বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান

॥ পঁয়তাল্লিশ ॥

ফুটবল, ক্রিকেট আর গান বাজনায় আটকে গেলো মন। বইখাতায় ধুলা জমছে। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কাঁকর। উড়ে আসে গানের কলি। বল বেট লাফালাফি করে মগজে। আব্বাও বিরক্ত, আম্মাও বিরক্ত। বকাঝকা করলেন আব্বা। দু’চার কথা ঝাড়লেন আম্মাও। আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ঠিকইতো আজকাল বইপত্র আর মন টানছে না। খাতার পৃষ্ঠাগুলো সাদা। ক্লাসেও ধমক টমক খাচ্ছি। স্যাররাও আমাকে নিয়ে চিন্তিত। আমি ক্লাসের ভালো ছাত্র। হঠাৎ পিছলে পড়ার কারণ খুঁজলেন স্যাররা। গত পরীক্ষার ফলাফল ভালো। সময়ের কাঁটা এমনি হাঁটলে নির্ঘাত লবডংকা। আম্মাও আওয়াজ করে ঘোষণা করলেন আর নয়। অনেক হয়েছে খেলাধুলা, ঘুরাফেরা। বছর পরীক্ষা বারান্দায় উঁকি দিচ্ছে। পরীক্ষার কথা শনুতেই কেঁপে উঠলো শরীর। স্কুলেতো যাচ্ছি আসছি। কিন্তু মন থাকে মাঠে ময়দানে। চোখে ব্যাট আর বল। ক্লাসে মন আছে। যোগ নাই। বকাঝকায় কাটলো দু’চারদিন। তারপর চূড়ান্ত ফরমান। স্কুল থেকে সোজা বাসায়। তরাপরও বাসায়। খেলাধুলা মাঠ ময়দান সব বাকসে রাখো। তালা থাকবে পরীক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত। আম্মাও আব্বার এই ঘোষণার পিছনে এসে দাঁড়ালেন একপ্রকার কোমর বেঁধে। আমার চোখ থেকে পানি ঝরছে টপটপ। ভিজছে মাটি, ভিজছে পায়ের পাতা। নসিব মন্দ, খেলা বন্ধ। লাটে উঠলো আড্ডা। দৌড়ঝাঁপ। চোখে মগজে ঘুরছে ভয়ের বাতাস। স্কুলে যাই-আসি। সময়ের প্রজাপতি উড়ছে। এরইমধ্যে এগিয়ে এলো বার্ষিক পরীক্ষা। স্যাররা ব্যতিব্যস্ত। সাথে আমরাও। পুড়ানো পড়াগুলো ঝালাই করছি। স্যাররাও প্রশ্নট্রশ্ন দাগিয়ে দিচ্ছেন। পড়ার ধাক্কায় খেলা আড্ডা যে কোথায় চিৎপটাং বুঝতেই পারলাম না। 

এরইমধ্যে ঘরের বিতিকিচ্ছি ভাবটা ফকফকা। এখন সময় লেপটে থাকে টেবিলে, বইয়ে। আব্বাও খুশি আম্মাও। মনের উঠানে ঝিরঝিরে বাতাস। রাতের খাবারে বসে আব্বা বললেন আগামী পরীক্ষায় যদি প্রথম হও তবে তোমাকে একটা নতুন সার্ট বানিয়ে দেবো। আমি তখন খুশির বাগানে। জানালাম তাই হবে। আমি অবশ্যই প্রথম হবো। আব্বা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আম্মাও খুশির জোয়ারে ভাসলেন। বইয়ের পাতায় আমার নজর। 

রেওয়াজ ছিলো শব্দ করে পাঠ। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে উড়ে আসতো পড়া। পরীক্ষার মওসুম চলছে। প্রায় ঘরেই পাঠ। হাট জমে যেতো। রাত জেগে জেগে পড়া। কেনো কোনো দিন সঙ্গ দেন আম্মা। রাত এগারটা পার হলেই মনে হতো নিশিরাত! ঘুমপরী উড়তো। বসতো এসে চোখের পাতায়। তখনি আম্মা বলতেন চোখে পানির ঝাপটা দাও। পানির ঝাপটায় পালিয়ে যেতো ঘুমপরী। সকালেও সমান তালেই চলতো পাঠের রেলগাড়ি। ফুল ঝুরঝুর বাতাসে হাঁটছে সময়। স্যাররা জানিয়ে দিলেন পরীক্ষার দিনক্ষণ। ভয় আর আনন্দ দুটিই পেছন পেছন বাসা পর্যন্ত চলে এলো। মাঝখানে সপ্তাখানেক অবসর। স্কুল ছুটি। শান্তিনগর বাজার গেলাম, সাথে আব্বা। সেখান থেকে কিনলাম হারিকেনের চিমনি। বাঁদুর মার্কা। বাজারে সেরা ছিলো এটি। দুখানা সোনালি রঙের নিব। দুটি কালির গুল্লি। ভিজিয়ে রাখতে হতো কিছু সময়। তারপর কলমের আগায় নিব বসিয়ে দোয়াতে চুবিয়ে নিলেই হলো। আন্দাজ মতো কালি। পরীক্ষার জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। মালসামান জোগাড় করে। টানা সাতদিন চললো পরীক্ষা। মাঝে একদিন বসে থাকলাম। কালি কলম পেন্সিল রাবার এবং স্কেল, যে পরীক্ষায় যা দরকার আম্মা সব ঠিকঠাক করে দেন। প্রায় প্রতিদিনই আম্মা এই বলে বিদায় দিতেন, মাথা ঠান্ডা রাখবে, তাড়াহুড়া করবে না। অংক পরীক্ষার দিন আম্মা আব্বা দু’জনেরই কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে থাকলো। কারণ অংক বিষয়টি ছিলো আমার জন্য কালবৈশাখীর ঝড়। পাস করতাম। ছাদের কিনারায় ঝুলে থাকার মতো। অংক পরীক্ষা শেষে ফিরে এলাম বাসায়। হাসি হাসি চেহারা। অপেক্ষায় ছিলেন আব্বা আম্মা। চোখ থেকে ঝরছে বাসি বকুল। দু’জনেই দেখলেন আড় নজরে। আমি জানালাম ভয় নেই। আমিই প্রথম হবো। আজকের পরীক্ষায় আশি-নব্বই তো থাকবেই। আব্বা জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। তারপর প্রশ্ন নিয়ে যোগ বিয়োগ করে বললেন সঠিক হলে আটাত্তরের মতো উঠবে। আম্মা মাথা পিঠে আদর করলেন। আব্বা বললেন ফাঁড়া কাটলো। শেষের দুই পরীক্ষায়ও খুশির ঝুনঝুনি বাজলো। সেই ঝুনঝুনি বাজাতে বাজাতেই ফিরলাম বাসায়। আকাশে হাসির ঝমঝম বাদল। মনের সবগুলো কপাট খুলে রেখেছে কারা যেনো। ফটাফট খুললো তালা। বেড়িয়ে এলো বাক্সবন্দি ইচ্ছাগুলো। আবার ধুলায় লুটোপুটি। বইখাতা, কলম, দোয়াত। টেবিল  চেয়ারেও ধুলা ঝুরঝুর। 

শান্তিবাগের মাঠ আবার জমজমাট। শীতের বাতাস এলোমেলো। সোনাঝরা রোদ, নরম নরম। শরীর এলিয়ে দিতাম সেই ঝিকমিক রোদে। জমা হতো বন্ধুবান্ধব। জমতো আড্ডা। বার্ষিক পরীক্ষা এখন খাতাবন্দি। তাই ফুরফুরে মেজাজ। পড়ার তাকিদ নাই। আব্বা-আম্মাদের চোখে আর আলতা সাঁতার কাটে না। তারাও ভাবনাহীন। লাট্টু খেলা চলতো কোনো কোনো সকালে। আম্মাদের নাস্তার ডাক আসা মাত্রই আড্ডা খতম। লাট্টু আর সুতলী পকেটে। ফড়িংয়ের পাখায় ভর করে উড়তো সময়। তখন ক্রিকেট খেলার ধুম। অনেক সময় মনে হতো তামাম দিনই খেলি। খাবার দাবার চুলায় যাক। ম্যাসটেস খেলতাম এ পাড়া ও পাড়ায় গিয়ে। ওরাও আসতো আমাদের এলাকায়। ঢাকা তখন ক্রিকেট নিয়ে সরগরম। ইংল্যান্ড থেকে এলো এমসিসি ক্লাব। বিপক্ষ দল হানিফ মোহাম্মদরা। ভালো ব্যাট করতো হানিফ মোহাম্মদ। বিশ^ সেরা খেলোয়াড়। খুব নামডাক। সুজা উদ্দিন, ফজল মাহমুদ, আরো দু’জন খেলোয়াড় দারুণ খেলতো। হানিফ মোহাম্মদ ছিলো আমাদের সবার প্রিয়। ক্রিকেট নিয়ে চলতো গাল-গপপো। সকাল-বিকাল ব্যাট-বলই সঙ্গী। কোনো কোনোদিন ঘামে চপচপ মাথা, শরীর। এরপরও থামতে চায় না খেলা, আড্ডা। আলোচনা-সমালোচনা। ঐ তো যাচ্ছে হানিফ মোহাম্মদ, ফজল মাহমুদ। চলতে ফিরতে এমনই ভাবনায় ঘুরতো। নজরে আটকে থাকতো। ইচ্ছার শামিয়ানায় সময়ের বৃষ্টি ঝমঝম। তখনই গুটিয়ে আসতো আড্ডার পাতাঝরা দিন।

 (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ