সোমবার ২৬ জুলাই ২০২১
Online Edition

বর্ষা মৌসুমেও রাজধানীর সড়কে খাঁড়াখুঁড়ি ॥ অন্তহীন জনদুর্ভোগ

সড়ক খনন নীতিমালার তোয়াক্কা নেই। রাজধানী জুড়েই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি-কাটাছেঁড়া। যার কারণে বর্ষার শুরু থেকেই দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী -সংগ্রাম

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : বর্ষা মৌসুমে (মে থেকে সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কোনো সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। কাটাছেঁড়াও করা যাবে না। খননকাজ করতে হবে রাতের বেলা, দিনে কোনো খোঁড়াখুঁড়ি নয়, কাটাছেঁড়াও নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে খননকাজ শুরু করলে মূল খরচের ৫ গুণ জরিমানা গুনতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলেও দিতে হবে জরিমানা।
সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনগণের ভোগান্তি কমাতে এমন বেশ কিছু বিধান রেখে ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা-২০১৯’ চূড়ান্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। রাজধানীতে নাগরিক সেবাদানকারী তিনটি মন্ত্রণালয় ও সাতটি সংস্থা কয়েক দফা সভা করে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, ডেসকো, বিটিসিএল নীতিমালায় তাদের মতামত ও সুপারিশ দেয়।
চলতি বছর এই নীতিমালা অনুসরণ করতে পারেনি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। রাজধানীর অনেক সড়কেই এখন চলছে খোঁড়াখুঁড়ি-কাটাছেঁড়া। বিগত বছরও এই নীতিমালা অনুসরণ করেনি তারা। কাগজে কলমে নীতিমালা করা হলেও গত বছর থেকেই ওই নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনই। চলতি বছরের বর্ষা শুরুর পর থেকে ঢাকা নগরবাসীর কপালে গেঁড়ে বসা প্রাত্যহিক নানা দুর্ভোগের সাথে খোঁড়াখুঁড়ি-কাটাছেঁড়ার কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগ ও যন্ত্রনার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। খোঁড়াখুঁড়ি-কাটাছেঁড়ার কারণে পানিবদ্ধতার মাত্রা বাড়ছে দিনের পর দিন। এতে করে ঢাকাবাসীর দুর্ভোগের অন্ত নেই। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যেকার সমন্বয়ের অভাবের কারণেই ঢাকাবাসীর কপালে জোটা নানা দুর্ভোগের কমতি ঘটছে না।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল মঙ্গলবার নিজের সরকারি বাসভবন থেকে ঢাকা যাবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর বোর্ড সভায় যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, “সমন্বহীনভাবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কোনো সড়ক খনন করা যাবে না।” এ সভায় ঢাকার দু মেয়রও ভার্চুয়ালী সংযুক্ত ছিলেন।
সড়ক খনন নীতিমালা-২০১৯ এ বলা হয়েছে , মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর-বর্ষা মৌসুমের এই পাঁচ মাস সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। আর বর্ষার সময় কোনো সড়ক খুঁড়তে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে মূল ক্ষতিপূরণসহ অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ফি জমা দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে পুরো জামানত জরিমানা হিসেবে বাজেয়াপ্ত হবে।
খননকাজের তদারকি ও সমন্বয় করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ১৩ সদস্যের ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এই সেলের সভাপতি আর প্রধান প্রকৌশলী সদস্যসচিব। এই কমিটি প্রতি দুই সপ্তাহ পর সভা করে কাজের সমন্বয় করবে।
সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির অনুমতি দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয় তদারকি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করবে ‘ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল’। সড়ক খননের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) তৈরি করতে হবে এবং তা সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে। আর বছরের খনন পরিকল্পনা এপ্রিল মাসের মধ্যে সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে।
সড়ক খনন নীতিমালা প্রণয়নের পর স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে এই নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তখন উত্তর সিটি করপোরেশন নীতিমালা অনুযায়ী কাজ শুরু করে। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের কিছু পর্যবেক্ষণ জানিয়ে বলেছে, তারাও নীতিমালা অনুযায়ী কাজ শুরু করবে।
কিন্তু নীতিমালা অনুযায়ী ঢাকার সড়কের খনন কাজ শুরু হয়নি। এখনও চলছেনা। যার কারনে রাজধানীর অনেক সড়ক এখন খোঁড়াখুঁড়ির কবলে। আর বর্ষা এলে এর মাত্রা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সৃষ্টি হয় পানিবদ্ধতা ও তীব্র যানজটের। চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন রাজধানীর মানুষ। রাজধানীর অলিগলিতে চলছে সরকারের বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন কার্যক্রম।
নগরবাসীর অভিযোগ,বর্ষার মৌসুম এলেই শুরু হয় রাজধানীর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি কাজ। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও পানিবদ্ধতায় নাকাল হতে হয় নগরবাসীকে। তারা বলেন,বর্ষার মৌসুমে রাজধানীর সড়কগুলোতে চলা কঠিন তারপরেও অনেক জায়গায় কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করায় ভোগান্তি যেন আরও চরমে পৌঁছে। ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে রাজধানীার বেশ কয়েকটি সড়ক। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় তীব্র পানিবদ্ধতার, লেগে থাকে যানজট। উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুড়িতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে অধিকাংশ সড়কে। কোথাও কোথাও কাদামাটিতে রাস্তায় হাঁটারও উপায় নেই।
জানা গেছে,বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে বর্ষা মৌসুম শুরুর পর কাটা হচ্ছে সড়ক। এখন বৃষ্টি হলেই বন্ধ থাকছে কাজ। অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে থাকছে আশপাশের সড়ক। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
পানিবদ্ধতা নিরসনে মাসখানেক আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিভিন্ন এলাকায় পাইপ নর্দমা সংস্কারের কাজ শুরু করে। এবারের বর্ষা মৌসুমেই অন্তত ২৫টি এলাকায় রাস্তা কাটার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। ১০৩ কোটি টাকার নিজস্ব অর্থায়নের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ইতিমধ্যে অন্তত ১০টি জায়গায় সড়ক ও ফুটপাত কাটাও হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমজুড়েই বাসিন্দাদের ভোগান্তি পোহাতে হবে।
এ ছাড়া বাসাবাড়ির ব্যবহারের পানি ও বৃষ্টির পানি যাতে দ্রুত নিষ্কাশন হয়, এ জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডের নর্দমা পরিষ্কার করতে আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে দক্ষিণ সিটি। ৩৬ কোটি টাকায় নেওয়া নিজস্ব অর্থায়নের এই প্রকল্পের বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুমেই। দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডে ৭১৫ কিলোমিটার পাইপ নর্দমা এবং ৪৬৬ কিলোমিটার উন্মুক্ত নর্দমা আছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ‘সড়ক খনন নীতিমালা ২০১৯’ অনুযায়ী অন্য কোনো সংস্থা করপোরেশনের রাস্তা খনন করতে চাইলে বর্ষা মৌসুম তথা মে থেকে সেপ্টেম্বরে যাতে না করে, সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু দক্ষিণ সিটি নিজেরাই বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করল।
মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম নিজস্ব অর্থায়নে জলাবদ্ধতা নিরসনের দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫টি এলাকায় চিহ্নিত করে ১০৩ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দিকে এমন পরিকল্পনা নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এই কাজ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে জুন মাসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ সিটির একাধিক প্রকৌশলী বলেন, সাধারণত সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে টাকার অনুমোদন ও আনুষঙ্গিক জটিলতা শেষ করতেই অনেক সময় লেগে যায়। তাই কাজ শুরু হতে বিলম্ব হয়। তাঁরা আরও বলেন, মেয়র নর্দমা সংস্কারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন গত বছরের শেষ দিকে। যেহেতু নিজস্ব অর্থায়নে কাজটি হবে, তাই এটি দ্রুতই শুরু করা যেত। কিন্তু প্রকল্পের পরিচালকের হেঁয়ালিপনায় বর্ষা মৌসুমে এসেই কাজ বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোড, হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, ধোলাইখালের নাসির উদ্দিন সরদার লেন, ওয়ারীর টয়েনবি সার্কুলার রোড, ফকিরাপুল, রাজারবাগ কালীমন্দিরে ও মুগদা এলাকায় সড়ক খনন করে নর্দমা সংস্কারের কাজ চলছে। এর মধ্যে এখন আগা সাদেক রোডের যে অংশ কাটা হয়েছে, সে অংশ দিয়ে স্বাভাবিকভাবেও হাঁটাচলা করা যাচ্ছে না। ফলে পাশের মাজেদ সরদার রোড, কাজী আলাউদ্দিন রোডসহ অলিগলিতে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা ময়লা পানি মাড়িয়েই চলাচল করছেন।
হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, ধোলাইখালের নাসির উদ্দিন সরদার লেন, ওয়ারীর টয়েনবি সার্কুলার রোড যে অংশের কাজ শেষ হয়েছে, ওই অংশ পুরোপুরি সচল করা যায়নি। ফলে বাসিন্দারা বিপাকে পড়েছেন।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মানুষজনের ঘরবন্দী হওয়ার মতো অবস্থা। কিছু কিছু অংশে রিকশা যেতে পারছে না, হাঁটারও উপায় নেই।
দক্ষিণ সিটির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগা সাদেক রোডের প্রায় এক কিলোমিটার অংশের নর্দমা সংস্কারে গত এপ্রিল মাসে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। মাসখানেক আগে ওই প্রতিষ্ঠানটি সেখানে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করে। প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে এই কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। নিজস্ব অর্থায়নে সড়ক ও ফুটপাতের নর্দমার সংস্কারে চলমান কাজটি শেষ হতে পুরো বর্ষা মৌসুমই লাগবে।
এদিকে পানিবদ্ধতা নিরসনে নিজস্ব অর্থায়নে এই দুটি প্রকল্প বাদেও ঢাকা দক্ষিণ সিটির ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসনসহ নর্দমা ও ফুটপাতের উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে আরও কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে।
জনঘনত্বপূর্ণ পুরান ঢাকার চানখারপুল থেকে হোসনি দালান পর্যন্ত সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে এক মাস ধরে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীদের।
প্রত্যেক কাউন্সিলরকে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ করতে এক কোটি টাকা করে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, ওই কাজের মধ্যে অনেকেই নর্দমা ও ফুটপাতের সংস্কারকাজ করছেন। এসব কাজেও মানুষের ভোগান্তির মাত্রা বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুকনা মৌসুমে এসব কাজ করলে মানুষের ভোগান্তি তুলনামূলক কম হয়, টাকায় সাশ্রয় ও কাজের গুণগত মান ঠিক থাকে।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির মুপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের বলেন, জনভোগান্তি কমাতে আগামী অর্থবছর থেকে বর্ষা মৌসুমে যাতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে মেয়র নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রকৌশল বিভাগকে কোন সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করতে হবে এবং কোন সময়ের মধ্যে সেসব কার্যক্রম শেষ করতে হবে, সেটারও সুনির্দিষ্ট সূচি করে দিয়েছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, শুকনা মৌসুমে দরপত্র আহ্বান ও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ করার পাশাপাশি বর্ষার আগেই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শেষ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ