশ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রাইভেটকারে ৫-৬ জন করে মানুষ উঠিয়ে তাদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার ওপরে। এভাবেই লকডাউনের প্রতিদিন মানুষজন বাড়তি ভাড়া দিয়ে এবং ভোগান্তি মাথায় নিয়ে যে যার গন্তব্যে যাচেছন।
লকডাউনের খবরে গাবতলীতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী তৎপর। যানবাহন চলাচলও বন্ধ। তবে আমিন বাজার ব্রিজ পার হলেই ভিন্ন চিত্র। হাজার হাজার মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। সেখানে সহজেই মিলছে কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল।
ঢাকা ত্যাগের আগের রুট আব্দুল্লাহপুর কোনো গণপরিবহন ঢাকা ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না এবং ঢাকার বাইরেও যেতে পারছে না। তবে ব্যক্তিগত গাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানের মতো পরিহনের যাতায়াত স্বাভাবিক রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, অধিকাংশ মানুষের হাতেই ভারি ব্যাগ রয়েছে। এতে বোঝা যায় তারা অনেকে ঢাকা ছাড়ছেন, আবার অনেকে ঢাকায় প্রবেশ করছেন। নানা উপায়ে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত এসে ফের পরিবহন বদল করে যার যার গন্তব্যে ফিরছেন।
রবিউল আহমেদ কাঁধে একটি ও হাতে আরেকটি ব্যাগ নিয়ে টঙ্গী থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে ঢাকার পথে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, নেত্রোকোনায় গিয়েছিলাম। এখন ঢাকায় ফিরছি। কারণ, পরিবার ঢাকার ধানমন্ডির জিগাতলায় থাকে। আজ না ফিরতে পারলে আটকে যেতে হবে। তাই লকডাউনের আগেই ফিরতে হলো।
আক্কাস, বিমানবন্দর এলাকায় পথে পথে হকারি করেন। ঢাকা ছেড়ে টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, লকডাউনে আমরা বাইরে থাকতে পারুম না। তাই বাড়িতে যাচ্ছি। টেলিভিশনে শুনছি, এবার নাকি অনেক কড়া থাকবো পুলিশ। তাই ব্যবসা করতে পারমু না, ঢাকায় থাইকা কি করমু? দেখা গেছে নিন্ম আয়ের মানুষ তুলনামূলক বেশি হারে ঢাকা ছাড়ছেন। লকডাউন শুরুর একদিন আগে আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ঢাকাগামী ও ঢাকা ত্যাগ করা মানুষের পদচারণায়  মুখর হয়ে উঠেছে।
এর আগে, জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি ১৪ দিনের সম্পূর্ণ শাটডাউন দেয়ার সুপারিশ করেছিল। কর্তৃপক্ষ বলেছে জরুরি পণ্যবাহী ব্যতীত সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে এবং শুধু অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। এর বাইরে জরুরি কারণ ছাড়া বাড়ির বাইরে কেউ বের হতে পারবে না বলে জানানো হয়েছে। গণমাধ্যম এর আওতাবহির্ভূত থাকবে।
রাতে এ ঘোষণার পর শনিবার ভোর থেকেই ঢাকা ছাড়ার হিড়িক শুরু হয় এবং ঢাকার কাছাকাছি কিছু এলাকায় ছোট বাসে করে গিয়ে আবার জেলায় প্রবেশের আগে গিয়ে নামছে মানুষ। সেখান থেকে হেঁটে জেলার সীমান্ত পার হয়ে পিকআপ ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা কিংবা ভ্যানগাড়ির মতো স্থানীয় পরিবহন দিয়ে ফেরিঘাটে পৌঁছাচ্ছে মানুষ।
লকডাউনের কারণে জেলার প্রবেশমুখসহ নানা জায়গায় চেকপোস্ট থাকলেও মানুষজন হেঁটে চেকপোস্ট এলাকা অতিক্রম করে অন্য যানবাহন নিয়ে ছুটছে ফেরিঘাটের দিকে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় শিমুলিয়া ফেরিঘাট দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত একুশটি জেলার মানুষজন যাতায়াত করে।
তবে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটের ডিজিএম এটিএম জিল্লুর রহমান বলছেন, পাটুরিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে এবং আজ দিনে ১৩/১৪টি ফেরি দিয়ে মানুষ পারাপার হচ্ছে। পাটুরিয়া ফেরিঘাট মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আওতাধীন এলাকা।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ার এবং ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে লকডাউন বা বিধিনিষেধ আরোপ করা কার্যকর আছে যা চলার কথা আছে ত্রিশে জুন মধ্যরাত পর্যন্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ