মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ এনজিও’র মাধ্যমে বিতরণের তাগিদ

স্টাফ রিপোর্টার: করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শিল্প খাতের জন্য সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ সরাসরি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে না দিয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) মাধ্যমে এই অর্থ বিতরণের পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।
গতকাল শনিবার ‘দ্য ন্যাশনাল বাজেট ২০২১-২২: প্রাইভেট সেক্টর পারসপেক্টিভ’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধে এবং বক্তাদের বক্তব্যে এমন অভিমত উঠে আসে। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) যৌথভাবে এই ওয়েবিনার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. তৌফিক ইসলাম খান। সঞ্চালনা করেন আইবিএফবি প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশীদ। আরও বক্তব্য রাখেন ভাইস প্রেসিডেন্ট লুৎফুন নেছা সাউদিয়া খান। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে এম এস সিদ্দিকী, হাফিজুর রহমান খান, ড. হোসনে আরা, ড. আলী আফজালসহ অন্যরা।
কৃষিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ অভিহিত করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কৃষককে বাদ দিয়ে কিছু চিন্তা করতে পারে না। কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া আমাদের কৃষি খাতে মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে অনেক। এদের বাদ দেওয়া যাবে না। এদের সঙ্গে নিয়েই কিভাবে পথচলা যায়, সেটি ভাবতে হবে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। অর্থনীতির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বেসরকারি খাতের হাতে। তাই তাদের সুযোগ-সুবিধার দিকটি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মূল প্রবন্ধে তৌফিক ইসলাম খান বলেন, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে মনিটরিংয়ের জন্য কমিটি গঠন করা দরকার। সেই সঙ্গে প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে, যেন প্রণোদনা কার জন্য এবং কিভাবে পেতে পারেন, সেটি সবাই জানতে পারে। আগমী অর্থবছরের বাজেটে কোভিড-১৯ বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ ওই অর্থে বাড়ানো হয়নি। শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়লেও সেটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে। বেশিরভাগ বরাদ্দ দেখা গেছে যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে। ফলে বাজেটে কাঠামো ভাঙার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি রাজস্ব ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু এডিপি বাস্তবায়ন বাড়েনি। সমাজের বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিংয়ে কর বাড়ানো হয়েছে। ফলে এই সেবা গতি হারাতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে কর আরোপ করাটা ঠিক হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রণোদনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ব্যাংকের মাধ্যমে না দিয়ে এনজিওদের মাধ্যমে দিলে বেশি কার্যকর হবে।
ড. তৌফিক আরও বলেন, এডিপিতে প্রকল্প সমাপ্ত করার হার কাক্সিক্ষত নয়। মেগা প্রকল্পের মধ্যে যেগুলো শেষের পথে, সেগুলো দ্রুত শেষ করা উচিত। আর্থিক খাতের সংস্কারগুলোতে গতি আনতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, বেসরকারি খাত সরকারের ভেতরে ঢুকে গেছে। আলাদা কিছু নেই। বাজেটে শুধু নীতি দিয়ে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে সহায়তা দিতে হবে। না হলে বাজেট হবে চৌধুরী আর মির্জাদের, গফুর ও মহেশ না কিছুই পাবে না। ব্যবসায়ীদের আগাম কর বাদ দিতে হবে। কালো টাকা বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়। এত রেমিট্যান্স কোথা থেকে আসছে, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনার সুবিধার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ অন্য কোনোভাবে বাড়ছে কি না, সেটি দেখতে হবে। রিজার্ভ ব্যবহার করতে হবে।
ড. মোহাম্মদ মাশরুর রিয়াজ বলেন, বাজেটে শুধু বরাদ্দই বড় কথা নয়, বাস্তবায়ন বাড়াতে হবে। ভ্যাকসিনের শুরুটা ভালো ছিল। ৬০-৭০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ককে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসতে না পারলে এভাবে লকডাউন দিয়ে হবে না। এতে বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা থাকাটা জরুরি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অতিরিক্ত ট্যারিফ কমাতে হবে। এফটিএ করতে হবে। রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ করতে হবে।
বি আইআইএস’র রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, বাজেটে কুটির শিল্পের জন্য কিছুই নেই। দেশের অর্থনীতি আগের জায়গায় নিতে হলে বাজেটের যে ঘাটতি ধরা হয়েছে, সেটি ঠিকই আছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো ঘাটতি অর্থায়ন। বেকার তরুণদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া যায় কি না, সেটি ভাবতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুযোর্গ ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা উচিত।
ওয়েবিনারে বক্তারা আরও বলেন, দেশীয় শিল্প রক্ষায় আরও বিশেষ উদ্যোগ থাকতে হবে। এছাড়া রফতানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পসহ ব্যাকওয়ার্ড শিল্পগুলোকে সহায়তার আওতায় আনতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে হবে। একটি ব্যবসা করতে গেলে ৩০টির মতো লাইসেন্স প্রয়োজন সেটির জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে। ইজ অব ডুয়িং বিজনেস পরিবেশ উন্নত না হলে ব্যক্তি এবং বিদিশি বিনিয়োগ আসবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ