শুক্রবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ড্রাইভিং লাইসেন্স না পেয়ে ভোগান্তিতে ১৫ লাখ মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার : আবেদন করেছেন এবং পরীক্ষায় পাসও করেছেন এমন ১৫ লাখ মানুষ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন না। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশে-বিদেশে ড্রাইভিং চাকরিপ্রত্যাশীরা। লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড না পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নিশ্চিত হওয়া চাকরিও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে অনেকের।
ভারতের ‘মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হলেও এক বছর ধরে বিআরটিএকে স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স সরবরাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটির কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছে বিআরটিএ। আর এতেই ভোগান্তিতে পড়েছেন ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশী ১৫ লাখ মানুষ।
বি আরটিএ বলছে, মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের ব্যর্থতার কারণে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে পারছে তারা। এতে সংস্থাটির সব অর্জন ম্লান হয়ে গেছে।
প্রায় ১৫ লাখ মানুষ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছে। এরমধ্যে প্রায় ১০ লাখ চালক গাড়ি চালাচ্ছেন বি আরটিএর ‘একনলেজমেন্ট স্লিপ’ দিয়ে। কিন্তু স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড না পাওয়ায় সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারছেন না তারা। শুধু তাই নয়, এর কারণে দুই বছর ধরে বাংলাদেশ দক্ষ চালক রপ্তানিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অন্যান্য দেশ সে স্থান দখল করে নিচ্ছে।
২০২০ সালের ২৯ জুলাই ভারতীয় কোম্পানি মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৪০ লাখ স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের শত কোটি টাকার চুক্তি সই করে বি আরটিএ। চুক্তিতে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডের বাংলাদেশি এজেন্ট লজিক ফোরাম। চুক্তি অনুসারে ২০২০ সালের ২৯ জুলাই থেকে দুই মাসের মধ্যে প্রিন্ট করা স্মার্ট লাইসেন্স কার্ড সরবরাহ করার কথা। করোনা পরিস্থিতির কারণে সেই সময় বাড়িয়ে সাড়ে চার মাস করা হয়। সে হিসেবে গত ডিসেম্বর থেকে প্রিন্ট করা স্মার্ট লাইসেন্স কার্ড সরবরাহ করার কথা মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের।
এক বছর ধরে বিআরটিএকে স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্সের নমুনাও দেখাতে পারেনি সংস্থাটি।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ডিসেম্বরে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের নমুনা দেখতে চান। কিন্তু সেই নমুনা তারা এখনো দেখাতে পারেনি। পরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স এখন পর্যন্ত সেন্ট্রাল এনরোলমেন্ট স্টেশন স্থাপনের কাজই শেষ করতে পারেনি। এখনো জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি বিভিন্ন জেলায়। স্টেশন স্থাপনের কাজেও শর্ত না মানার অভিযোগও আছে।
জানা গেছে, আগ্রহী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করে কাজ দেয়া হয় মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সকে। অথচ সব শর্ত পূরণ করে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারা এবং মাসে দুই লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড জনগণের হাতে পৌঁছে দিতে সক্ষম কোম্পানিও এক্ষেত্রে আবেদন করেছিল।
কিন্তু বহু অভিযোগে অভিযুক্ত এই কোম্পানিকেই শত কোটি টাকার ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড প্রকল্পের কাজ দিয়েছে বি আরটিএ। এজন্য চারবার সংশোধন করা হয়েছে দরপত্রের শর্ত এবং দরপত্র বাতিল করে বাদ দেয়া হয় যোগ্য কোম্পানিকে। প্রথম দরপত্রে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান সেল্প সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করলেও তাদের কাজ না দিয়ে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করে কাজ দেয়া হয় এই মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সকে।
মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স নিজ দেশ ভারতেই আধার কার্ড প্রকল্পে আজীবন নিষিদ্ধ হওয়া একটি প্রতিষ্ঠান। ভারতের আধার কার্ড প্রকল্পে কাজ পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু নাগরিকদের তথ্য বিক্রি করার দায়ে আজীবন নিষিদ্ধ হয় প্রতিষ্ঠানটি।
এছাড়া তেলেঙ্গানার সামাজিক সুরক্ষা সেবা ‘মিসেভা’ প্রকল্প থেকেও বাদ দেয়া হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। ভবিষ্যতেও ভারতের কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স।
শুধু ভারত নয়, বিভিন্ন দেশেও নানা দুর্নাম রয়েছে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের বিরুদ্ধে। আফ্রিকার দেশ কেনিয়াতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের নয় পরিচালকের বিরুদ্ধে। শ্রীলঙ্কাতেও ঘুষ-অনিয়মের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে। মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের ব্যর্থতা বাংলাদেশেও নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০১৫ সালে বিএমইটির ইমিগ্রেশন কার্ড সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েও ব্যর্থ হয়েছিল মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ