রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

রাজধানীর পানিবদ্ধতার কারণ জানা সমাধানের উদ্যোগ নেই

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : প্রবল বৃষ্টিপাতেও পানিজটের ভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে ঢাকার দুই সিটি মেয়রের বক্তব্য যে শুধুই কাল্পনিক ও রাজনৈতিক, সেটি সাম্প্রতিক রাজধানীর চিত্র দেখেই প্রমাণিত হয়েছে। প্রতি বছরই সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে এমন বক্তব্য দেয়া একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন জায়গায় যানবাহনের পাশাপাশি চলছে নৌকা। কেন আধাঘণ্টার বৃষ্টির পানি সরতে দীর্ঘ সময় লাগছে। বিশেষজ্ঞরা পানিবদ্ধতার জন্য অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা বৃষ্টি হলে রাজধানীবাসীকে পানিজটের ভোগান্তি থেকে বাঁচানোর  কোনো উপায় নেই। কারণ শুধু উদ্যোগ নিলেই পানিজট কমানো বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। সেই সব উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নও করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা পানিবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন থেকেছে। ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সেবাপ্রদানকারী সংস্থার উন্নয়ন কাজে কেবল সমন্বয়হীনতা নয়, পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবও প্রকট। অবশ্য এজন্য নগরবাসীর অসচেতনতাও কিছুটা দায়ী। সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং তা সার্বক্ষণিকভাবে পরিষ্কার রাখা, রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীগুলো সংস্কার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর পানিবদ্ধতার জন্য যে কারণ বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মহানগরীতে এখন প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস করছেন। এই শহরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে।  ফলে শহরের বেশিরভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলাও একটি কারণ। ঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই এখনো ময়লা ফেলা হয় খোলা জায়গায়।  এসব ময়লা আবর্জনা, বিশেষ করে কঠিন বর্জ্যের একটা অংশ সরাসরি ড্রেনে গিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়।  ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় রাস্তাঘাটে।
বর্ষায় খোঁড়াখুঁড়ি যেন নিত্যদিনকার বিষয়। বর্ষায় এটি করার নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঢাকা শহরের সড়কগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব শুরু হয় বর্ষা মওসুমের ঠিক আগে থেকে।  পুরো বর্ষা মওসুম ধরেই চলে এসব খোঁড়াখুঁড়ি।  সামান্য বৃষ্টিতেই তাই পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয় শহরে।  নদী ভরাট পানিবদ্ধতার বড় কারণ। ঢাকা শহরের চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতালক্ষ্যা প্রভৃতি নদীগুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা।  আর তাই বিশাল জনসংখ্যার এ শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
পানি বদ্ধতার প্রধান কারণ খাল দখল। ঢাকা নগরীর ৬৫টি খাল এক সময়ে এ মহানগরীর পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা রাখত। কিন্তু রাজধানীর এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়াও কঠিন।  বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে।  অনেকগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে।  যে কয়েকটি টিকে আছে সেগুলোও দখলে জর্জরিত। ময়লা আবর্জনায় ভরা এসব খাল। প্রতিবছরই খাল উদ্ধারের হুংকার আসে। কিন্তু সেগুলো কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। জলাশয় ভরাট পানিবদ্ধতার কারণ। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে আবাসান ব্যবস্থা গড়ে তোলায় বড় এই শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়েছে। এখন রাজধানীতে পুকুর বা জলাশয় খুজে পাওয়া দায়।
ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী দখল আর দূষণে জর্জরিত।  দখলে এ নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্থ হয়েছে আর দূষণে নদীর তলদেশে নানান বজ্য্র্ জমে এর গভীরতা কমিয়েছে।  ফলে পানির প্রবাহ বাড়লেই তা উপচে পড়ে। রাজধানীর পানিবদ্ধতা রোধে ঢাকা ওয়াসা বিভিন্ন সময়ে যেসব বক্স কালভার্ট নির্মাণ করেছে, তার বেশিরভাগই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত।  ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তৈরি এসব বক্স কালভার্ট প্রয়োজনের তুলনায় সরু হওয়ায় বৃষ্টির পানি অপসারণে তেমন কাজে আসে না।  অনেক ক্ষেত্রে এসব কালভার্টে অপচনশীল কঠিন বর্জ্য আটকে গিয়ে পানি নির্গমন পথও বন্ধ হয়ে যায়।
সমন্বয়হীন সংস্কার কাজও পানিবদ্ধতার জন্য দায়ী। ঢাকা শহরে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে কোনো সমন্বয় না থাকায় সারা বছরই সড়ক খোড়াখুড়ি চলতেই থাকে।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়াসা স্যুয়ারেজ নির্মাণের জন্য একটি সড়ক খোড়া হলো, সে কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খোড়াখুড়ি শুরু করল গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগ।  ফলে সারা বছর সড়কগুলোতে এ ধরনের কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
ঢাকা শহরে চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার। পলিথিন ব্যবহার না করার আইন থাকলেও তার সামান্যটুকুও মানা হয় না।  ফলে দুই কোটি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার অধিকাংশজুড়েই থাকে পলিথিন। এসব পলিথিন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়। এগুলো ড্রেন বা খালে গিয়ে পানি প্রবাহ রোধ করে দেয়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন থেকে ময়লা তুলে সেগুলো দিনের পর দিন ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়।  দিনের পর দিন কেউ এগুলো সরায় না। ফলে বৃষ্টি হলেই সে ময়লার পুনরায় ঠিকানা হয় ড্রেন।  সৃষ্টি হয় পানিবদ্ধতা। গত কয়েকবছর ঢাকা শহরের পানিবদ্ধতার অন্যতম কারণ ফ্লাই ওভার নির্মাণ কাজের দীর্ঘসূত্রতা।  ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের ফলে এ এলাকার রাস্তাঘাটের দিনের পর দিন যে ক্ষতি হয়েছে, তার কখনোই সংস্কার না করায় সামান্য বৃষ্টি হলেই বিশাল এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হতো পানিবদ্ধতা। এখন মেট্টোরেলের কাজ চলছে। বিভিন্ন জায়গায় গর্ত করে কাজ চলছে। এসব কারণেও পানিবদ্ধতা বাড়ছে।
সূত্র মতে, গত  পহেলা জুন মঙ্গলবার সকালে ৩ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতে রাজপথসহ রাজধানীর অধিকাংশ অলি-গলি ছিল কোমর পানির নিচে। পানি নিষ্কাশনে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগায় নগরজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। বর্ষা মওসুম শুরুর আগেই রাজধানীর এ চিত্র নগরবাসীর মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। এরপর চলতি মাসে যে কয়দিন বৃষ্টি হয়েছে ততদিনই রাজধানীর অধিকাংশ রাস্তাঘাট কাদা-পানিতে একাকার হয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন দুভাগ করার সময় বলা হয়েছিল, উন্নত নাগরিক সেবা প্রদানই বিভাজনের মূল উদ্দেশ্য। শুধু তাই নয়, এবার পানিবদ্ধতা সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না বলে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন মেয়ররা। কিন্তু এসব যে অসার প্রতিশ্রুতি ছিল, সাম্প্রতিককালের বৃষ্টিতে রাজধানীবাসী তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। সড়ক খনন নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা শহরের সড়ক খনন বন্ধ রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে এ নীতিমালা কেন মানা হচ্ছে না। বরং বর্ষাতেই যন খোঁড়াখুঁড়ি অনেক গুণে বেড়ে যায়।  পানিবদ্ধতায় প্রতিবছর রাজধানীর জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও এ থেকে উত্তরণের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। উন্নয়নের নামে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এর কোনো সুফলই পাচ্ছেন না নগরবাসী। রাজধানীর ২৬টি (বর্তমান) খাল, তিন হাজার কিলোমিটার ড্রেন ও জলাশয় ওয়াসার কাছ থেকে সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা হলেও সেগুলো পৌনঃপুনিকভাবে আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে এবং অবধারিতভাবে সৃষ্টি হচ্ছে পানিবদ্ধতা।
জানা গেছে, এ সমস্যা নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত প্রদান করে যাচ্ছেন। ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে শতবর্ষেরও বেশি সময় আগে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্টিক গেডিস ঢাকা শহর ও এর আশপাশের নদী, খাল, জলাধারগুলোা সংস্কার ও সংরক্ষণে গুরুত্ব আরোপের কথা বলেছিলেন। শতবর্ষ পরেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে স্যার প্যাট্টিক গেডিসের পরিকল্পনাকে গুরুত্ব প্রদানের কথা বলছেন। রাজধানীর চারপাশে রয়েছে কয়েকটি নদী। ঢাকা শহর ও এর আশপাশে জালের মতো যেসব নদী, খাল, জলাধার রয়েছে সেগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণে গুরুত্ব প্রদান করা হলে বৃষ্টির পানি খাল দিয়ে নদীতে গিয়ে পড়বে। জানা গেছে, ঢাকায় খালের সংখ্যা ছিল অর্ধশতেরও বেশি। যার বেশকটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখনো যেগুলোর অস্তিত্ব রয়েছ যেগুলোকে সংস্কার ও সংরক্ষণে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা হলে রাজধানীর পানিবদ্ধতা অনেকটাই কমবে। এছাড়া সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে রাজধানীর পানিবদ্ধতা নিরসনে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়ায় অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে, যা বলাই বাহুল্য।
কেন আধাঘণ্টার বৃষ্টির পানি সরে যেতে দীর্ঘ সময় লাগছে এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ও ওয়াসার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান সময় মতো বাস্তবায়ন করতে না পারা, ভূ-উপরিস্থ ড্রেনসমূহ পরিষ্কার না থাকায় পরবর্তী পর্যায়ের পানি ড্রেন/স্টর্ম ড্রেন/খাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। এতে করেই পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দখলের কারণে ভূ-উপরিস্থ এবং স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন প্রায়ই কঠিন বর্জ্য দিয়ে বন্ধ হয়ে থাকে, ফলে বৃষ্টির পানি পরিবহনের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং পানিজট দেখা যায়। খোলা জায়গা, খেলার মাঠ, পুকুর, লেক, গাছ-গাছালি, নিম্নাঞ্চল হারিয়ে গেছে। নগরের খালের পরিমাণ কমে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া দখল হয়ে সংকুচিত হয়ে নালায় পরিণত হওয়ায় পানি পরিবহনের ক্ষমতা কমে গেছে অথচ পানির রান-অব বেড়েছে। খালকে বক্স কালভার্ট করায় পানি পরিবহন কমেছে, এমনকি ভূমির পানি শোষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
গত বর্ষায় বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে পানিবদ্ধ এলাকা ও এর কারণ চিহ্নিত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রকৌশল বিভাগ। সমস্যা সমাধানে কিছু সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন গত বছর ১৬ জুলাই ডিএনসিসির সমন্বয় সভায় তোলা হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পানিবদ্ধতা হয় এমন এলাকাগুলো হল- প্রগতি সরণির কোকাকোলা থেকে বসুন্ধরা, বাড্ডার প্রধান সড়ক ও অলিগলি, খিলগাঁওয়ের ওয়াসা রোড, পূর্ব হাজীপাড়া, মৌলভীরটেক, খিলগাঁও বি-ব্লক ও তালতলা এলাকা, নাখালপাড়ার বিভিন্ন সড়ক, মগবাজার এলাকার লেন-বাইলেন, মিরপুরের কালশী রোড, মেহেদীবাগ, মিরপুর বি আরটিএর সামনের সড়ক, রাইনখোলা, বাউনিয়া এলাকা, পল্লবী, বেগম রোকেয়া সরণি, বনানী রেলস্টেশন থেকে আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত সড়ক। এছাড়া রয়েছে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের এক, দুই, তিন নম্বর সড়ক এবং শায়েস্তা খাঁ এভিনিউ, খিলক্ষেতের নামাপাড়া, মধ্যপাড়া এবং লেকসিটি কনকর্ড আবাসিক এলাকা, নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সিটি করপোরেশন এলাকার মতিঝিল, কমলাপুর, আরামবাগ, বঙ্গভবন, গুলিস্তান, বকশীবাজার, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর, শুক্রাবাদ, শান্তিনগর, মৌচাক, মালিবাগ ও মগবাজার এলাকায় পানিবদ্ধতা হয়।
পানিবদ্ধতা নিয়ে ডিএনসিসির প্রতিবেদনে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্ষা মওসুমের আগেই খাল পরিষ্কার, খালে পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, খালের ওপর নির্মিত রাস্তা কেটে খাল পুনরুজ্জীবিত করা। দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ হিসেবে সবগুলো খালের প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করা এবং মূল প্রশস্ততায় খাল খনন এবং খালের পাড় সংরক্ষণের কথা বলা হয়। ঢাকার পানিবদ্ধতা নিরসনে গত এক একবছরে আড়াইশ কিলোমিটার নালা তৈরির কথা জানিয়েছে ডিএনসিসি। আর বিশেষ কার্যক্রম হিসেবে শান্তিনগর এলাকায় ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করেছে ডিএসসিসি। এছাড়া নাজিমুদ্দিন রোডসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এসব ড্রেনের পানি যে খালে গিয়ে পড়ে, সেসব খাল উদ্ধার বা পরিষ্কারের কাজ এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। রাজধানীর বেশিরভাগ খালে এখনও ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ। খালের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ দখলদার উচ্ছেদেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মিরপুর ১৪ নম্বরের ডেন্টাল হাসপাতালের পেছনে বাউনিয়া খাল প্রায় পুরোটাই ভরে গেছে। প্রতিবন্ধী কল্যাণ ফাউন্ডেশন এবং সিআরপির পেছনের অংশে খালের বস্তিও উচ্ছেদ করা হয়নি। সেখানেও খালে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প এবং রূপসী আবাসনের মাঝখানে খালের ওপর করা হয়েছে বিভিন্ন ভবনের ভিত্তি। রূপসী আবাসন এলাকা থেকে কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে খালে। পলাশনগর এবং বাইশটেকি এলাকায় সাংবাদিক খালের দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়নি। স্টিলব্রিজ থেকে বাউনিয়া খালের সংযোগ পর্যন্ত আবর্জনা জমে আছে। কাগজে কলমে ২০ ফুটের সাংবাদিক খাল পলøিবর সবুজ বাংলা আবাসিক এলাকায় এসে হয়ে গেছে চার ফুট। ফলে পানি সরতে পারে না। দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা রয়ে গেছে। প্যারিস খালের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। মিরপুরের মেহেদীবাগ এলাকায় খালে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকলেও তা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খিলগাও তিলপাপাড়া খালও ময়লা আবর্জনায় ভরা। গত মঙ্গলবার সেখানে একটি যুবক পড়ে নিখোঁজ হলে ময়লার কারণে তাকে খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয় ডুবুরীদের। কুড়িল বিশ্বরোড এলাকার খালও ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম তার এক গবেষণায় বলেন, পানিবদ্ধতা থেকে উত্তোরণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সংস্থা গবেষণার মাধ্যমে বন্যা ও নগর বন্যার অনেক পরামর্শপত্র তৈরি করেছে। ঢাকা ওয়াসা ২০১৫ সালে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে, যার বাস্তবায়নের অগ্রগতি কিংবা সুফল নগরবাসীর চোখে পড়ছে না। পানিবদ্ধতা নিরসনে তিনি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ২০১৫-এ মোট ৪৭টি খালের কথা উল্লেখ আছে। এ খালগুলো উদ্ধার করতে হবে।  জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯ অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ শহর ও রাজধানী অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে বন্যামুক্ত করার কথা বলা হয়েছে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করার সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকার পূর্বদিকের প্রস্তাবিত ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ফ্লাড কন্ট্রোল এম্ব্যাঙ্কমেন্ট-কাম-ইস্টার্ন-বাইপাস রোড মাল্টিপারপাস’ প্রকল্পটি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক খাল, জলাশয় ও ডোবার সীমানা নির্ধারণ ও সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ময়লা-আবর্জনা যাতে নর্দমা ও প্রাকৃতিক খালে ভরাট হতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ড্রেনেজ সার্কেল স্থাপন করা, নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার ৫ বছর অন্তর অন্তর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের মাধ্যমে বাড়ির ছাদের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও তা মাটির নিচে প্রবাহ করার ব্যবস্থা করা, প্লাস্টিক ব্যাগ ও সিঙ্গেল ব্যবহারের প্লাস্টিক অবশ্যই জরুরিভিত্তিতে নিষিদ্ধ করা। ঢাকার চারদিকের নদী ইন্টেলিজেন্ট ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে খনন করা ও নাব্যতা বৃদ্ধি করা, নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো, যাতে ময়লা-আবর্জনা নর্দমা ও প্রাকৃতিক খালে না ফেলা হয়।
সাউথ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর (পানি সম্পদ) ড. রেজাউল কবির চৌধুরী তার এক প্রবন্ধে বলেন, উন্মুক্ত মাটি কমে যাওয়ার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া ড্রেনেজ পাইপ ক্লিন করা হয়না, ময়লা আবর্জনা ও সেডিমেনটেশন এর কারণে পাইপের ক্যাপাসিটি কমে গিয়েছে। খাল গুলো ভরাট বা দখল হয়ে গিয়েছে। পানি সরার জায়গা নেই। ফলে এগুলো লোকালয়ে উপচে পড়ে। ঢাকার পানিবদ্ধতার সমাধান কি? বলেছেন-রাতারাতি এর সমাধান নাই। এই সমস্যার সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। এর মধ্যে ড্রেনেজ পাইপগুলোর কানেক্টিভিটি চেক করে কোথায় কোথায় ব্লক সেটা বের করে ঠিক করতে হবে। জলাধারগুলোর ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে, খাল বা প্রাকৃতিক ক্যানেলগুলোর ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে এবং জলাধারের সাথে তার কানেক্টিভিটি রাখতে হবে, প্রয়োজনে রেগুলেটর ও পাম্প এর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ