রবিবার ২৮ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

খুলনা যেন মৃত্যুপুরী ॥ তবু নেই সচেতনতা

খুলনা অফিস : খুলনা বিভাগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে বিভাগে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৯১৭ জন। করোনায় ‘মৃত্যুপুরী’ হয়ে উঠেছে এ বিভাগ। প্রতিদিন বিভাগের ১০ জেলায় বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। ঢাকাকে টপকে এখন খুলনা করোনার অন্যতম হটস্পট। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনা মহামারি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা জেনারেল হাসপাতাল ও গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ও আইসিইউ ওয়ার্ডের বাইরে বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা। কিছুক্ষণ পর পর শোনা যাচ্ছে বুকফাটা কান্না আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ। সদ্য চিরবিদায় নেওয়া স্বজনের লাশ নিয়ে আহাজারি করতে করতে হাসপাতাল এলাকা ত্যাগ করছেন অনেকে। মৃত্যুর সারিতে রয়েছে যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক রাশেদা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ সাতজন, যশোরে পাঁচজন, ঝিনাইদহে তিনজন, চুয়াডাঙ্গায় দুইজন, সাতক্ষীরায় দুইজন এবং মেহেরপুরে একজন মারা গেছেন।

খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায় গত বছরের ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ৪৮ হাজার ৭৯৫ জন। আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১৬ জনে। এ সময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৫ হাজার ৬৭৬ জন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের জেলাভিত্তিক করোনা সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ২৬০ জন। জেলায় এ পর্যন্ত মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৩ হাজার ৮২৯ জনের। মারা গেছেন ২২৮ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১০ হাজার ২৮৪ জন।

এদিকে বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘন্টায় খুলনার পৃথক তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ৬ জনের মধ্যে খুলনা করোনা হাসপাতালে একজন, গাজী মেডিকেল হাসপাতালে তিনজন ও জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

খুলনা করোনা হাসপাতালের ফোকাল পার্সন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় নগরীর সদর থানা এলাকার আসমা (২৫) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ১৩০ শয্যার করোনা হাসপাতালে সকাল ৮ টা পর্যন্ত ১৪৮ জন রোগী ভর্তি ছিল। যার মধ্যে রেডজোনে ৯৭ জন, ইয়ালোজোনে ১২ জন, এইচডিইউতে ২০ জন এবং আইসিইউতে ১৯ জন চিকিৎসাধীন। গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩২ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪০ জন।

খুলনা ২৫০ জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. কাজী আবু রাশেদ জানান, ২৪ ঘন্টায় করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নড়াইলের কালিয়ার দীন মোহম্মদ (৮০) ও বাগেরহাটের গোয়ালখালী এলাকার সুলতান হাওলাদার (৬৫) নামের দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৬৫ জন। এরমধ্যে ৩২ জন পুরুষ ও ৩৩ জন নারী রয়েছেন।

গাজী মেডিকেলের স্বত্বাধিকারী গাজী মিজানুর রহমান জানান, ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, সাতক্ষীরার কলারোয়ার জেসমিন (২৬), শ্যামনগরের মো. আলী (৫৮) ও যশোরের কেশবপুরের আজিজ (৬৫)। তিনি আরও জানান, হাসপাতালে ৯৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এরমধ্যে আইসিইউতে পাঁচজন এবং এইচডিইউতে ৯ জন চিকিৎসাধীন। ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালে ৩০ জন ভর্ডি হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন। এছাড়া হাসপাতালের আরটি পিসিআর মেশিনে ২৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৪ জনের করোনা পজেটিভ এসেছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ জানান, বুধবার রাতে খুমেকের পিসিআর মেশিনে ৫৬৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৯১ জনের করোনা পজেটিভ এসেছে। যার মধ্যে খুলনার ৪৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ১৬৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাটে ১০ জন, যশোরে ৬ জন, সাতক্ষীরায় ৪ জন, পিরোজপুরে ১ জন, নড়াইলের ১ জন ও ঝিনাইদহের একজন রয়েছেন। খুমেক পিসিআর ল্যাবের পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮ পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় খুলনার ৮৬৭টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে ২৬০ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। যা মোট নমুনা পরীক্ষার ২৯ শতাংশ।

এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন পুলিশ কনস্টবল মো. আজিজুর রহমান (৫১)। বুধবার (২৩ জুন) বিকেল সাড়ে চারটায় খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি খুলনা জেলা পুলিশের পাইকগাছা কোর্টে কর্মরত ছিলেন।

খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলেন, পুলিশ কনস্টবল আজিজুর রহমানের জ্বর, সর্দি হলে মঙ্গলবার পাইকগাছাতে তার এন্টিজেন টেস্ট করা হয়। তাতে তার করোনা পজেটিভ আসে। বুধবার (২৩ জুন) সকালে তাকে গাড়িযোগে তাকে খুলনায় আনা হয়। খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিকেলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 

বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের সূত্রে জানা যায়, মরহুম মো. আজিজুর রহমান সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার মোড়গাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মো. আবুল হোসেন সরদার। বাংলাদেশ পুলিশের ব্যবস্থাপনায় মরহুমের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। করোনাকালে জনগণকে সুরক্ষা সেবা দিতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৯৭ জন পুলিশ সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।

এদিকে, হাসপাতালে করোনারোগী বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম অবস্থা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাতে অনেকটাই বিপর্যস্ত হাসপাতালগুলো।

খুলনা অক্সিজেন ব্যাংকের অর্থ সম্পাদক মো. আসাদ শেখ বলেন, খুলনায় প্রতিদিনই করোনা শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। বলতে গেলে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে খুলনা। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে। হাসপাতালের করোনা ইউনিটগুলোতে ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী ভর্তি রয়েছে। ফলে নতুন করে রোগী ভর্তি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আসাদ জানান, বুধবার বিকেলে অক্সিজেন সংকটে থাকা বটিয়াঘাটার বিরাট এলাকা থেকে করোনায় আক্রান্ত খাদিজাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসেন তার স্বজনরা। আমরা সাধ্য অনুযায়ী অক্সিজেনের ব্যবস্থা করি। পরে তাকে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির জন্য নিয়ে যাই। সেখানে বেড খালি নেই। অক্সিজেনেরও সংকট রয়েছে। জরুরিভিত্তিতে বিনামূল্যে অক্সিজেন দিতে দিন-রাত আমাদের ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করে যাচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এভাবে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এদিকে, দিন দিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যূনতম স্বাস্থ্য সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। হাসপাতালের ভেতর করোনারোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের মধ্যেও উদাসীনতা। রোগী সেবার পর দিনশেষে গণপরিবহনে ফিরছেন যে যার বাড়ি। দীর্ঘদিন রোগীর সান্নিধ্যে থাকা স্বজনরা জানান, কোয়ারেন্টিনে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে থাকায় স্বজনদের শরীরেও ভাইরাস প্রবেশ করছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অন্যদের মধ্যে।

খুলনায় সপ্তাহব্যাপী লকডাউনের প্রথম দিন মঙ্গলবার কঠোরভাবে পালিত হলেও তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। যদিও মানুষের চলাচল ঠেকাতে মোড়ে মোড়ে বাঁশ বেঁধে দেয়া হয়েছে। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে এগুলো বাঁধা হয়েছে। কিন্তু মানুষ কারণে অকারণে বাস্তায় বের হচ্ছেন। অনেকের মুখেই নেই মাস্ক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ