সোমবার ২৬ জুলাই ২০২১
Online Edition

সিনেমার স্টাইলে ভল্টের টাকা গায়েব

স্টাফ রিপোর্টার : ব্রিফকেসের ভেতর সাদা কাগজের বান্ডিলের দুই পাশে ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার নোট। নাটক ও সিনেমায় এমন দৃশ্যের সঙ্গে কম-বেশি সবাই পরিচিত। সিনেমার এমন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখায়। আসামীরা ভল্টের ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা গায়েব করতে এই অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন কি অবস্থা বংশাল শাখার।
ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখার ভল্ট থেকে পৌনে চার কোটি টাকা গায়েব হয়েছে অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো কৌশলে। জানা গেছে, ভল্টের ১০০ টাকার বান্ডিলের দুই পাশে ৫০০ টাকার নোট এবং ৫০০ টাকার বান্ডিলের দুই পাশে ১০০০ টাকার নোট রেখে সবাইকে প্রতিনিয়ত বোকা বানিয়ে গেছেন শাখাটির দুই কর্মকর্তা।
ওই ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বংশাল শাখার অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তাকে ১৭ জুন পুলিশে সোপর্দ করেছে। তারা হলেন- শাখাটির ক্যাশ-ইনচার্জ রিফাজুল হক ও ম্যানেজার (অপারেশন) এমরান আহমেদ। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নাটকীয় ওই ঘটনার পর এখন কী অবস্থা ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখার? রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কার্যক্রম চললেও ব্যাংকের এই শাখাটির পরিস্থিতি কিছুটা থমথমে; কর্মীদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক। তবে সাধারণ গ্রাহকরা স্বাভাবিক নিয়মে লেনদেন করছেন।  
বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে ওই শাখার ম্যানেজার আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এটি একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। তবে আমাদের সাধারণ কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা গ্রাহকদের যথানিয়মে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। ওই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়ম অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। যেহেতু এটি অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয় তাই দুদক থেকে মামলা করেছে। এখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া আমাদের নিজস্ব তদন্ত চলছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।
 ভল্টের ১০০ টাকার বান্ডিলের দুইপাশে ৫০০ টাকার নোট ও ৫০০ টাকার বান্ডিলের দুইপাশে ১০০০ টাকার নোট রেখে সবাইকে প্রতিনিয়ত বোকা বানিয়ে গেছেন। ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় আসামীরা এমন কৌশলে ওই টাকা গায়েব করেছেন। বিপরীতে ব্যাংকের ক্যাশ খাতায় হিসাব মিলিয়ে রাখতেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন সব তথ্য-উপাত্ত। যে কারণে ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখার ভল্ট থেকে তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকা গায়েবের ঘটনায় মামলা করেছে সংস্থাটি। মামলায় আটক করা দুই জনকে আসামী করা হয়েছে। তারা হলেন- ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের এফভিপি ও বংশাল শাখার ম্যানেজার (অপারেশন) এমরান আহম্মেদ এবং সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ রিফাতুল হক।
শনিবার দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. আতিকুল আলম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। দুদকের জনসংযোগ দফতর ঢাকা পোস্টকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির বংশাল শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক গত ১৭ জুন বাদী হয়ে রিফাতুল হক ও এমরান আহম্মেদকে আসামী করে বংশাল থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন। রিফাত ওই শাখায় ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে কর্মরত আছেন। গত ১৭ জুন আইসিসি ডিভিশনের ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ইউনিট বাৎসরিক নিরীক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বংশাল শাখা পরিদর্শনে যায়। তদন্তে ইউনিট শাখার ভল্টে মোট ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকার অসামঞ্জস্যতা পায়। তাৎক্ষনিক জিজ্ঞাসাবাদে সত্যতা স্বীকার করেন রিফাতুল হক। ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় অল্প অল্প করে টাকা সরান তিনি।
প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, আসামীরা ভল্টের টাকা সরানোর জন্য অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেন। ভল্টে ১০০ টাকার বান্ডিলের দুইপাশে ৫০০ টাকার নোট ও ৫০০ টাকার বান্ডিলের দুইপাশে ১০০০ টাকার নোট দেখিয়ে টাকার হিসাব মিলিয়ে রাখতেন। অর্থাৎ ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের সংখ্যা বেশি দেখিয়ে কাগজে-কলমে হিসাব সঠিক করে রাখতেন। যাতে প্রাথমিকভাবে দেখে মনে হয় সব ঠিকই আছে। আর ভল্টের চাবির দুই সেট রিফাতুল ও এমরান আহম্মেদের কাছে রক্ষিত ছিল। তারা যৌথভাবে ভল্টের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের বংশাল শাখার ভল্টে রক্ষিত টাকা থেকে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধাৱা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়।
গত ১৮ জুন ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখার ভোল্ট থেকে তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকা গায়েব হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় ইমরান ও রিফাতকে আটক করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। শুক্রবারই (১৮ জুন) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ উর রহমান তাদের কারাগারে পাঠান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ