মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রাজধানীতে বাবা-মা ও বোনকে হত্যা ঘাতক বড় মেয়ে আটক

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর কদমতলীর মুরাদপুর এলাকায় একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার সকালে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন- মাসুদ রানা (৫০), তার স্ত্রী মৌসুমী ইসলাম (৪৫) ও মেয়ে জান্নাতুল (২০)। তাদের বিষ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকারী সন্দেহে এই পরিবারের বড় মেয়ে মেহজাবিন মুনকে (৩০) আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলাম (৪০) ও মেয়ে মারজান তাবাসসুম তৃপ্তিয়াকে (৬) অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মা-বাবাসহ ছোট বোনকে হত্যা করে ৯৯৯-এ ফোন করে মেহজাবিন পুলিশকে বলেছিলেন, ‘তিনজনকে খুন করেছি, তাড়াতাড়ি আসেন, আমকে ধরে নিয়ে যান। তা না হলে আরও দুইজনকে খুন করব’। পুলিশ বলছে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন মেহজাবীন মুন। মা-বাবাসহ ছোট বোনকে হত্যা করে পুলিশকে ফোন দেন তিনি নিজেই। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কদমতলীর মুরাদপুর হাজী লাল মিয়া সরকার রোড এলাকা থেকে স্বামী, স্ত্রী ও মেয়ের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে। আটক মেহজাবিন থাকেন আলাদা বাসায়। মায়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন তিনি।
কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ জানান, কদমতলীর মুরাদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে একই পরিবারের তিনজনের লাশ হাত পা বাঁধা অবস্থায় পেয়েছি। শুক্রবার রাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের তিনজনকে পরিবারের বড় মেয়ে মেহজাবিন হত্যা করেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। তাকে আটক করা হয়েছে। বিষ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রহস্য উদঘাটনে ঘটনাস্থলে রয়েছে পুলিশ।
স্থানীয়রা জানান, গত দুদিন আগে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে মায়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন মেহজাবিন। এসেই তার ছোট বোন জান্নাতুলের সঙ্গে তার স্বামীর পরকীয়া রয়েছে বলে বাবা-মাকে অভিযোগ করেন। এ নিয়ে কথাকাটাকাটি হয়। তার জেরেই হয়তো তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এছাড়া প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, সম্পত্তি নিয়েও পরিবারের সঙ্গে বিরোধ ছিল মেহজাবিনের। সম্পত্তি লিখে দেয়ার জন্য বাবা-মাকে অনেক চাপ দিতেন তিনি। এ নিয়ে এর আগে সালিশ-বৈঠকও হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে। পারিবারিক কলোহের কারণে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বাবার বাড়িতে আসেন না। একবছর পর তিনি এবার বাবার বাড়িতে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে আসেন।  
মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাতে তার স্ত্রী তাকে চা দিয়েছিল। সেই চা পানের পর আর কিছু তার মনে নেই। তিনি বলেন, মেহজাবিন উশৃঙ্খল জীবনযাপন করতো। সামান্য কথায় রেগে যেতো। প্রায়ই ঘরের বাইরে থাকতো। অনেক সময় বাসায় এসে তাকে পাওয়া যেতো না। কোথায় গিয়েছিল জানতে চাইলে রেগে যেতো। তার আচার-আচরণ ছিল কিছুটা সন্দেহজনক। তিনি এও বলেন, স্ত্রীর আচরণে পারিবারিক ভাবে অশান্তিতে ছিলেন তিনি।  কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, সে (মেহজাবিন) কৌশলে বাসার সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর সবাই অচেতন হয়ে যায়। এরপরই সকলের হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধে। পরে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। প্রাথমিক তদন্তে এটাই পুলিশ জানতে পেরেছে বলে জানান তিনি।
ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের (শ্যামপুর জোন) অতিরিক্ত উপ কমিশনার কাজী রোমানা নাসরিন বলেন, ‘মেহজাবিনের দেওয়া’ ঠিকানা অনুযায়ী পুলিশ দ্রুত সেখানে যায় এবং  তিনজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্য দুজনকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি বলেন, গৃহকর্তা মাসুদ রানা প্রবাসে থাকতেন। তিন মাস আগে ওমান থেকে দেশে ফেরেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে মেহজাবিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
ডিএমপির ওয়ারি বিভাগের উপকমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন,  ‘মেহজাবিনের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি, বাবা না থাকায় তার মা তাকে এবং তার ছোট বোনকে (নিহত জান্নাতুল) দিয়ে দেহ ব্যবসা করাত। এসব নিয়ে প্রতিবাদও করেছিল সে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ছোট বোনকে দিয়ে ব্যবসা চলছিল। এর মধ্যে তার স্বামী ছোট বোনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এছাড়া মেহজাবিনের বাবা মাসুদ রানা ওমানে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এসব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ থেকে পরিবারের সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে মেহজাবিন পুলিশকে জানিয়েছেন। তবে মেহজাবিনের একার পক্ষে এই ঘটনা ঘটানো কতটুকু সম্ভব, এনিয়ে পুলিশের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, মেহজাবিনের স্বামীকেও আমরা সন্দেহের বাইরে রাখছি না। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সম্পত্তির বিষয়ও এখানে রয়েছে। তদন্তে এসব আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ